দেশে এখন একটি ভয়ংকর প্রবণতা ক্রমেই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। কোনো ব্যক্তি চুরির অভিযোগে ধরা পড়ছেন, কাউকে ডাকাত বলে সন্দেহ করা হয়েছে, কারও বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য করেছেন কিংবা কোনো তুচ্ছ বাগ্বিতণ্ডায় কেউ জড়িয়ে পড়ছেন—ব্যস, একদল উত্তেজিত মানুষ মুহূর্তের মধ্যে তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে থানা-পুলিশ, আইন-আদালতের কোনো ধার ধারছেন না কেউ। লাথি, ঘুষি, রড বা লাঠির আঘাতে অভিযুক্ত মানুষটিকে মেরেই ফেলা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় বা তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের ভিত্তি যাচাইয়েরও প্রয়োজন মনে করা হচ্ছে না।
এ দেশে গণপিটুনির সংস্কৃতি বহু পুরোনো। কিন্তু আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসানের পরপরই আইনশৃঙ্খলার অবনতির মধ্যে ভিন্ন মাত্রা ও পরিসরে এ ধরনের ঘটনা রাতারাতি বেড়ে যায়। লোকমুখে ও গণমাধ্যমে এই ভয়ংকর প্রবণতার নাম হয়ে ওঠে ‘মব জাস্টিস’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো বিচার নয়; এটি পরিষ্কারভাবেই আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) গত মে মাসের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনে যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা শুধু উদ্বেগজনক বললে হয়তো কম বলা হবে। বস্তুত এটি রাষ্ট্রের জন্য এক বিপৎসংকেত। মে মাসে সারা দেশে ৬৯টি ‘মব’ সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন ৭১ জন। গত ছয় মাসের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। কৌতূহলের বিষয় হচ্ছে, যখন বলা হচ্ছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের নাজুক পরিস্থিতি থেকে পুলিশ বাহিনী বেশ আগেই বের হয়ে এসেছে, তখনই মব সন্ত্রাসের গ্রাফের রেখা আবার ঊর্ধ্বমুখী।
এমএসএফের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে নিহত হন ১০ জন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ২১, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৯, এপ্রিলে ২১ এবং মে মাসে অন্তত ৩২ জন। অর্থাৎ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গত কয়েক মাস মোটের ওপর স্থিতিশীলভাবে ঘটে চলেছে এবং শেষ মাসটিতে অনেকটাই বেড়েছে।
একটি স্বাধীন দেশে যদি মাত্র এক মাসেই অন্তত ৩২ জন আদালতের রায় ছাড়া, বিচারকের আদেশ ছাড়া, রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর বাইরে শুধু উত্তেজিত জনতার হাতে নিহত হন; তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আসলে আইনি কর্তৃত্ব কার হাতে? রাষ্ট্রের নাকি উন্মত্ত জনতার?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক ধারণাগুলোর একটি হলো—শাস্তি দেওয়ার বৈধ ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের, অন্য কারও নয়। নাগরিকেরা সেই ক্ষমতা রাষ্ট্রকে অর্পণ করে। বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতেই আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। অরাজকতার অবসান ঘটে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্থিতিশীলতা। এই একবিংশ শতকে এসে যখন উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিজেরাই অপরাধের বিচারকের দায়িত্বে বসে যায় এবং নিজেরাই শাস্তি কার্যকর করে, তখন সেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে দেখা গেছে, মবের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪ জনকে চুরির অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যত বড় চুরির ঘটনা ঘটুক না কেন, বাংলাদেশের আইনে কি এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে? নিশ্চয়ই তা নয়। তাহলে জনতা কোন আইনের ভিত্তিতে এই ‘সাজা’ কার্যকর করল? আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব ঘটনার একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি পরে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ারও নজির রয়েছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যুগ যুগ ধরে গুজব শুনে, শিশু চোর সন্দেহে বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্দোষ ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। কিন্তু একজন মানুষকে মেরে ফেলার পর তাঁর আর নির্দোষ প্রমাণ হলেইবা কী! অন্যায়টি সংশোধনের কোনো সুযোগ তো আর থাকে না।
সমাজে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা বাড়ছে কেন? এর প্রথম কারণ বিচারব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক আস্থাহীনতা। এ দেশের বিচারব্যবস্থা নানা সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত। মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বহু পুরোনো। মানুষ যখন দেখে কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে ১০ বছর লেগে যায়, ধর্ষণের মামলার রায় পেতে যুগ পার হয়ে যায়, তখন সমাজের একাংশের মধ্যে রাষ্ট্রের আইনকে অকার্যকর মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। দিনে দিনে সেই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু বিচারব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করে তো বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার সমাধান করা যাবে না। আদালতের প্রক্রিয়া কখনো ধীরগতির হতে পারে, রায় সবার পছন্দ না-ও হতে পারে; কিন্তু উন্মত্ত জনতার লাঠি বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
মানুষের অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার দ্বিতীয় কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। ডিজিটাল যুগে গুজবের গতি যেন আলোর সমান। একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি লাইভ ভিডিও, একটি বিকৃত করা ছবি কিংবা একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ কয়েক মিনিটের মধ্যে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এ থেকে অনেক ক্ষেত্রে উত্তেজনা ছড়ায়, ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। তারপর হয়তো শুরু হয় হামলা। অনেক ক্ষেত্রেই পরে দেখা যায়, অভিযোগটির আদতে কোনো ভিত্তিই ছিল না। কিংবা তিলকে তাল করা হয়েছে।
তৃতীয় কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়। একটি সমাজে যখন পেশিশক্তির প্রদর্শনকে নিয়মিতভাবে বৈধতা দেওয়া হয়, যখন প্রতিপক্ষকে দমন করাই সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়, যখন আইন অপেক্ষা ক্ষমতার প্রভাব বেশি কার্যকর বলে মনে হয়; তখন সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করতে শুরু করে, গায়ের জোরই শেষ কথা। মব সংস্কৃতি সেই গা-জোয়ারি রাজনীতিরই সামাজিক রূপ।
বড় একটি উদ্বেগের দিক হলো, মব এখন আর শুধু সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করায় থেমে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। এর অর্থ ক্ষুদ্র হলেও জনগণের একটি অংশ রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্বকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করছে। রাষ্ট্রের সক্রিয় হওয়ার জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর কী হতে পারে?
সরকারের অবস্থানও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিকবার মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। নতুন আইন করা কিংবা বিদ্যমান আইন সংশোধনের কথাও বলেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বক্তৃতা-বিবৃতির সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মবে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে।
গত কয়েক মাসে কয়টি মব হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার হয়েছে? কতজন মবকারী বা উসকানিদাতা গ্রেপ্তার হয়েছে? এদের ধরে বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কেন দেওয়া হলো না, তার জবাব কেউ দিতে পারবেন?
মব সহিংসতা হয়তো অনেকাংশে বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতারই অংশ। এমএসএফের একই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্তত ৩২৬টি ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের সংখ্যা ৫৪ থেকে বেড়ে ৭০-এ পৌঁছেছে। দলবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও বেড়েছে। অর্থাৎ সমাজে সহিংসতার সামগ্রিক মাত্রাই বৃদ্ধি পেয়েছে।
একটি সমাজে যখন সহিংসতা ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে মানবিক সংবেদনশীলতা হারাতে থাকে। একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, আর অন্যরা বাধা না দিয়ে তা মোবাইল ফোনে ভিডিও করছে, এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধের গুরুতর সংকটও বটে।
রাষ্ট্র যদি দ্রুত এবং দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে মব সহিংসতা একসময় রীতিতে পরিণত হবে। তখন চোর সন্দেহে হত্যার মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও একই কৌশলে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এরপর হয়তো নিতান্ত ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতেও মবের ব্যবহার শুরু হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকবে না।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্র যদি আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে হতাশ, বিক্ষুব্ধ সমাজে মবরাজের দৌরাত্ম্য বাড়তেই থাকবে। তা রাষ্ট্র বা নাগরিক কারও জন্যই স্বস্তির কথা নয়।

ভর্তুকি সমন্বয়, লোকসান কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম একলাফে ১৫ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে আজকের পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে শিশু হত্যা, ধর্ষণ, বলাৎকার নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহু বছর ধরে শিশুর ওপর সহিংস আচরণ, নির্যাতন, এককথায় শিশুনিধন প্রক্রিয়া চলছে। রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার বড় শিকার ঘুরেফিরে হয় শিশুরা। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার ভুক্তভোগীও শিশুরা।
১ ঘণ্টা আগে
সেই যে ২০২২ সালে শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তার আর অবসান হচ্ছে না। রাশিয়া একসময় ভেবেছিল, তাদের সশস্ত্র আক্রমণ ইউক্রেনকে কুপোকাত করবে খুব দ্রুত। কিন্তু সে রকম ঘটনা ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে সামরিক সাহায্য থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহযোগিতা করে এসেছে।
১ দিন আগে
এমনিতেই দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাই সুস্থ ধারার কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও সেগুলো প্রদর্শনের জন্য পর্দার অভাব হয়। এমন পরিস্থিতিতে যখন পরিবার নিয়ে দেখার মতো একটি সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সেটি সংস্কৃতির গোড়ায় কুড়াল মারার মতো একটি কাণ্ড নয় কি? উদ্বিগ্ন করা...
১ দিন আগে