একের পর এক মন খারাপ করা খবরের তালিকায় যোগ হলো আরেকটি। গত মঙ্গলবার দেশের সব বড় দৈনিকেই খবরটি ছাপা হয়েছে গুরুত্ব দিয়ে। লালমনিরহাটে সাত বছরের এক শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর ভুট্টাখেতে পুঁতে রাখা অবস্থায় পাওয়া যায় অবোধ শিশুটির নিথর দেহ। ঘটনাটি দেশজুড়ে মানুষের মনে বেদনার সঞ্চার করেছে। শুধু বেদনার্ত নয়, অনুভূতিপ্রবণ মানুষকে ক্ষুব্ধও করেছে এই ঘটনা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল এ ধরনের ঘটনায় দুঃখিত আর ক্ষুব্ধ হতেই থাকব, নাকি সমাজের বৃহত্তর সংকটটিকে পরিষ্কারভাবে দেখে প্রতিকারের জন্য সচেষ্ট হব?
লালমনিরহাটের শিশুটি একা নির্মমতার শিকার হয়নি। মাগুরার আট বছরের শিশু আমিনা (ছদ্মনাম), সিলেটের রাজন, বরগুনার রিফাত, নুসরাত জাহান রাফি—এ রকম অনেক শিশুর মৃত্যুর মিছিলের নতুন সংযোজন মাত্র। তারা সবাই এক-একটি বিয়োগান্তক গল্পের করুণ চরিত্র। সবাই একই বাস্তবতার শিকার। প্রত্যেকের মৃত্যু বারবার আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—রাষ্ট্র কি তার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বটি পালন করতে পারছে না?
একটি রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়। রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নাগরিক সুস্থভাবে বেঁচে থাকলেই না উন্নয়ন উপভোগ করবে! যার জন্য উন্নয়ন, সেই মানুষই যদি সর্বক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে বা বেঘোরে মরে, তাহলে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানই একসময় অর্থহীন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বিশাল অবকাঠামো হয়েছে। আমরা পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে। মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে। এসব অর্জন নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সময়ে যদি একজন বাবা তাঁর সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, একজন নারী যদি সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হতে ভয় পান, পথচলতি মানুষ যদি ছিনতাইয়ের ভয়ে থাকেন, ব্যবসায়ী যদি চাঁদাবাজির আতঙ্কে থাকেন, তাহলে উন্নয়নের ছবিটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত কিছু অপরাধের ঘটনার দিকে মন দিয়ে তাকালে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা চোখে পড়ে। অপরাধগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ঘটছে প্রকাশ্যে, কোনো কোনোটি দিনের আলোতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রত্যক্ষদর্শীদের পরোয়া না করে প্রকাশ্যে চলছে হামলা, খুন, নির্যাতন, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এ ধরনের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ দেখে ক্ষুব্ধ হচ্ছে। চায়ের দোকানে, অফিসের আড্ডায় হাহুতাশ করছে। তারপর অবচেতনভাবেই আরেকটি ঘটনা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। নিঃসন্দেহে এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, সমাজ যেন ধীরে ধীরে সহিংসতার প্রতি অসাড় হয়ে পড়ছে। একসময় একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড বা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা জাতীয় আলোচনার বিষয় হতো সপ্তাহজুড়ে। এখন একদিনের আলোচনাকে পরদিনে আরেকটি ঘটনা সরিয়ে দেয়। মানুষের ক্ষোভ কিছুটা থেকে যায়, কিন্তু বিস্ময় বা বেদনার অনুভূতি কমে যাচ্ছে। যদি প্রশ্ন করেন, কেন এমন হচ্ছে? সহজ জবাব—খুন-জখমসহ নানা মাত্রার অপরাধ আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা হলো গণপিটুনির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারের সংস্কৃতি। গণপিটুনি আগেও হতো, তবে সম্প্রতি এ প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। লালমনিরহাটে শিশুর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ক্ষুব্ধ জনতা সন্দেহভাজনদের পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। পুলিশ অনেক ক্ষয়ক্ষতির পর সন্দেহভাজনদের বাঁচাতে পেরেছে। একে নিছক জনরোষ বলা যাবে না মোটেই। বিচারহীনতা বা বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় ত্যক্তবিরক্ত মানুষের আইনের প্রতি আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশও এটি।
যখন মানুষ বিশ্বাস করে আদালত বিচার দিতে দেরি করবেন, তদন্তে প্রভাব পড়বে অথবা অপরাধী শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে পার পেয়ে যাবে, তখন তারা নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু সভ্য সমাজে জনতার বিচার তো কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধ। মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, সাইবার প্রতারণা, কিশোর গ্যাং, মানব পাচার—সব মিলিয়ে অপরাধের ধরন আগের চেয়ে অনেক জটিল ও বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে। খোদ রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা এখন যেন কিশোর অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। প্রায়ই সেখানকার অল্প বয়সী কিশোরেরা ভয়ংকর সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। এত কম বয়সে তারা কেন সহিংস হয়ে উঠছে? কেন হয়ে উঠছে অর্থ বা রক্তলোলুপ? পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, প্রশাসন—সবখানেই কি কোনো না কোনো ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে?
আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক গভীর। কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন একটি দেশে অর্থ লগ্নির কথা ভাবেন, তখন তিনি শুধু জ্বালানি, অবকাঠামো বা কর সুবিধার হিসাব করেন না। তিনি খতিয়ে দেখেন, সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও। এবং ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিরাপদ পরিবেশ আছে কি না। বিশ্বের বহু দেশের অভিজ্ঞতা তা প্রমাণ করে। লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়া একসময় মাদক চক্রের কারণে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়েছিল। সংঘটিত অপরাধ রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে বলে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি ধনী যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তঘেঁষা মেক্সিকো। তবে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা শুধু পুলিশের কাজ নয়। এটি একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।
সংস্কারের মাধ্যমে আমাদের পুলিশকে আরও দক্ষ ও আধুনিক হতে হবে। কাঠামোগত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও কমাতে হবে। সবাই জানেন এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে বেশি দরকার। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সব মহলে কবে সেই সদিচ্ছা জাগ্রত হবে, সেটাই বড় বিষয়।
অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরেও রয়েছে অনেক করণীয়। পরিবারগুলোকে সন্তানদের সহৃদয়তা, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষায় জোর দিতে হবে। প্রযুক্তির পরিবর্তন ও ব্যস্ত জীবনযাত্রার দৌড়ে এ ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি থেকে যাচ্ছে সন্দেহ নেই। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধনও সব ক্ষেত্রে আগের মতো নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও সততা, মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। অর্থ-প্রতিপত্তি-প্রাচুর্যই যে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নয়, তা বোঝাতে হবে শিশুদের। সমাজকে অপরাধের বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হতে হবে।
আইনের চোখে সবাই সমান—রাষ্ট্র যদি এই বার্তাটি স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে অপরাধীর মনে ভয় তৈরি হবে। ধীরে ধীরে অপরাধ কমে এসে সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ফিরবে।
আসলে আইনশৃঙ্খলা নিছক কোনো পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এটি মানুষের অনুভূতিরও বিষয় বটে। মা-বাবা সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে কতটা নিশ্চিন্ত বোধ করছেন, একজন নারী কতটা নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারছেন, একজন ব্যবসায়ী কতটা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারছেন—এসবের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলার প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে থাকে।
লালমনিরহাটের শিশুটি আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। রাজন, রিফাত, রাফি কেউই ফিরে আসবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যু আমাদের সামনে যে প্রশ্ন রেখে গেছে, সেটির উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার পর্যটকদের তাক লাগানো কোনো স্থাপনায় নয়, তার নাগরিকের শান্তি-স্বস্তিতে। বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলো বরাবর ওপরের দিকে থাকে। অন্য ধনী দেশের নাগরিকেরা নিশ্চয়ই এ জন্য ঈর্ষা বোধ করে। তাই একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়নের সূচক তার জিডিপির প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বা রেমিট্যান্স আয় কিংবা সামরিক শক্তি নয়, আইনের শাসন তথা নাগরিক জীবনে স্বস্তির মাত্রায়। স্বাধীনতার দীর্ঘ অর্ধশতক পেরোনোর পর সেই ক্ষেত্রে আমরা কতটা সফল, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এখনই।

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতেই হবে। বর্তমান সরকার দুদক আইন সংশোধনের যে নতুন খসড়া তৈরি করেছে, তাতে সংস্কার কমিশনের যুগান্তকারী প্রস্তাবগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে...
৩ ঘণ্টা আগে
দুই বছর আগে সেদিনের বিকেলে পাওয়া এই সংবাদ আমাকে শুধু হতবাক করেনি, বাক্রুদ্ধও করেছিল। মাত্র ৬২ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছিলেন একসময়কার তুখোড় ছাত্রনেতা ও রাজনীতিবিদ শফী আহমেদ। তিনি আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র এবং জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন।
৩ ঘণ্টা আগে
মন্ত্রিসভার অসম্মতিতে প্রাথমিক শ্রেণিতে সহকারী শিক্ষক (সংগীত) নিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বর্তমান সরকার। বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেছেন। ধারণা করেছিলাম, সংগীত তথা সাংস্কৃতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বর্তমান সরকার ভালো বুঝবে। যদিও দীর্ঘদিন ধরে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষায়...
৩ ঘণ্টা আগে
দুটি প্রতিবেদনে চোখ পড়তেই মনে হলো, এখনই এই ব্যাপারগুলোয় সতর্ক না হলে দেশের রাজনৈতিক স্বাস্থ্য নাজুক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াবে। খবরগুলো সুখকর নয়। কিন্তু তার একটা প্যাটার্ন আছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, যাঁরা এই অঘটনগুলো ঘটাচ্ছেন, তাঁদের রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়।
১ দিন আগে