Ajker Patrika

পরিপাটি সন্জীদা

পার্থ তানভীর নভেদ্
পরিপাটি সন্জীদা
সন্জীদা খাতুন (জন্ম: ৪ এপ্রিল ১৯৩৩—মৃত্যু: ২৫ মার্চ ২০২৫)

পার্থ তানভীর নভেদ্

সাংবাদিক ও সন্জীদা খাতুনের ছেলে (সন্‌জীদা খাতুনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ২৫ মার্চ। ঈদ ও স্বাধীনতা দিবসের ছুটি থাকায় তাঁর স্মরণে লেখাটি আজ ছাপা হলো।)

কদিন ধরেই ঘ্যান ঘ্যান করছেন। স্টিলের আলমারি থেকে শাড়িগুলো বের করে পাশের ছোট বিছানায় রাখতে হবে। বড় মেয়ে আগেই ছুটি নিয়েছে, বিশেষ সময় দিতে পারেনি। ছোট মেয়ে শরীর-স্বাস্থ্য, ঘর-সংসার আর চাকরি নিয়ে জেরবার। ছেলেই ভরসা।

মাসে বা ছ’মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ক্লাস নেয়; বাকি সময় ছায়ানটের মানুষদের নিয়ে ছোটাছুটি। রোজগারের কথা ভাবলে একরকম বেকারই। মায়েপোয়ের ভালোবাসায় মহামিল—দেশ-জাতি-মনুষ্যত্ব, সংগীত-সংস্কৃতি, ছায়ানট-সমাজসেবা-জনতোষ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। খানিক হলেও ছেলে নিয়মিতই মাকে সময় দেয়। শাড়ি বের করে করে বিছানার ওপর ঢিবি বানাল। অন্তত শ দুয়েক। ডাক পড়ে কাছের-দূরের সব আপনজনের। যে যা নেবে। ফাঁই ফাঁই করে শাড়ি নাই হয়ে যায়। বিছানার চাদর ফের দাঁত কেলিয়ে হাসে। সেই কি নিজেই নাই হয়ে যাবার পূর্বাভাস! নির্ঘাত আঁচ করেই, বিলিবণ্টনের বন্দোবস্ত। কে জানত! অন্তিম যাত্রারম্ভের পদধ্বনি, দেদীপ্যমান অর্ক বুঝি অস্তাচলমুখী।

সন্জীদা গোছানো মেয়ে বরাবরই। নিজের কাজ নিজেই করে নেওয়ায় সড়োগড়ো স্বাবলম্বী। প্রবহমান জীবনে নিশ্চুপ-নিশ্চেষ্ট থাকা ধাতে নেই। সহজাত ধারা। অনুক্ষণ কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত। নিষ্ঠা মজ্জাগত। ধ্যান ঈর্ষণীয়। রুদ্ধশ্বাস ছুটতেন, জানতেন জীবের নিয়তি; জীবনসূর্য ক্ষণস্থায়ী। বিশ্বাস করতেন, দুদণ্ডের এক জীবনের কোনো পল অপচয় করা চলে না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বান্তকরণে লেগে থাকা আর লক্ষ্যে পৌঁছানোই তাঁর একনিষ্ঠ চর্চা। আপন-পর সবার মধ্যেই ছড়িয়ে গেছেন সে সাধনা। কেউ পুরোটা নিয়েছে, কেউ অংশ, কেউ কণাটুকুও নয়।

জ্ঞানচক্ষু ফোটার কাল থেকেই মিনু কাজপাগল, সঞ্চিত সকল ধন আগলে রাখতে পরিপাটি, অর্জিত ঐশ্বর্য নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে উদার। কোথায় পেলেন জীবন বিকিয়ে আহরণ আর বিলি করার এমন অপূর্ব শৃঙ্খলাবদ্ধ মানস? আব্বু-আম্মু-পরিবার-প্রতিবেশ থেকে, নাকি নিজে গড়ে তুলেছেন! কে জানে।

ভাগ্য বটে! মিনু আজন্মই অটুট মনোবলের কিছু সমমনার সান্নিধ্যে। শৈশবে বড়দি যোবায়দা, সেজদি খুরশিদা, পিঠোপিঠি ভাই আনোয়ার। কৈশোরে জুটেছে গানপাগল বন্ধু মাক্কী, ব্রতচারীর কামরুল ভাই; যৌবনের সন্ধিক্ষণে রাজনীতির পাঠ গৃহশিক্ষক সরদার ভাইয়ের কাছে; যৌবনে পেয়েছেন দেশ-সংস্কৃতি-মানবতা ভাবনার ওয়াহিদুল-টুলু-ইমদাদকে। জীবনদর্শন, আকাঙ্ক্ষা, আদর্শ, লক্ষ্য—সব দানা বেঁধেছে একে একে। ছোটবেলায় সোহরাব ভাইয়ের গানের ভেতর দিয়ে নজরুলের ভুবনে প্রবেশ। আব্বু মোতিহারের বাসায় স্বয়ং কাজী সাহেবকে পেয়েছেন।

আলী আহসান স্যারের কাছ থেকে পেলেন রবীন্দ্রনাথের নিবিড় দিশা। সবে মিলে দেশ-দশ নিয়ে আরও পোক্ত আকাঙ্ক্ষা আর কর্মের জগৎ। জীবনসত্য সন্ধানে দিশারিদের আরেক অন্যতম, সত্যেনদা। পুলিশের তাড়া খেলেই অকৃতদার বাম-কর্মী আড়াল খুঁজতেন মিনুর সংসারে। শুধুই আশ্রয়, নাকি ভাবশিষ্য গড়ে তোলা? শ্রদ্ধা-স্নেহাসক্ত ভালোবাসা। মনোভাবনার কত যে বিনিময়! অত বিচিত্র প্রেরণা আর দৃষ্টিকোণেরই নির্যাস, শোষক পাকিস্তানিদের আগ্রাসী নাগপাশ থেকে বাংলা আর বাঙালিকে মুক্ত করার সংকল্প। আয়ুধ? শিল্প-সাহিত্য-সংগীতসংস্কৃতি আর মানবতাবোধ-মুক্তচিন্তা।

রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী ঘিরে এক হলেন মিনুরা। ভাবাদর্শ ঠিক করেন সিধু ভাই, আহমেদুর রহমান, ওয়াহিদুল। প্রণোদন মাহবুব মুর্শেদ, জিসি দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর। ছায়া দিয়ে চলেন সুফিয়া খালাম্মা। ছানা-মানিকের সহযোগ নিয়ে মিনুর বাস্তবায়ন। ভাবাদর্শ নির্ধারণ আর লক্ষ্য অর্জনের পথ নিরূপণেরও অংশী মিনু। ন্যায়নীতির কট্টর অনুসারী। শৃঙ্খলাবদ্ধ বলে সবার অসীম নির্ভরতা। অদ্বিতীয়। সেই একই গুণ, গুছিয়ে কাজ করা। দাঁড়িয়ে যায় ছায়ানট।

একষট্টিতে বড় মাপের, সংবদ্ধ দেশকাজের প্রারম্ভ। তেষট্টিতে গানের স্কুলের উদগম। সাতষট্টিতে নাগরিক বর্ষবরণের প্রবর্তন। নির্ভীক, অদম্য সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পুরস্কার—বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র, পূর্ণ স্বাধীনতা। মুক্ত স্বদেশে তিন প্রবর্তক সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল, সন্জীদার আমৃত্যু সংস্কৃতিসখ্য। একে একে আবির্ভাব ঘটে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, নালন্দা, ব্রতচারীর। যথারীতি সবেতেই মিনুর কাজ–গোছগাছ, শৃঙ্খলাবিধান, তত্ত্বাবধান।

ছায়ানটে সন্জীদার বয়স সুদীর্ঘ ছয় দশক। আগলে রেখেছেন নিষ্ঠার আঁচলে। পাকিস্তানের শোষণকালে ছিলেন সরকারি চাকুরে। তখন আড়াল থেকে; স্বাধীন স্বভূমে আবডাল সরিয়ে। কেজো-মনন। সঙ্গে নীতি-সততা-প্রক্রিয়াবদ্ধ শৃঙ্খলা আর গুছিয়ে চলার মেলবন্ধন। বাড়তি গুণ—মেধা, পরম অধ্যবসায়, অসীম ধৈর্য, গভীর পরিমিতিবোধ, অতল মমতা ও কর্তব্য? নিজে করে অন্যকে বোঝানো। ভবন নিরাপত্তাবিধানে পরিচয়পত্র ধারণের প্রথা। প্রধানকে না চেনে কে? কিন্তু বড় ভাবতে শেখেননি। পরিচয় গলায় ঝুলিয়ে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। সর্বদা সাধারণের কাতারে। বলতেন, নিয়ম সবার জন্য সমান। অন্ধ স্নেহ তাঁকে মাঝেমধ্যে পেড়ে ফেলেছে। পদ চেয়ে কেউ আবদার করে বসলে বলেন, ‘ও তো আমাদেরই সন্তান’! কী মায়া, কী মোহ! স্বজনপ্রীতি নয় কি? তবে স্বজন বলতে মোটেই রক্তের সম্পর্ক বা আত্মীয় বুঝতেন না। একই আদর্শে ঘনিষ্ঠ, কর্মে নিমগ্ন–সমমনা সর্বজনকেই আজীবন আপন মেনেছেন, স্বজন ভেবেছেন।

বরং, জন্মসূত্রে স্ব-জন, সততই বঞ্চিত। পাছে লোকে কিছু বলে! না, লোকলাজ না। সন্জীদা নিরপেক্ষ। কারুকেই কোনো প্রশ্ন তুলতে দিতে নারাজ। সুযোগ্য গাইয়ে আপন কন্যা অপালাকে আড়ালে রেখেছেন। অনুষ্ঠানে গেয়েছে অন্যরা। তাই কি পার পেলেন! লোকে নীলির দিকে আঙুল তুলেছে, ‘দেখ দেখ, নিজের মেয়েকে গাওয়াচ্ছে!’ একরকম সত্যই। অপালার বন্ধু ফ্লোরা-নীলি-জিবীনারা কখনোই আপন মেয়ের চেয়ে কম কিছু ছিল না। চারুশিল্পী ছোট বোন এণু নালন্দা থেকে বিতাড়িত। টুঁ শব্দ নেই। নিজ পেশা আর পরিবারকে ফাঁকি দিয়ে ছেলে অষ্টপ্রহর ছায়ানট ছায়ানট করে। কিন্তু নিজে সভাপতি থাকতে ছেলেকে কিছুতেই মঞ্চ দেবেন না। হোক সে নিছক কোনো সংবাদ সম্মেলন বা সংগীতায়োজন। নিরস্ত করেন, ‘সুর বসে না তোমার’ বা ‘তুমি জানি কেমন উচ্চারণ করো, সিলেব্ল বোঝ না’ অথবা ‘জীবনে কিচ্ছু পড়লে না। কী যে প্যাঁচ মারো! আসল কথাটা লেখো বাক্যের শেষে।’ স্বজন স্নেহধন্যদের রেখে, আদত আপনদের কখনো জায়গা করে দিলেন না। তবু অপবাদ। পরিবারতন্ত্র!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জিয়ার নাম না বলায় বিএনপির স্বাধীনতার অনুষ্ঠান বর্জন, ইউএনও বদলি

ইসরায়েলের পরমাণু বোমার তথ্য ফাঁসকারী আরব ইহুদি ভানুনুর ভাগ্যে কী ঘটেছিল

খারগ দ্বীপের দখলে ভেঙে পড়বে আইআরজিসি, শেষ হবে যুদ্ধ: হোয়াইট হাউস

টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে শিশুসহ নিহত ৫

ইরানের প্রেসিডেন্টের পুত্র ইউসেফ পেজেশকিয়ানের ডায়েরিতে উঠে এল যুদ্ধের চিত্র

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত