
গণ-আন্দোলনের পর দেশের পুলিশ বাহিনীর সংস্কার নিয়ে যে আশার আলো জ্বলেছিল, তা নিভে গেছে। ব্যর্থ হয়েছে সব উদ্যোগ। পুলিশকে পুতুলনাচের পুতুলের মতো ওপর থেকে কেউ সুতা ধরে নাচাতে থাকবে—এই অবস্থা থেকে বাহিনীটিকে বের করে আনা যায়নি। এই ব্যর্থতা আবারও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভবিষ্যৎ স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করল। পুলিশ সংস্কারের চেষ্টা আগেও হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সে কথাগুলো বলেই আসব বর্তমান সময়ে।
২০০৭ সালের কথা। সেবার পুলিশ বাহিনী খুব হইচই করে একটি জরিপ করল। দেশের সব থানা-ফাঁড়িকে এ কাজে লাগানো হলো। ৬৬ হাজারের বেশি নমুনা নিয়ে তৈরি করা হলো বিশাল আকারের এক প্রতিবেদন। বিষয়—পুলিশ বাহিনীর সংস্কার। তখন ইউএনডিপির অর্থায়নে ‘পুলিশ সংস্কার প্রকল্প’-এর কাজ কেবল শুরু হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রকল্পের টাকা ঢালা হলো জরিপের কাজে।
এরপর সেই জরিপ ধরে তৈরি হলো ‘পুলিশ সংস্কার আইন ২০০৭’-এর খসড়া। সেই খসড়া নিয়ে এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে দৌড়ানো শুরু করলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। দিকে দিকে রব উঠে গেল—পুলিশ এবার স্বাধীন হচ্ছে। কিন্তু মুখে বললেই তো আর কেউ স্বাধীন হয় না। পুলিশের ক্ষেত্রেও তা-ই হলো। ধামাচাপা পড়ে গেল আইনের খসড়া। পুলিশ কর্মকর্তারাও হাল ছেড়ে দিলেন। সব দোষ রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে তাঁরা বললেন, রাষ্ট্র চায় না, তাই পুলিশের সংস্কারও হয় না। এখন প্রশ্ন করুন—রাষ্ট্র আসলে কেমন পুলিশ চায়? রাষ্ট্র কি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী পুলিশ চায়, নাকি ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষাকারী পুলিশ চায়?
গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে দ্বিতীয় পথটিকেই বারবার বেছে নিয়েছে। ফলে পুলিশ সংস্কার নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, বাস্তবে তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে—এবং এই ব্যর্থতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি সচেতন রাজনৈতিক পছন্দের ফল হিসেবেই ঘটেছে।
ইউএনডিপির ২০০৭ সালের সেই প্রকল্প শেষ হওয়ার পর অনেক বছর আর পুলিশ সংস্কার নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেনি। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর সংস্কার নিয়ে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হলো। কারণ, এই আন্দোলনটি কেবল সরকারবিরোধী ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্র বদলানোর দাবিরও। বিশেষ করে পুলিশ নামের যে প্রতিষ্ঠানটি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও শক্তিশালী সংযোগ, তার সংস্কার ছিল এই আন্দোলনের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশনের দাবি ছিল স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক।
অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সে দাবি শুনল। কমিশন তৈরি হলো। কমিশন একটি অধ্যাদেশও জারি করল। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর জারি হওয়া পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশটি সেই প্রত্যাশাকে শুধু ভেঙেই দেয়নি; বরং এটি প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্র এখনো পুলিশ সংস্কারকে একটি নিয়ন্ত্রিত নাটক হিসেবেই দেখতে চায়। অধ্যাদেশটি দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়—গা বাঁচাতে অন্তর্বর্তী সরকার শুধু সংস্কারের দাবিই সামাল দিতে চেয়েছে, সংস্কারের কিছুই করতে চায়নি।
এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এটি ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে ব্যবহার করেছে, কিন্তু স্বাধীনতার মৌলিক শর্তগুলোকে পরিকল্পিতভাবে এড়িয়ে গেছে। যে কমিশনের কাজ হবে পুলিশের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সেই কমিশনকেই রাখা হয়েছে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছায়ায়। এর অর্থ দাঁড়ায়, পুলিশ নিজেই কার্যত নিজের ওপর নজরদারি করবে—যা যুক্তি ও অভিজ্ঞতা—দুটোর সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
স্বাধীনতা মানে কেবল একটি আইনগত সত্তা হওয়া নয়। স্বাধীনতা মানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, তদন্তে ও সুপারিশে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও পুলিশি চাপ থেকে মুক্ত থাকা। কিন্তু প্রস্তাবিত কাঠামোতে কমিশনের গঠন, নিয়োগপ্রক্রিয়া, আর্থিক নির্ভরশীলতা ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এটিকে এমনভাবে বেঁধে ফেলা হয়েছে, যাতে প্রকৃত স্বাধীনতা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে এই কমিশন একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের বদলে ‘লোকদেখানো’ সংস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই জন্ম নিচ্ছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের সংস্থা শেষ পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও কর্মকর্তাদের জন্য একটি আরামদায়ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে চলে বৈঠক, প্রতিবেদন তৈরি ও আনুষ্ঠানিকতা—কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, গুম, নির্যাতন কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহি আর হয় না।
বাংলাদেশের পুলিশব্যবস্থা এখনো মূলত পরিচালিত হয় ১৮৬১ সালের ঔপনিবেশিক পুলিশ আইনে। এই আইনটি তৈরি হয়েছিল জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং ব্রিটিশ শাসকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। বিদ্রোহ দমন, ভয় দেখানো ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—এই ছিল এর মূল দর্শন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলালেও এই দর্শন বদলায়নি। ফলে পুলিশ বাহিনী আজও জনগণের কাছে নয়, নির্বাহী বিভাগের কাছে দায়বদ্ধ।
সংবিধান স্পষ্টভাবে বলে—বাংলাদেশ একটি প্রজাতন্ত্র, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক জনগণ। সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের আশ্রয় লাভ, নির্যাতন থেকে সুরক্ষা এবং জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পুলিশ বাহিনীর কর্মকাণ্ড এই সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গে বারবার সাংঘর্ষিক হয়েছে। এই সংঘর্ষ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা।
স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশকে রাষ্ট্র গঠন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে পুলিশ সংস্কার উপেক্ষিত থেকেছে। সামরিক ও আধাসামরিক শাসনামলে পুলিশকে আরও স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণমূলক বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
১৯৯১ সালে দেশে গণতন্ত্র ফেরার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, পুলিশও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে হাঁটবে। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশও দলীয়করণের গভীরে ঢুকে পড়েছে। বিগত কয়েক দশকে পুলিশ বাহিনীর বদলি, পদোন্নতি, মামলা ও গ্রেপ্তার রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। বিরোধী দল দমন, আন্দোলন ভাঙা, নির্বাচনী মাঠ ‘পরিষ্কার’ রাখা—এসব কাজে পুলিশের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। এই বাস্তবতায় পুলিশ সংস্কার মানে শুধু বাহিনীর দক্ষতা বাড়ানো নয়; এর অর্থ হলো সরকারের নিজস্ব ক্ষমতার একটি বড় অংশ ছেড়ে দেওয়া। আর এই জায়গাতেই সব সংস্কার উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
এত দিন বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কারের নামে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার বেশির ভাগই ছিল খণ্ডিত ও নিরাপদ সংস্কার। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন—পুলিশ কাকে জবাবদিহি করবে—এই প্রশ্নটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কাঠামোগত রদবদল, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চর্চা বন্ধ করা এবং স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠা উপক্ষিত হয়েছে।
আজকের বাস্তবতায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানেন—আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো মানে নিজের চাকরিজীবন ঝুঁকিতে ফেলা। আর রাজনৈতিক নির্দেশ পালনে দক্ষ হলে পুরস্কার হবে নিশ্চিত। এই কাঠামোর ভেতরে সংস্কার মানে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত—এ কথা পুলিশ কর্মকর্তারাও ভালো করেই বোঝেন।
এ কারণেই স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থার প্রশ্নটি এত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব প্রায় সব সময়ই পুলিশের হাতেই রাখা হয়েছে। ফলে জবাবদিহির বদলে দায়মুক্তি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি দেখিয়ে দিয়েছে—রাষ্ট্র এই স্বাধীনতাকে কেবল কাগজে রাখতে চায়।
কমিশনের গঠনেই এই নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট। অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করার সিদ্ধান্ত কমিশনের ভেতরে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কেন্দ্র তৈরি করে, যা স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে। ক্ষমতার প্রশ্নে কমিশনকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে সুপারিশে—বাস্তবায়নের কোনো বাধ্যতামূলক ক্ষমতা নেই।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পুলিশ সংস্কারের ইতিহাস আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এখানে সমস্যা দক্ষতার নয়, আইনগত ভাষারও নয়। সমস্যার মূল রাজনৈতিক সদিচ্ছার। যত দিন পর্যন্ত পুলিশকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাবে না, তত দিন পর্যন্ত সংস্কার কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এখন এটা স্পষ্ট যে রাষ্ট্র আসলে এমন পুলিশ চায় না, যে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। সে কারণেই পুলিশ সংস্কার বারবার ব্যর্থ হয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি আদৌ সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, যেখানে পুলিশ জনগণের পক্ষে দাঁড়াবে—ক্ষমতার পক্ষে নয়? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ না হয়, তবে ইতিহাসের মতো ভবিষ্যতেও পুলিশ সংস্কার ব্যর্থতাই নিয়ম হয়ে থাকবে—এবং তার মূল্য দিতে থাকবে সাধারণ নাগরিক। তো সেটাই হচ্ছে।

ঢাকা শহরের বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম বাড়িভাড়া। এ শহরে বসবাসরত বিশেষ করে দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের উপার্জনের একটা বড় অংশ বাড়িভাড়াতেই চলে যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ২০ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ১৬ দফা নির্দেশিকা দিয়েছে।
১৬ ঘণ্টা আগে
সরস্বতী হলেন বৈদিক যুগের অন্যতম প্রধান দেবী, যিনি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিল্পকলা, সংগীত ও সৃজনশীলতার প্রতীক। হিন্দু বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব হলো সরস্বতীপূজা। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতীপূজা আয়োজিত হয়।
১৬ ঘণ্টা আগে
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে পুরো বাংলায়ই এক অস্থির সময় বিরাজ করছিল। বাঙালি মুসলমান সমাজ ছিল গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও শাস্ত্রের অন্ধ অনুশাসনে আড়ষ্ট। ঠিক সেই পরিবেশে ঢাকাকেন্দ্রিক এক ঐতিহাসিক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সৃষ্টি হয়। এই জাগরণ ইতিহাসের পাতায় ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে সুপরিচিত।
১৬ ঘণ্টা আগে
সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা করেছে একদল দুর্বৃত্ত। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক খবর হলো, এই হামলায় নিহত হয়েছেন র্যাব কর্মকর্তা মো. মোতালেব হোসেন। র্যাবের আরও তিন সদস্য এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন। ১৯ জানুয়ারি বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার...
২ দিন আগে