Ajker Patrika

শিল্প-সংস্কৃতির অচলায়তন ভাঙতে হবে

অজয় দাশগুপ্ত
শিল্প-সংস্কৃতির অচলায়তন ভাঙতে হবে

মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণতা দিয়েছিল সংস্কৃতি। পাকিস্তান আমলে সংস্কৃতি ও বাঙালিয়ানা ধ্বংসের যে পাঁয়তারা, তার জবাব দিয়েছিল বাঙালি। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে সারা দেশে স্লোগান আর দেয়াললিখন ছিল একটি বাংলা অক্ষর, একজন বাঙালির প্রাণ। শব্দ, অক্ষর বা ভাষা যে জাতির প্রাণ হতে পারে, তা আমাদের কি আগে জানা ছিল?

সংস্কৃতি তখন আমাদের কী কী দিয়েছে, তার হিসাব করলে চমৎকৃত হতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের রবীন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর রবীন্দ্রবিরোধী অবস্থান এ দেশের মানুষ মেনে নিতে পারেনি। নজরুলের মতো কবিকেও নতুনভাবে পেয়েছিলাম বলে তিনি আজ আমাদের জাতীয় কবি। শুধু কবিতা নয়; গান, নাটক, সিনেমা বা চিত্রকলা—প্রায় সব বিষয়ে আমরা সে সময় এগিয়েছিলাম। এই সংস্কৃতি আমাদের নতুন এক জীবন দান করেছিল।

দুনিয়ার নানা দেশে ভ্রমণের সুযোগে আমি জানতে পেরেছি, সংস্কৃতি হলো যেকোনো দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় শক্তি, যার মূল বিষয় কথা বলতে পারা। মানুষ তো আসলে কথাই বলে সবকিছুতে। কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধে শুধু বলে না; চিত্রকলার ভেতর দিয়েও সে তার না-বলা কথা ফুটিয়ে তোলে। যা করে নাটক, যাত্রা বা অন্য কোনো মাধ্যমেও। এই কথা বলার জায়গা ঠিক না থাকলে বা মুক্ত না হলে বিপদ। আপনাদের হয়তো মনে থাকতে পারে রাশিয়ার সেই বিখ্যাত গল্প। ক্রুশ্চেভ তখন প্রধানমন্ত্রী, পলিটব্যুরোর এক সভায় তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘অনেক কথা আমরা স্তালিনের আমলে বলতে পারতাম না।’ এমন সময় নীরব সভাস্থলের মাঝখান থেকে কে যেন বলে উঠেছিল, ‘বলতে পারতেন না কেন? তখন তো আপনি পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন।’

ভাষণ থামিয়ে ক্রুশ্চেভ জানতে চাইলেন, ‘কে বললেন এই কথা?’ কেউ কিছু বলে না। থমথমে নীরবতা। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে জানালেন, ‘আমি কথা দিচ্ছি, আপনি দাঁড়ান, আপনার কোনো অসুবিধা হবে না; বরং আপনাকে দেখে অনেকেই সাহস পাবে।’ তবু কেউ দাঁড়াল না। কয়েকবার বলার পর তিনি হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘ঠিক একই কারণে আমরাও তখন বলতে সাহস পেতাম না।’

স্বাধীনতার জন্য দুটি বিষয় অনিবার্য। একটি ভোট, আরেকটা কথা বলার অধিকার। কথা বলা মানে কিন্তু তোতার মতো শেখানো বুলি আওড়ানো নয়। গঠনমূলক আর সত্য বলার অধিকারের নামই মুক্তি। সেই জায়গা থেকে আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ৫৫ বছরে কোনো সরকারই সত্য বলতে দিত না। কেউ আংশিক, কেউ খণ্ডিত, কেউ তাদের মনের মতো করে বলার অধিকার দিলেও মূল কথা বলতে পারা ছিল কঠিন। যার কারণে একাধিক সরকারকে বিদায় নিতে বাধ্য করেছে জনগণ। তারপরও কারও কোনো শিক্ষা হয়নি। কেউ তা থেকে পাঠ নেয়নি। নিলে দেশ ছেড়ে ভেগে যাওয়ার মতো বাস্তবতা দেখতে হতো না।

বিগত সময়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সংস্কৃতির। কীভাবে তা সংঘটিত হয়েছে, তা কমবেশি জানা আছে সবার। শুরুতে আমরা যেটাকে প্রশংসা ভাবতাম, দেখা গেল সেটা রুটিন হয়ে দাঁড়াল। একই কথা, একই বক্তব্য আর একই ধরনের স্তাবকতা। এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিলেন সাহিত্য-সংস্কৃতির মানুষজন। আমি সিনিয়র একজন প্রবীণ লেখককে প্রশ্ন করেছিলাম, সর্বাধিক বিক্রীত নামে যে আত্মজীবনী, তা এতকাল কোথায় গচ্ছিত ছিল? কেন তার আভাসটুকুও পেল না কেউ? আমার এই নিতান্ত ও সাধারণ জিজ্ঞাসার কুটিল উত্তর আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। এই যে ভয় লাগানো বা ভয় জাগানো, এটা যেমন একদিকে, অন্যদিকে ছিল স্তুতিবাদ। এই চক্রে পড়ে কত ভগবান যে ভূত হয়ে গিয়েছিলেন, আজ তার হিসাব করলে আমরা চমকে যাব। যাঁদের আমরা দিকপাল জানি বা মানি, তাঁদের কেউই আর কথা বলতেন না। যদি বলতেনও, তা সবার জানা। নিন্দা, সমালোচনা আর হক কথা বলা যে অধিকার, সেটা প্রায় লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। যার চরম মূল্য এখনো চুকাচ্ছে সংস্কৃতি।

আজকাল কেউ আর গানবাজনা করে না। করলেও তা বলার সাহস রাখে না। অথচ বাংলাদেশ সুরের দেশ। এ দেশের নদীর কল্লোলে সুর, মেহনতি মানুষের কাজে সুর, বিয়েতে সুর, উৎসবে সুর এমনকি বেদনায়ও সুর আর গান। সে দেশে মহল্লা বা পাড়ায় গানের রেওয়াজ বিলুপ্তপ্রায়। ঘরে ঘরে হারমোনিয়াম-তবলার দিন শেষ। বিগত দুই দশকে কেউ তার খবর রাখেনি। কেন তা বন্ধ হয়েছে, কারা তা বন্ধ করেছে বা কীভাবে তার সমাধান করা যায়, তা নিয়ে কথা বলে না কেউ। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে মিডিয়ায় এর প্রভাব।

বাংলাদেশে রেডিও জকি নামে পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বললে আপনি ভয় পাবেন। সকালবেলার এক অনুষ্ঠানে আমাকে ইন্টারভিউ করার জন্য আসা এক বিখ্যাত জকির পোশাক দেখে আমি ভেবেছিলাম তিনি মূল্যবোধ বা নৈতিকতাবিষয়ক কোনো অনুষ্ঠানের হোস্ট। শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক আয়োজনে তাঁর মতো বিখ্যাতজন থাকা মানে চাকা ঘুরছিল। এই চাকা যে পেছন দিকে যাচ্ছিল, এটা যাঁরা দেখেছেন বা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁরা মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন। কারণ, তাঁদের তত দিনে জানা হয়ে গিয়েছিল যে উপার্জনের বাইরে, আরাম-আয়েশের বাইরে আর কিছু নেই। সেই আরাম-আয়েশ কতটা বা কত দিন টেকসই, তা তাঁরা ভাবেননি। সেটা তাঁদের অভিরুচি ও কর্মফল। কিন্তু আমরা দেখলাম, ধর্মের ভিড়ে একটি শিল্পবান্ধব প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হলো না। নতুন করে শিল্পকলা বা তেমন কোনো একাডেমি হলো না কোথাও।

রাজধানীর যে মহান বাংলা একাডেমি, তার কাজ হয়ে গেল বছরে একবার পুরস্কার দেওয়া। সে পদক কে পাবেন বা পেতে পারেন, তার জন্য কী কী করতে হতো, সে এখন এক ইতিহাস। লাভ কী হলো? লাভ এই, বাংলা একাডেমি পদকে ভূষিত ব্যক্তিরা ছবি তুললেন, সামাজিক মিডিয়া ফাটিয়ে দিলেন—এটুকুই। নয়া কবিতা, গান, নাটক বা নিবন্ধের ঘরে অশ্বডিম্ব। তাহলে সাহিত্য কীভাবে এগোবে?

যাঁরা রাষ্ট্র চালাতেন, তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন একদা জনগণ ও শিল্পই তাঁদের সাহস আর প্রেরণা জোগাত। কঠিন সময়ের পথনাটক, গান বা প্রতিবাদী কবিতা-ছড়া তাঁদের আর ভালো লাগত না। ফলে যুক্ত হতে লাগল সভাকবির দল। একসময় আস্তে আস্তে ভাটা পড়ে গেল সবকিছুতে। অথচ আমরা বিশ্ব ইতিহাসে দেখি ফরাসি, রুশ বা যেকোনো বিপ্লবে সাহিত্য-শিল্পই ছিল পুরোভাগে। একা ভিক্টর হুগো কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন জগৎ। আমাদের মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কম কিসে? কিন্তু এরপর ভাটার কাল চলছে সাহিত্যে।

হলো না। আর হলো না এসব। প্রতিষ্ঠানের পর প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেল। আমরা দেখলাম আর চুপ থাকলাম। আমরা ভুলে গেলাম এভাবে চললে সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি মারা যাবে। বাঁচলেও জীবন্মৃত হয়ে বাঁচবে—যার ফোঁস আছে; কিন্তু বিষ নেই। এমন সংস্কৃতি কি আমরা চেয়েছিলাম? যে আদর্শ, মূল্যবোধ আর ভাবনা বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, রাষ্ট্রপিতা ও ভাষা আন্দোলন দিয়েছিল; তার সর্বনাশ করতে পিছপা হননি কেউ। আজ সারা দেশে যে সংকট, তা থেকে উত্তরণের জন্য আপনি আর যা-ই করেন, শিল্প-সংস্কৃতির কাছে যেতে পারেন? কারণ, তার দুয়ারে তালা।

সেই তালা খোলার সময় এসেছে। যত বৈরী হোক, সময়ই উত্তর দেবে। আমার ধারণা, আমার বিশ্বাস—প্রকৃতি, দেশ আর মাটি মিলে যে সংস্কৃতি; তার বিনাশ নাই। তার দুঃসময় থাকতে পারে, কিন্তু হনন হয় না। আমাদের দেশ ও জাতি গানবাজনা, নাটক-কবিতা ছাড়া কীভাবে বাঁচবে? এদেশ-ওদেশ বা নানা দেশ থেকে ধার নিয়ে তার চলবে না। তোলা দুধে শিশু বাঁচে না। তোলা বা ধার করা কিছুতে সংস্কৃতিও বাঁচবে না। শিকড়ে ফিরুন। দেশের মাটির গন্ধমাখা ঐতিহ্য-আদর্শে মন দিন। দুয়ার খুলে যাবে। তখন আবার সংস্কৃতি পথ দেখাবে। দয়া করে তোষামোদী আর স্তাবকতা রোধ করুন। শিল্প স্বাধীন। সে কোনো রাজা-বাদশাহর ধার ধারে না। জনগণই তার মালিক।

লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত