Ajker Patrika

পরিপাটি সন্‌জীদা

পার্থ তানভীর নভেদ্
আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১১: ০২
পরিপাটি সন্‌জীদা
সন্জীদা খাতুন (জন্ম: ৪ এপ্রিল ১৯৩৩—মৃত্যু: ২৫ মার্চ ২০২৫)

পার্থ তানভীর নভেদ্

সাংবাদিক ও সন্‌জীদা খাতুনের ছেলে (সন্‌জীদা খাতুনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ২৫ মার্চ। ঈদ ও স্বাধীনতা দিবসের ছুটি থাকায় তাঁর স্মরণে লেখাটি আজ ছাপা হলো।)

কদিন ধরেই ঘ্যান ঘ্যান করছেন। স্টিলের আলমারি থেকে শাড়িগুলো বের করে পাশের ছোট বিছানায় রাখতে হবে। বড় মেয়ে আগেই ছুটি নিয়েছে, বিশেষ সময় দিতে পারেনি। ছোট মেয়ে শরীর-স্বাস্থ্য, ঘর-সংসার আর চাকরি নিয়ে জেরবার। ছেলেই ভরসা।

মাসে বা ছ’মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ক্লাস নেয়; বাকি সময় ছায়ানটের মানুষদের নিয়ে ছোটাছুটি। রোজগারের কথা ভাবলে একরকম বেকারই। মায়েপোয়ের ভালোবাসায় মহামিল—দেশ-জাতি-মনুষ্যত্ব, সংগীত-সংস্কৃতি, ছায়ানট-সমাজসেবা-জনতোষ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। খানিক হলেও ছেলে নিয়মিতই মাকে সময় দেয়। শাড়ি বের করে করে বিছানার ওপর ঢিবি বানাল। অন্তত শ দুয়েক। ডাক পড়ে কাছের-দূরের সব আপনজনের। যে যা নেবে। ফাঁই ফাঁই করে শাড়ি নাই হয়ে যায়। বিছানার চাদর ফের দাঁত কেলিয়ে হাসে। সেই কি নিজেই নাই হয়ে যাবার পূর্বাভাস! নির্ঘাত আঁচ করেই, বিলিবণ্টনের বন্দোবস্ত। কে জানত! অন্তিম যাত্রারম্ভের পদধ্বনি, দেদীপ্যমান অর্ক বুঝি অস্তাচলমুখী।

সন্‌জীদা গোছানো মেয়ে বরাবরই। নিজের কাজ নিজেই করে নেওয়ায় সড়োগড়ো স্বাবলম্বী। প্রবহমান জীবনে নিশ্চুপ-নিশ্চেষ্ট থাকা ধাতে নেই। সহজাত ধারা। অনুক্ষণ কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত। নিষ্ঠা মজ্জাগত। ধ্যান ঈর্ষণীয়। রুদ্ধশ্বাস ছুটতেন, জানতেন জীবের নিয়তি; জীবনসূর্য ক্ষণস্থায়ী। বিশ্বাস করতেন, দুদণ্ডের এক জীবনের কোনো পল অপচয় করা চলে না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বান্তকরণে লেগে থাকা আর লক্ষ্যে পৌঁছানোই তাঁর একনিষ্ঠ চর্চা। আপন-পর সবার মধ্যেই ছড়িয়ে গেছেন সে সাধনা। কেউ পুরোটা নিয়েছে, কেউ অংশ, কেউ কণাটুকুও নয়।

জ্ঞানচক্ষু ফোটার কাল থেকেই মিনু কাজপাগল, সঞ্চিত সকল ধন আগলে রাখতে পরিপাটি, অর্জিত ঐশ্বর্য নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে উদার। কোথায় পেলেন জীবন বিকিয়ে আহরণ আর বিলি করার এমন অপূর্ব শৃঙ্খলাবদ্ধ মানস? আব্বু-আম্মু-পরিবার-প্রতিবেশ থেকে, নাকি নিজে গড়ে তুলেছেন! কে জানে।

ভাগ্য বটে! মিনু আজন্মই অটুট মনোবলের কিছু সমমনার সান্নিধ্যে। শৈশবে বড়দি যোবায়দা, সেজদি খুরশিদা, পিঠোপিঠি ভাই আনোয়ার। কৈশোরে জুটেছে গানপাগল বন্ধু মাক্কী, ব্রতচারীর কামরুল ভাই; যৌবনের সন্ধিক্ষণে রাজনীতির পাঠ গৃহশিক্ষক সরদার ভাইয়ের কাছে; যৌবনে পেয়েছেন দেশ-সংস্কৃতি-মানবতা ভাবনার ওয়াহিদুল-টুলু-ইমদাদকে। জীবনদর্শন, আকাঙ্ক্ষা, আদর্শ, লক্ষ্য—সব দানা বেঁধেছে একে একে। ছোটবেলায় সোহরাব ভাইয়ের গানের ভেতর দিয়ে নজরুলের ভুবনে প্রবেশ। আব্বু মোতিহারের বাসায় স্বয়ং কাজী সাহেবকে পেয়েছেন।

আলী আহসান স্যারের কাছ থেকে পেলেন রবীন্দ্রনাথের নিবিড় দিশা। সবে মিলে দেশ-দশ নিয়ে আরও পোক্ত আকাঙ্ক্ষা আর কর্মের জগৎ। জীবনসত্য সন্ধানে দিশারিদের আরেক অন্যতম, সত্যেনদা। পুলিশের তাড়া খেলেই অকৃতদার বাম-কর্মী আড়াল খুঁজতেন মিনুর সংসারে। শুধুই আশ্রয়, নাকি ভাবশিষ্য গড়ে তোলা? শ্রদ্ধা-স্নেহাসক্ত ভালোবাসা। মনোভাবনার কত যে বিনিময়! অত বিচিত্র প্রেরণা আর দৃষ্টিকোণেরই নির্যাস, শোষক পাকিস্তানিদের আগ্রাসী নাগপাশ থেকে বাংলা আর বাঙালিকে মুক্ত করার সংকল্প। আয়ুধ? শিল্প-সাহিত্য-সংগীতসংস্কৃতি আর মানবতাবোধ-মুক্তচিন্তা।

রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী ঘিরে এক হলেন মিনুরা। ভাবাদর্শ ঠিক করেন সিধু ভাই, আহমেদুর রহমান, ওয়াহিদুল। প্রণোদন মাহবুব মুর্শেদ, জিসি দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর। ছায়া দিয়ে চলেন সুফিয়া খালাম্মা। ছানা-মানিকের সহযোগ নিয়ে মিনুর বাস্তবায়ন। ভাবাদর্শ নির্ধারণ আর লক্ষ্য অর্জনের পথ নিরূপণেরও অংশী মিনু। ন্যায়নীতির কট্টর অনুসারী। শৃঙ্খলাবদ্ধ বলে সবার অসীম নির্ভরতা। অদ্বিতীয়। সেই একই গুণ, গুছিয়ে কাজ করা। দাঁড়িয়ে যায় ছায়ানট।

একষট্টিতে বড় মাপের, সংবদ্ধ দেশকাজের প্রারম্ভ। তেষট্টিতে গানের স্কুলের উদগম। সাতষট্টিতে নাগরিক বর্ষবরণের প্রবর্তন। নির্ভীক, অদম্য সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পুরস্কার—বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র, পূর্ণ স্বাধীনতা। মুক্ত স্বদেশে তিন প্রবর্তক সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল, সন্জীদার আমৃত্যু সংস্কৃতিসখ্য। একে একে আবির্ভাব ঘটে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, নালন্দা, ব্রতচারীর। যথারীতি সবেতেই মিনুর কাজ–গোছগাছ, শৃঙ্খলাবিধান, তত্ত্বাবধান।

ছায়ানটে সন্‌জীদা বয়স সুদীর্ঘ ছয় দশক। আগলে রেখেছেন নিষ্ঠার আঁচলে। পাকিস্তানের শোষণকালে ছিলেন সরকারি চাকুরে। তখন আড়াল থেকে; স্বাধীন স্বভূমে আবডাল সরিয়ে। কেজো-মনন। সঙ্গে নীতি-সততা-প্রক্রিয়াবদ্ধ শৃঙ্খলা আর গুছিয়ে চলার মেলবন্ধন। বাড়তি গুণ—মেধা, পরম অধ্যবসায়, অসীম ধৈর্য, গভীর পরিমিতিবোধ, অতল মমতা ও কর্তব্য? নিজে করে অন্যকে বোঝানো। ভবন নিরাপত্তাবিধানে পরিচয়পত্র ধারণের প্রথা। প্রধানকে না চেনে কে? কিন্তু বড় ভাবতে শেখেননি। পরিচয় গলায় ঝুলিয়ে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। সর্বদা সাধারণের কাতারে। বলতেন, নিয়ম সবার জন্য সমান। অন্ধ স্নেহ তাঁকে মাঝেমধ্যে পেড়ে ফেলেছে। পদ চেয়ে কেউ আবদার করে বসলে বলেন, ‘ও তো আমাদেরই সন্তান’! কী মায়া, কী মোহ! স্বজনপ্রীতি নয় কি? তবে স্বজন বলতে মোটেই রক্তের সম্পর্ক বা আত্মীয় বুঝতেন না। একই আদর্শে ঘনিষ্ঠ, কর্মে নিমগ্ন–সমমনা সর্বজনকেই আজীবন আপন মেনেছেন, স্বজন ভেবেছেন।

বরং, জন্মসূত্রে স্ব-জন, সততই বঞ্চিত। পাছে লোকে কিছু বলে! না, লোকলাজ না। সন্‌জীদা নিরপেক্ষ। কারুকেই কোনো প্রশ্ন তুলতে দিতে নারাজ। সুযোগ্য গাইয়ে আপন কন্যা অপালাকে আড়ালে রেখেছেন। অনুষ্ঠানে গেয়েছে অন্যরা। তাই কি পার পেলেন! লোকে নীলির দিকে আঙুল তুলেছে, ‘দেখ দেখ, নিজের মেয়েকে গাওয়াচ্ছে!’ একরকম সত্যই। অপালার বন্ধু ফ্লোরা-নীলি-জিবীনারা কখনোই আপন মেয়ের চেয়ে কম কিছু ছিল না। চারুশিল্পী ছোট বোন এণু নালন্দা থেকে বিতাড়িত। টুঁ শব্দ নেই। নিজ পেশা আর পরিবারকে ফাঁকি দিয়ে ছেলে অষ্টপ্রহর ছায়ানট ছায়ানট করে। কিন্তু নিজে সভাপতি থাকতে ছেলেকে কিছুতেই মঞ্চ দেবেন না। হোক সে নিছক কোনো সংবাদ সম্মেলন বা সংগীতায়োজন। নিরস্ত করেন, ‘সুর বসে না তোমার’ বা ‘তুমি জানি কেমন উচ্চারণ করো, সিলেব্ল বোঝ না’ অথবা ‘জীবনে কিচ্ছু পড়লে না। কী যে প্যাঁচ মারো! আসল কথাটা লেখো বাক্যের শেষে।’ স্বজন স্নেহধন্যদের রেখে, আদত আপনদের কখনো জায়গা করে দিলেন না। তবু অপবাদ। পরিবারতন্ত্র!

দুই হাজার আঠারোর শেষে সেরিব্রাল ইনফার্কশন। তখন মিনুর পঁচাশি। মুকুল ফৌজ করা মেয়ে লাঠি ধরল। নিজের অজান্তে মাথা একদিকে হেলে পড়ে। আহা আহা করে কেউ জানালেই, যারপরনাই বিব্রত। চার-ছয় মাস খানিক নিস্তেজ। খাওয়া-ওষুধ-ব্যায়ামে পূর্বাপর নিখুঁত শৃঙ্খলা। মস্তিষ্কের মরা কোষে জীবন ফেরাতে না পারুন, যেন পূর্ণ আরোগ্য। অবাক মানা প্রত্যাবর্তন। স্বাবলম্বী, সতেজ। আবার সব কাজে লেগে পড়া, তদারকি। কেবল লাঠিটাই ছাড়া যায়নি। অপছন্দের শারীরিক সব পরনির্ভরতা উধাও। বিষয়ভিত্তিক ভাবনা-বিবেচনা, কল্পনা-পরিকল্পনা-পরামর্শ-পর্যবেক্ষণে আবার স্বচ্ছন্দ। আরও চোখা-ই বুঝি!

কিন্তু মিনুর অন্তরে যেন লয়-ক্ষয়ের সংকেত পৌঁছেছে। হাঁটু কমজোরি। ভারসাম্য রাখার লাঠি নিয়ে হাঁটাও বেদনাস্রোত ছড়ায়। রেটিনায় ছ্যাঁদা বাড়ছে। কমছে চোখের জ্যোতি। একটানা পড়তে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে পড়ে। একাধারে আর লিখতেও পারছেন না। শুরু হলো ছায়ানটের গানের শিষ্যদের বাসায় ডেকে নিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা-প্রজ্ঞা বণ্টন। লিসা-তানির মতো জনা পঁচিশের সঙ্গে সপ্তাহের পাঁচ দিনের সাত বেলায় গান বোঝা-গাওয়ার বৈঠক। অনুসারীরা আসে দলে দলে। তবে একসঙ্গে, তিন থেকে পাঁচজনা। কেন? সবাইকেই পরখ করে দেখা চাই। সূচি তৈরিতেও সেই পরিপাট্য। সুদীর্ঘকালের যত সঞ্চয়, নিঃশেষে বিতরণ! হ্যাঁ। সব ধন। বাদ যায় না সাহিত্য, ভাব, বাচন, উচ্চারণ, ছন্দ, মানবিক সম্পর্ক। স্নেহের জয়ন্তকে লাগিয়ে জুটিয়ে নিলেন চেনা-অচেনা, নবীন ছন্দশিল্পী। মাসে-দুমাসে একজোট হয়ে পঠন-পাঠন। আত্মস্থ সুধার উজাড় বিতরণ।

এর মধ্যেই চলে এল মহামারি কোভিড। চোখের রোগ নিয়ে ব্যাংককে ঘুরে এসেও আর যাওয়া হয় না। হাঁটু পালটাতে চান। বয়সের কারণে সাফ না বলে দেন ডাক্তার। সমঝদার মিনু ব্যস্ত হয়ে পড়লেন পারিবারিক আর সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসে। ছায়ানট, সম্মিলন পরিষদ্, নালন্দা, ব্রতচারী, কণ্ঠশীলনের জন্মাবধি একনিষ্ঠ সঙ্গী; ক্রমান্বয়ে পরম নির্ভরতার ছায়া। এক হাতে সব চালিয়েছেন। স্বৈরাচারী? তা বটে। তবে বিষয়গুলোর আগাপাছতলা জানা বলে দশখানা সিদ্ধান্তের মধ্যে নিদেনপক্ষে নখানাই নির্ভুল। মানবে না কে! নিজ-সংসার, লেখালিখি, সংগীতচর্চার পাশাপাশি–অনুষ্ঠান, গানের স্কুল, দেশ-বিদেশ ঢুঁড়ে গান শিখিয়ে বেড়ানো, সম্মেলন ও সংগীত প্রতিযোগের আয়োজন, শিশুদের পড়াশোনার আলয়কে সংস্কৃতি-সুধায় মাখিয়ে তোলা, ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে আলাপের বৈঠক, ব্রতচারী নৃত্যগীতের প্রশিক্ষণ আয়োজন, ধ্বনি-উচ্চারণ-কবিতার শিখরে বিচরণ–সবেতেই প্রশ্নাতীত একচেটিয়া আধিপত্য।

স্বনির্ভর। অনেকের মতে স্বেচ্ছাচারী সন্জীদা শরীর নিয়ে অকস্মাৎই আয়নার সমুখে, উত্তরহীন প্রশ্নের সম্মুখীন। শঙ্কা। একে একে তাই সংগঠনগুলোর নির্বাহী প্রধানের দায়িত্ব দিলেন যোগ্য সহযাত্রীদের। ছয়-সাত দশকের যত কাজ। নির্বিঘ্ন থাক। শতায়ু হোক! গড়ে তুললেন ছায়ানটের নানান উপসংসদ। দায়িত্ব বেঁটে দেন তাঁর পানে চাতক-চোখে চেয়ে থাকা সক্রিয় অনুসারীদের। পিছু হঠছেন? শুরু হয়েছে স্বভাবসিদ্ধ, সবার জন্য সব কিছু গুছিয়ে রাখা।

অহর্নিশ যাঁর সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে নিবিড় সংশ্লেষ। ঘরে হোক হোক বাইরে, যাঁর সপ্তাহের সাত দিনই কাটে কোনো না কোনো সেবা-পরিকল্পনা বা কর্মফলের কাটাছেঁড়ায়। তাঁর সময় ও মন দুই-ই, ঘরবন্দী। সংগঠনের সান্নিধ্য ক্রমশ হপ্তায় দু-এক দিন থেকে মাসে দু-একবার, বছরে দৈবাৎ। দিনে দিনে ছেড়ে দিচ্ছেন ছড়ি ঘোরানো কর্তৃত্ব। আলগা হয়ে পড়ছে যাবতীয় কাজ আর সকলের ওপর নিত্যিকার নিয়ন্ত্রণ। সরিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। সহযাত্রীরা ঘরে এসেই খবর জানায়; কথা নিয়ে যায়, দিয়ে যায়। পরামর্শ চাইলে মেলে সাধারণ উত্তর, ‘তোমরা যা ভালো মনে কর’। একসময় হাসনাত, সারওয়ার, মফিদুলের পরামর্শ যেচে, সমর্থন নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। বড় এক কাজ, নববর্ষের কথন। শুনিয়ে নিয়ে নিজেই লিখতেন। দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন সারওয়ারকে। মন তবু খচখচ। কাউকে দিয়ে পড়িয়ে, সংশোধন-সংযোজন করিয়ে তবেই শান্তি! বিদায়ের সুর বাজছে। তবু সেই একরোখা স্বভাব। নীতির প্রশ্নে আপসহীন। সংগঠকদের পইপই করে আদর্শের কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেন না। সর্বৈব সত্যের অনুগামী। বিচ্যুতির আভাস পেলে একে-তাকে ডেকে সতর্ক করেন। কোনো নয়ছয়, নড়চড়, অগোছালো কাজ মোটেই সয় না।

দুই হাজার চব্বিশের গোড়ার দিকে বাঁধা পড়লেন বিছানায়। ফিরে ফিরে মাথা চাড়া দেওয়া ইউটিআই দমাতে ইন্ট্রাভিনাস ইনজেকশন। নিয়মিত ওষুধের বাইরে নিয়ম হয়ে ওঠে ফিজিওথেরাপি, ডায়াপার, ওয়াইপ্স, আন্ডার প্যাড। কিছুতেই নিজের বিছানা থেকে কিনে আনা হসপিটাল বেডে উঠবেন না। কিন্তু খাওয়ার জন্য বসতেই হয়। অগত্যা। তখনো মাথা ঠিকঠাক চলে। কাজ নিয়ে দ্বিধার সমাধান দেন। গান নিয়ে প্রশ্নের উত্তর মেলে। ওষুধে ওষুধে জিভ নিষ্কর্ম, বিস্বাদ বলে খেতে আপত্তি হয়। বোধোদয় থেকে নিশ্চিত উপলব্ধি। সময় ঘনাচ্ছে।

তখন ন্যায্য-অন্যায্যের মিশেলে দেশ ফুঁসছে। পত্রিকা পড়তে পারেন না। জানতে পান না। যে মানুষ বাংলাকে ভালোবেসে জাতিসত্তা আর দেশ গড়ায় জীবনপাত করেছেন তাঁকে বলে কে? লক্ষ প্রাণের রক্ত আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে কেনা একাত্তর আর চেতনার জাতীয়সংগীত রসাতলে পাঠানোর পাঁয়তারা চলছে! চলছে গালাগালি-খুনোখুনি। সাংবাদিক নাতি সৌমিক সতর্ক, নিশ্চুপ। মিনুও নিশ্চাপ। কিন্তু পরিপাটি মেয়ে ওপারের ডাক শুনছেন। শুরু হয় উত্তর পর্বের অধিকারীদের ক্ষয়িষ্ণু সম্পদ আর বর্তমান দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া। যৌথ করে ফেলেছেন নিজস্ব যত ব্যাংক হিসাব। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন কোথায় বাড়ির দলিল, জমির দলিল, দেহদানের কাগজ। স্থির করে নিয়েছেন শেষবার গা ধুইয়ে দেবে দুই নাতনি, অনি-তিন্নি।

সময় গড়ায়। শরীর ভাঙে। নিজস্ব, ঘনিষ্ঠজন আর সমাজের কাজ নিয়ে সদাব্যস্ত সব্যসাচী বলে চলেন ‘এভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ?’। আপনদের জন্য প্রতীক্ষা, ‘কই যে থাকো!’ । মাঝেসাঝে মিলি-লাবনী এসে নখ কেটে দিয়ে যায়; দুলু-সত্যম্ দুটো গান শোনায়। সময় কাটে না। ভাড়াটে সেবিকার কোলে আরও নিভে যেতে থাকেন কর্মচঞ্চলা। কথা কমে যায়। পানি বেড়ে চলে। নিরুপায় সাপ্তাহিক ডায়ালিসিস। কী অবহেলা! পরার্থ, সবার ভালোর সন্ধানী, সবাইকে নিয়ে চলা মানুষটা বড্ডো একা। নিঠুর বাস্তব। অগস্ত্যযাত্রা!

একটু চেতন আছে এমন দু-এক দিন একগুঁয়ে। বেঁকে বসেছেন। কিছুতেই ডায়ালিসিসে যাবেন না। বিছানা থেকে তোলা-নামানোর এক দিনে সেবিকার অবহেলায় বেমক্কা পায়ে লাগল। প্রচণ্ড ব্যথা। কে শোনে কার কথা! ওষুধ-মলম-তাপ চলে। জানার পরেও ডাক্তার উদাস। হপ্তা দুয়েক পরে এক্স-রে। ফ্র্যাকচার। কিন্তু ডায়ালিসিস যে লাগবেই! সেই কাক ভোরে হুইলচেয়ারে তক্তা বসিয়ে যাওয়া-আসা। দুদিন পিছলে পড়লেন। আর্তনাদ নেই। আজীবনের স্বাবলম্বী বাকরুদ্ধ। অসহায়ের মতো, অপলক তিরস্কারের ছায়া নিয়ে চেয়ে থাকেন। ক্ষয়া শরীর নিস্তার পায় না। হানা দিল নিউমোনিয়া। সেবিকারই অবহেলা। যে প্রকৃতির সন্তান এসি, এমনকি ফ্যানের প্রবল বাতাসও সইতে পারেন না তাঁর গায়ের ঘা শুকাতে উদোম করে ফ্যান ছেড়ে রাখা! আশ্রয় হাসপাতাল। সেরে ওঠার আগেই কোমর বেঁধে লাগল অনি। জানবে, যদি তেমন তেমনই ঘটে তবে কি লাইফ সাপোর্ট নেবেন! ‘চাই না’। স্পষ্ট বলিষ্ঠ উত্তর।

হ্যাঁ। মিনুর অবাধ্য কেউই হয়নি। লাইফ সাপোর্ট যোগ হয়নি। লন্ডন থেকে উড়ে এসেছে তিন্নি। গা ধুইয়ে দিয়েছে। বিদায় নিজের শাড়ি পরে, দ্রোহ আর ভালোবাসার প্রতীক, বড় লাল টিপের আভরণ নিয়ে। দেহদান। নিজেকে পূর্ণাঙ্গে নিবেদন করেছেন মানবকল্যাণে, জীবনে-মরণে। জীবন নাটকের সব অঙ্কই তাঁর সাজানো। আপনজনেরা মান্য করেছে। তৎকালীন উগ্রবাদী আর সামাজিক চাপের কাছে নতজানু হয়নি। ঋজু ছিল, মিনুর মতোই। বিদায়ভেলায় চড়েছেন অজুতজনের গানে গানে। প্রিয় শ্রবণ, আপন সাজে সন্জীদা মিলিয়ে গেছেন। হয়তো মিটি মিটি হাসছেন, ‘এখনো শিশুই রয়ে গেলে তোমরা! মনের কালো ঘুচাতে, নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে ভালোবাসতে শেখো, সমান চোখে দেখো। মাথা উঁচু করে চলো। বিনীত কিন্তু চোখে চোখ রেখে কথা বলো। নীতি, সততা, শৃঙ্খলা বাজায় রাখো, পরিপাটি হবে সব কাজ।’ অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাঙালির দেশের চরম দুঃসময়ে, তাঁর শিষ্যরা যেন তিমির রাত্রির অন্ধযাত্রী। সন্জীদার কর্ম আর স্বপ্নের কতটুকু তার ছুঁতে পারছে? আদৌ পারবে কি?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত