
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বার্ষিকী ঘিরে কর্মসূচি; ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে মব সৃষ্টি করে রিকশাচালক, হকার, নারী, সাংবাদিকসহ নানাজনকে হেনস্তা-মারধর; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নিজে হামলার শিকার হওয়ার দাবি তুলে প্রতিপক্ষকে পুলিশে দেওয়াসহ নানা কারণে বারবার আলোচনা-সমালোচনায় আসছে একটি নাম—আ ন ম আয়াস। এবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি মুছতে যাওয়ার অভিযোগে তাঁকে আটক করেছে পুলিশ। রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম নামের নিজের একটি সংগঠনও আছে। ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরপর ফুটপাতের দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকা হয়। গত শনিবার দুপুরে সেগুনবাগিচায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এ অভিযোগে আয়াসসহ তিনজনকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানায়। এক তরুণীকে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লাগিয়ে দিতে। আয়াস বা তাঁর সঙ্গের ওই তরুণীকে কে বোঝাবে যে রবীন্দ্রনাথ বা সত্যজিৎ রায়ের মতো মনীষীদের ছবিতে কালি লাগালে সেটি তো তাঁদের গায়ে লাগে না, লাগে জাতির ললাটে।
আয়াসের দাবি, তিনি একসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব ছিলেন। যদিও এই দাবির সত্যতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, ময়মনসিংহে নানা অপকর্মে জড়িয়ে ঢাকায় এসে তিনি ‘জুলাই যোদ্ধা’ সেজেছেন। ঢাকায় এসে প্রথম আলোচনায় আসেন গত ৪ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংঘাতে জড়িয়ে। ওই দিন নতুন ধারা বাংলাদেশ (এনডিবি) এবং রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর আগে আয়াস জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও শহীদদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে নতুন ধারা বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান শান্তা ফারজানাকে চড় মেরেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জের ধরে দুই সংগঠনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলাকালে সংঘর্ষ হয়। গত বছরের ২৬ মে ময়মনসিংহে হামলার শিকার হয়েছিলেন আয়াস। পরে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা আয়াসের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। তবে কারা কী কারণে হামলা করেছিলেন, তা তখন নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। ১৬ আগস্ট ময়মনসিংহের ভালুকায় আবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন আয়াস। তাঁর দাবি, সংগঠনের কাজে সেখানে গেলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১৫ থেকে ২০ জন নেতা-কর্মী তাঁর ওপর হামলা চালান। একপর্যায়ে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনার পর আয়াসের নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেদিন সন্ধ্যায় তিনি নিজেই ভালুকা মডেল থানায় গিয়ে হামলার অভিযোগ করেন মৌখিকভাবে। থানার তখনকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আয়াস প্রায় ১০ মিনিট থানায় অবস্থান করেন। তাঁকে পুলিশি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা নেননি।
বাংলাদেশে চব্বিশের ৫ আগস্টের পর নতুন রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির উত্থান হয়েছে। এর মধ্যে আছে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দিয়ে প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্যে অপমান; মব সৃষ্টি করে হেনস্তা-মারধর, সংঘর্ষ; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন গালিগালাজসহ উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এবং কখনো কখনো আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ব্যক্তিবিশেষের মরাল পুলিশের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হওয়া ইত্যাদি। রাজনীতিতে যুক্তির জায়গা দখল করছে গালি। আলোচনার জায়গা নিচ্ছে মারামারি। আইনের জায়গা দখল করছে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়! এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে আলোচনায় আসা অন্যতম নাম আয়াস। প্রশ্ন হচ্ছে, একজন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠকের কর্মকাণ্ড কেন বারবার বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে? ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কি বারবার নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া যায়? এ ছাড়া কেউ অপরাধ করেছে বলে সন্দেহ হলেই কি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী তাঁকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা মারধর করতে পারেন? অপরাধের অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার দেয় না। কেউ ‘জুলাই যোদ্ধা’ হলে তাঁর সম্মান থাকতে পারে, তাঁর ত্যাগের স্বীকৃতি থাকতে পারে; কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে থাকার অধিকার থাকতে পারে না।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার যেন মবকে নিঃশর্ত লাইসেন্স দিয়ে রেখেছিল। সাধারণ মানুষ এটিকে ভালোভাবে নেয়নি। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত সরকার মব সন্ত্রাস থেকে সমাজকে মুক্ত করবে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা বিভিন্ন সময়ে সে অঙ্গীকার ব্যক্তও করেছেন প্রকাশ্যে। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যায়নি। এখন সেই অঙ্গীকার তাঁরা কতটা রাখবেন, তার ওপর কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। মরাল পুলিশিং, মব সন্ত্রাস—এগুলো মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির পরিচায়ক। বিএনপি কি এ ধরনের সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হয়ে স্বস্তিবোধ করবে? এমনিতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি মুছতে যাওয়ার ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং এবং ইউরোপের এয়ারবাস কোম্পানির সঙ্গে বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার চুক্তি করে রীতিমতো আন্দোলন মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে।
আয়াস ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লাগানোকে আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াই হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির নামে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেশের নিরাপত্তাসহ জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার সময় এরা টুঁ শব্দটিও করে না। পেন্টাগনের দোসর হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে বন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনার টার্মিনাল পরিচালনার ভার ছেড়ে দেওয়ার বিষয়েও এরা নীরব। বরং এনসিটির দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলন থেকে মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে সরানোর কোনো দুরভিসন্ধি থেকে তারা এমন নোংরা কাজে লিপ্ত হলো কি না, তেমন সন্দেহ করা যেতেই পারে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের চরিত্রটি বহু বছর ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ খ্যাত এশিয়ার বৃহত্তম আদমজী পাটকলটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে। জাতীয় সংসদ বহাল থাকা সত্ত্বেও তখন বিষয়টি নিয়ে এতটুকু আলোচনা করা হয়নি। ২০০২ সালের ৩০ জুন আদমজী পাটকল বন্ধ করে দেওয়ার পর এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে তখনকার অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে একজন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, সংসদে আলোচনা না করে আদমজী পাটকল বন্ধ করে দেওয়ার মতো এত বড় সিদ্ধান্তটি নেওয়া কী ঠিক হলো? জবাবে মন্ত্রী নাকি বলেছিলেন, বাংলাদেশের সংসদ এতটাও সার্বভৌম নয় যে সব বিষয়ে সেখানে আলোচনা করতে হবে। বিশ্বব্যাংক তখন কাজটি করেছিল মূলত ভারতের স্বার্থে। যে কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে টাকা দেওয়া হয়েছিল গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে পাটশিল্পের জনবলকে বিদায় দিতে, একই সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বিশ্বব্যাংক তখন ভারতকে অর্থ দিয়েছিল তাদের পাটশিল্পকে আধুনিকায়ন করতে।
সেই পুরোনো প্রবণতার সবশেষ বড় দৃষ্টান্ত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ঘিরে সরকারের তৎপরতা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কোন দায় বা তাগিদের কারণে সব যুক্তি-তথ্য অগ্রাহ্য করে নির্বাচিত সরকার জাতীয় স্বার্থবিরোধী এমন চুক্তি করতে উদ্যত হয়? চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার চুক্তি করার জন্য রীতিমতো জবরদস্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তখন চুক্তিটি না হলেও এই কোম্পানির কর্মকর্তারা বন্দরে আসা-যাওয়া শুরু করেন ইউনূস আমল থেকেই। সেই সময়েই বন্দরের সব রকম মাশুল অনেক বাড়ানো হয়েছে। আগে থেকেই বিদেশি কোম্পানির উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো যুক্তি এর পক্ষে পাওয়া যায় না। এই চুক্তিটিও ভারতের জন্য স্বস্তিদায়ক বলেই মনে করা হচ্ছে। বন্দরের যেসব সমস্যার যুক্তি দেখানো হচ্ছে, সেগুলোর কারণ সমুদ্রের গভীরতা, কাস্টমস ও আমলাতন্ত্র। এসবের সমাধান সরকারের হাতে, বিদেশি কোম্পানির হাতে নয়। সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এভাবে গোপন তৎপরতায় বিদেশি কোম্পানি লাগবে, মাশুল বাড়াতে হবে—এসবই খোঁড়া যুক্তি। কেউ কেউ দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তির কথা বলছেন। কিন্তু টার্মিনালে ইতিমধ্যে সব প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। এ ছাড়া বন্দর পরিচালনার ভার কাকে দেওয়া হবে বা না হবে, তা শুধু কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। একটি দেশের বন্দর হলো কৌশলগত সম্পদ, যার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কযুক্ত। যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে সরকার টার্মিনালটি পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় সেই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ দেয়নি।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

দুর্গাপূজাকে আমরা শারদীয় উৎসব নামেও ডেকে থাকি। শরৎকাল বাংলাদেশের এক অপূর্ব ঋতু। যদিও কাগজ-কলমে ছয়-ছয়টি ঋতু, কিন্তু বাস্তবে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত—এরাই টিকে আছে। তবু আরেকটি ঋতু নীরবে এসে দাঁড়ায়। মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে এই পোড়ার সমাজে, ভঙ্গুর রাষ্ট্রে সর্বদা ক্রন্দনরত দেশে শিউলি ফোটে।
৩ ঘণ্টা আগে
৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরপর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে ফুটপাতের পাশের দেয়ালে ১০ জন গুণী ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়।
৩ ঘণ্টা আগে
এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি ভালো বীজের গল্প, সঠিক সময়ে সেচ পাওয়ার গল্প, প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার গল্প, কৃষকের নিরলস শ্রম এবং সর্বোপরি একটি জাতির খাদ্য নিরাপত্তার গল্প। ধানের শিষটি যখন কৃষকের মাঠে দুলতে থাকে তখন তার পেছনে কাজ করে যায় বহু প্রতিষ্ঠানের নীরব প্রচেষ্টা।
১০ ঘণ্টা আগে
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশের অন্যতম মশা গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদ। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। মশা নিয়ে জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।
১ দিন আগে