Ajker Patrika

দীর্ঘ প্রণয়ের পর বিচ্ছেদের পথে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র

আব্দুর রহমান 
দীর্ঘ প্রণয়ের পর বিচ্ছেদের পথে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র

ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখন এক আশ্চর্য বিচ্ছেদকাল চলছে। অনেকে একে ‘গ্রেট ডিভোর্স’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। একসময় যারা ছিল অভিন্নহৃদয়ের মিত্র, যাদের বন্ধুত্বকে বলা হতো আটলান্টিক সম্পর্কের অটুট বন্ধন, সময়ের ফেরে সেই বন্ধনে এখন গভীর ফাটল ধরেছে।

২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে আসার পর এই দূরত্ব শুধু সাময়িক রাজনৈতিক মনোমালিন্যে আটকে থাকেনি, বরং তা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। ইউরোপ এখন হাড়েমজ্জায় বুঝতে পারছে, তারা আর অন্ধভাবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলস (ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেডকোয়ার্টার্স) এখন আর এক চোখে দুনিয়া দেখছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পুরো মনোযোগ এখন লাতিনে, ‘নিজের আঙিনায়’। তারা তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি আটলান্টিক অঞ্চলে মোতায়েন করতে চাইছে। অন্যদিকে ইউরোপের দরজায় কড়া নাড়ছে রাশিয়ার ভয়। এই যে দুই পক্ষের ভয়ের জগৎ আলাদা হওয়া—এটাই বর্তমান বিভাজনের অন্যতম প্রধান কারণ। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউক্রেন যুদ্ধের দায়ভার ইউরোপের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে এড়িয়ে যেতে চায়। ট্রাম্প প্রশাসনের স্পষ্ট কথা, ইউরোপের নিরাপত্তার খরচ তাদেরই জোগাতে হবে, আমেরিকা আর কতকাল পরদেশি মানুষের পাহারাদার হয়ে থাকবে? এই রূঢ় বাস্তবতা ইউরোপকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ট্রাম্পের বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবের পর এই বিচ্ছেদের পালে সবচেয়ে বেশি হাওয়া দিচ্ছে ফ্রান্স। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ অনেক দিন ধরে বলে আসছেন, ইউরোপকে আমেরিকার ‘ভ্যাসাল’ বা আজ্ঞাবহ হয়ে থাকলে চলবে না। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ওকালতি করছেন। ফরাসি পররাষ্ট্রনীতি এখন স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটন থেকে দূরত্ব বজায় রাখার দিকে ঝুঁকছে।

ফ্রান্স এখন ইউরোপের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা স্ট্র্যাটেজিক অটোনমির প্রধান কারিগর হয়ে উঠেছে। তারা চাইছে ইউরোপের নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে, যেন ন্যাটোর অজুহাতে ওয়াশিংটন তাদের ওপর খবরদারি করতে না পারে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড কেনার জন্য ডেনমার্কের ওপর চাপ তৈরি করে এবং উত্তর মেরুতে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়, তখন ফ্রান্সই প্রথম উচ্চকণ্ঠে এর প্রতিবাদ জানায়।

ফ্রান্সের এই অবস্থান আসলে ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের লড়াই। ডেনমার্ক যখন সাফ জানিয়ে দিচ্ছে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়, তখন ফ্রান্স সেই অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে প্রমাণ করেছে, তারা এখন আর আমেরিকার ছায়াতলে থাকতে খুব একটা ইচ্ছুক নয়। শুধু ফ্রান্স নয়, জার্মানিও একই পথে হাঁটছে। যদিও তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় ততটা সরব নয়, কিন্তু দেশটি ইউরোপের সবচেয়ে বড় ‘প্রচলিত সেনাবাহিনী’ গড়ে তুলতে চায়, যা হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির সবচেয়ে বড় আকারের সেনাবাহিনী।

আস্থার এই সংকটে ঘি ঢেলেছে ভূ-রাজনীতির নতুন মেরুকরণ। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিজের এক নম্বর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থনৈতিক বিবেচনায়, যদিও নিরাপত্তার জায়গা থেকে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে এখন আগের মতো আর ‘প্রধান’ শত্রু ভাবছে না। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আলোকে ট্রাম্প বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন। এর থেকে রেহাই পায়নি ইউরোপও। চীনকেই প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ধরে ওয়াশিংটন তার ইউরোপীয় মিত্রদের বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের চাপ দিচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইউরোপের বড় অংশ তখন হাঁটছে ঠিক উল্টো পথে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪৬ শতাংশ বাণিজ্য এখন এশিয়ামুখী, যার সিংহভাগ দখল করে আছে চীন। ২০২৫ সালের উপাত্ত বলছে, ইইউ এবং চীনের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৮০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফ্রান্সের বড় কোম্পানিগুলো চীনের বাজারে তাদের বিনিয়োগ আরও বাড়িয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও যাচ্ছেন চীন সফরে। সেখানে বড় বড় ব্রিটিশ কোম্পানির সিইওরাও তাঁর সফরসঙ্গী হবেন। চীনের সঙ্গে পুরোনো ‘সোনালি যুগ’-এর পুনরুত্থান ঘটাতে আগ্রহী ব্রিটেন।

ইমানুয়েল মাখোঁ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাইওয়ান ইস্যুতে কিংবা চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ অনুসারী হবে না। ব্রিটেনের বর্তমান নীতিনির্ধারকেরাও এখন মনে করছেন, ব্রেক্সিট-পরবর্তী ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জন্য চীনের বিনিয়োগ অপরিহার্য। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী কানাডাও এখন ওয়াশিংটনের অতিরক্ষণশীল নীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন করে অর্থনৈতিক যোগাযোগের সেতু তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে মিত্ররা যেন চীনকে শত্রুর খাতা থেকে বাদ না দিয়ে বরং কোণঠাসা করে, কিন্তু নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ফ্রান্স, ব্রিটেন আর কানাডা সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বরং চীনের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে।

অর্থনৈতিক এই যুদ্ধের ময়দান আরও উত্তপ্ত হয়েছে শুল্কনীতির কারণে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির দোহাই দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সর্বজনীন শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছে, তখন মিত্রতার চেয়ে ব্যক্তিগত জেদ আর জাতীয় স্বার্থ বড় হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা পরিবেশ রক্ষায় কড়া আইন আনছে, আমেরিকা তখন সব বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে বড় করপোরেটদের সুবিধা দিতে ব্যস্ত।

বিষয়টি উপলব্ধি করেই হয়তো ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের দাভোস সম্মেলনে ট্রাম্পের ‘শুল্কের অন্তহীন নির্বিচার প্রয়োগ’কে ‘মৌলিকভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ইমানুয়েল মাখোঁ। তিনি মনে করছেন, এই শুল্ক ইউরোপের ‘ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চাপ হিসেবে’ ব্যবহার করা হচ্ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষায় তাঁর মত দিয়েছেন। দাভোসে তিনি বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলছি—আমরা রূপান্তরের মধ্যে নেই। আমরা একটি বিচ্ছেদের মধ্যে আছি।’

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের বৈরী মনোভাবকে ১৯৭১ সালের ‘নিক্সন শকে’র সঙ্গে তুলনা করেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র স্বর্ণমান ত্যাগ করে যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উল্টে দিয়েছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপকে ‘স্থায়ী’ভাবে মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং সতর্ক করে বলেছিলেন, ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন আশায় বসে থাকলে ইউরোপের দুর্বলতাই শুধু বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের এই বিভাজন মূলত বিশ্বাসের চরম সংকট থেকে জন্মেছে। ট্রাম্পের অস্থির পররাষ্ট্রনীতি ফ্রান্স ও জার্মানিকে এতটাই শঙ্কিত করেছে যে তারা এখন আমেরিকার বিকল্প হিসেবে নিজেদের গড়ার স্বপ্ন দেখছে।

তাই হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট কাগান বলেছেন, ‘পাশ্চাত্য’ শব্দটি এখন পুরোনো জৌলুশ এবং অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। আগে ইউরোপ ও আমেরিকা মিলে যে একীভূত শক্তির পরিচয় দিত, এখন তা দুটি ভিন্ন স্বার্থের মেরুতে বিভক্ত। ইউরোপ এখন এক বিষণ্ন দোলাচলে দাঁড়িয়ে—একদিকে সাবেক বন্ধুর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে পূর্ব সীমান্তের রুশ ভালুকের ভয়। মাঝখানে পড়ে তারা এখন নিজেদের একলা চলার পথ খুঁজছে। ইতিহাস সাক্ষী, স্বার্থের সংঘাত যখন প্রকট হয়, তখন পুরোনো সব প্রতিশ্রুতি নিমেষে ফিকে হয়ে যায়। আটলান্টিকের দুই পারে এখন সেই ফিকে হয়ে আসা বন্ধুত্বেরই করুণ সুর বাজছে। পশ্চিমা বিশ্বের এই ভাঙন শুধু মানচিত্রের দূরত্ব নয়, এটি একটি যুগের অবসান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত