জনগণের কষ্টার্জিত করের পয়সায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের উচিত হবে বিডাকে চটকদারিত্ব ও চমক সৃষ্টির সস্তা কৌশলচর্চা থেকে সরিয়ে এনে বৈদেশিক বিনিয়োগ উন্নয়নের একটি পরিপূর্ণ পেশাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এবং এর আচরণকে সে অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করা।

সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার আমলের যে চটকদার গল্পগুলো মানুষকে প্রচণ্ডভাবে বিরক্ত করে তুলেছিল, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কণ্ঠোত্থিত ‘আগামী ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমিতে করবে’ এবং ‘বাংলাদেশ হবে বিশ্ববাসীর জন্য আশার বাতিঘর’। একই ধারার অন্য দুটি কল্পকাহিনি ছিল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর। তিনি ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের সমকক্ষ বানাতে চেয়েছিলেন এবং আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে অঙ্গীকার করেছিলেন ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বেজার (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ) পাঁচটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫৫০ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আড়াই লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে। মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত সেই ঈদ চলে এল এবং প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে বাংলাদেশ এখনো সেই আগের মতোই চরম অন্ধকারে খাবি খাচ্ছে। আর কোন রহস্যবলে বাংলাদেশ কবে নাগাদ কীভাবে বিশ্ববাসীর জন্য আশার বাতিঘর হয়ে উঠবে, ক্ষমতা ত্যাগের আগে সেটি আর মুহাম্মদ ইউনূস কাউকে জানিয়ে যাননি।
এদিকে আশিক চৌধুরীও আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানানোর গল্প থেকে এতটুকু সরে আসেননি এবং নতুন সরকারের কাছেও তাঁর সে গল্প পছন্দনীয় হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে, যে কারণে তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল হলেও বিডার শীর্ষ নির্বাহী পদে সেটি ঘটেনি। বিষয়টি দেখে ভয় হচ্ছে এই ভেবে যে বৈদেশিক বিনিয়োগ উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শ্রুতিরঞ্জক ও চমকদার গল্প বলার সেই পুরোনো ধারা কি তাহলে নতুন সরকারের আমলেও অব্যাহত থাকবে? ভয়মিশ্রিত কণ্ঠে প্রশ্নটি করা এ কারণে যে বেজার পাঁচ অর্থনৈতিক অঞ্চলে দুই বছরে ৫৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ ও আড়াই লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণার পর ইতিমধ্যে সোয়া বছর পেরিয়ে গেছে; কিন্তু তারপরও এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। এতৎসত্ত্বেও এ কাজে যদি সেই পুরোনো গল্পকারদেরকেই বহাল তবিয়তে থাকতে দেখা যায়, তাহলে এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় কি?
গত ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিডা পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে তাঁদেরকে নগদ প্রণোদনা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে চাহিদানুগ ও কার্যোপযোগী বস্তুগত পরিবেশ সৃষ্টি না করে নিছক চমক সৃষ্টিমূলক যেসব কথাবার্তা বছর দেড়েক ধরে বিডার আওতায় দেশে চালু ছিল, এটি ছিল তার সর্বশেষ সংযোজন। আর অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে নেওয়া এ ধরনের অবাস্তব সিদ্ধান্তকে কার্যত উদ্ভট মনে হলেও এর পেছনে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত কোনো স্বার্থ লুকিয়ে থাকাটাও অসম্ভব নয়। আসলে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির নাম করে স্টারলিংকের মতো দু-একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম ভঙ্গ করে নানা সুবিধা পাইয়ে দেওয়া ব্যতীত এ ক্ষেত্রে এ সময়ের মধ্যে আর তেমন কিছুই ঘটেনি। তারপরও ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে বিডার বস্তুতই কোনো যোগসাজশ কিংবা হীনতাপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। আর তেমনটি যদি নাও থাকে তাহলেও স্বীকার করতে হবে যে, বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সৃষ্টি না করে প্রবাসীদের নগদ প্রণোদনা দিলেই তাঁরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধরে এনে হাজির করতে পারবেন—এ ধারণা একেবারেই অবাস্তব।
নগদ প্রণোদনা দিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে এর আগেও গত বছরের ২৯ মে তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টাকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তখনো অত্র লেখক কর্তৃক ওই উদ্যোগের যুক্তিহীনতা উল্লেখপূর্বক এর বিরোধিতা করা হয়েছিল। যুক্তি এড়িয়ে গঠিত ওই কমিটি শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল কি না, অদ্যাবধি তা জানা যায়নি। অথচ পূর্ববর্তী সে উদ্যোগ থেকে কোনো বাস্তব ফলাফল না পাওয়া সত্ত্বেও পুনরায় নগদ প্রণোদনা দিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের অনুরূপ ভ্রান্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেন কোন যুক্তিতে গ্রহণ করা হলো, তা একটি গুরুতর প্রশ্ন বৈকি। এটি কি নিছকই চমক সৃষ্টি করার জন্য করা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো হীন উদ্দেশ্যও ছিল? সন্দেহ করার কারণ এই যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বৈদেশিক চুক্তি ও বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের কোনো না কোনোরূপ গোপনীয়তা, অস্বচ্ছতা ও জনস্বার্থবিমুখতার আশ্রয় নিতে দেখা গেছে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর নাম করে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা (যিনি বিডা পরিচালনা পর্ষদেরও চেয়ারম্যান ছিলেন), বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান প্রমুখেরা অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো মেয়াদকালেই রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের নানা দেশ বলতে গেলে চষে বেড়িয়েছেন। আর এর মোদ্দা ফলাফল দাঁড়িয়েছিল এরূপ যে এ উপলক্ষে যেসব দেশ তাঁরা সফর করেছিলেন, সেসব প্রতিটি দেশ থেকেই বিনিয়োগ কমে গিয়েছিল। ধারণা করা যায়, এসব সফরের সময় নিশ্চয়ই তাঁরা মনোরঞ্জনকারী নানা কথাবার্তা বলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মুগ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সেসব চটকদার রংমাখানো নানা কথাবার্তার পরও যে ওই সব দেশ থেকে বিনিয়োগ না বেড়ে উল্টো কমে গেল, তা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়—শুধু কথার ঝিল্লি দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় না; এর জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগের বাস্তব পরিবেশ। কিন্তু সে পরিবেশ সৃষ্টি না করে একতরফাভাবে মুখরোচক গল্প বলতে থাকলে সংশ্লিষ্টরা তাতে বরং আরও বিরক্ত
হন। আর তারই ফল হচ্ছে, উল্লিখিত সফরসমূহের পর ওই সব দেশ থেকে বিনিয়োগ কমে যাওয়া। কিন্তু বিডা কর্তৃপক্ষ কি সেটি বুঝতে পারছে? নাকি বুঝেও নিছক কল্পিত জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে তারা এসব করে যাচ্ছে?
বিনিয়োগ উন্নয়ন বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা রাখেন, এমন ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করবেন যে বৈদেশিক কিংবা স্থানীয় কোনো বিনিয়োগই আসলে চটকদার কথাবার্তা, চমক সৃষ্টিকারী উপস্থাপনা কিংবা মনোরঞ্জনকারী গল্পের ফুলঝুরি দিয়ে হয় না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আনুষঙ্গিক ভৌত অবকাঠামো, বিনিয়োগ মূলধনের কার্যকর ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক উদ্যোক্তাদের হয়রানিবিহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রদান ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সহায়ক সেবা ও উপকরণের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিডা যদি ক্ষণে ক্ষণে নানা চটকদার কথাবার্তা বলে বেড়ায়, তাতে মূল কাজটি আদৌ কি এগোবে? মনে হয় না, যার প্রমাণ গত দেড় বছরে বহুবারই পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডার আওতায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবের নিবন্ধন কমেছে ৫৮ শতাংশ। এ তথ্য প্রমাণ করছে যে বিনিয়োগ উন্নয়নের জন্য, তা সেটি স্থানীয় বা বৈদেশিক যা-ই হোক না কেন, প্রয়োজনানুগ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে শুধু ভালো পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা আর রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে উপর্যুপরি চমক সৃষ্টিকারী কথাবার্তা ও চটকদার বক্তব্য দিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়।
অতএব জনগণের কষ্টার্জিত করের পয়সায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের উচিত হবে বিডাকে চটকদারিত্ব ও চমক সৃষ্টির সস্তা কৌশলচর্চা থেকে সরিয়ে এনে বৈদেশিক বিনিয়োগ উন্নয়নের একটি পরিপূর্ণ পেশাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এবং এর আচরণকে সে অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করা। আর সে লক্ষ্যে জনপ্রিয় ভোটে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণকারী নতুন সরকারের সর্বাগ্র করণীয় হবে বিডার নেতৃত্বকে অবিলম্বে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বিশ্বাসের অনুগামী করে ঢেলে সাজানো। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে যে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের পর ইতিমধ্যে মাস পেরিয়ে গেলেও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে বিনিয়োগ ও উন্নয়নের চটকদার গল্প বলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ব্যক্তিই এখনো বহাল আছেন। বিষয়টি স্পষ্টতই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভুল বার্তা প্রদান করছে। এমতাবস্থায়, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে তো বটেই, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থা ও বিশ্বাসের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব বিডার শীর্ষ পর্যায়কে ঢেলে সাজানো জরুরি বলে মনে করি।
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়

অনেক সময় অন্যায্যভাবে যদি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র অন্যের ওপর জোরজবরদস্তি করতেই থাকে, একসময় সেই ব্যবস্থার পতন হবে। একসময় না একসময় এর জবাব দিতে হবেই। তাই তো কথায় আছে, ‘দিনে দিনে যত বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ’।
৩ ঘণ্টা আগে
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে মব সৃষ্টি করে মেদিনী সাগর বিএম মহাবিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়া পদের নিয়োগ পরীক্ষার খাতা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
৩ ঘণ্টা আগে
আজ পবিত্র শবে কদর। পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য এক বিশেষ উপহার এই রজনী। যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আজ সারা দেশে পালিত হবে এই মহিমান্বিত রাত।
১ দিন আগে
ইতিহাসের চাকা ঘুরে আবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল, যখন রক্তক্ষয়ী জুলাইয়ের স্মৃতি আর নতুন সূর্যের আবাহন নিয়ে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
১ দিন আগে