Ajker Patrika

কেন চাই জাতীয় ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট ও দেশব্যাপী পরীক্ষাগার নেটওয়ার্ক

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
কেন চাই জাতীয় ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট ও দেশব্যাপী পরীক্ষাগার নেটওয়ার্ক
ফাইল ছবি

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হলেই হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসকের সংখ্যা, ওষুধের দাম কিংবা যন্ত্রপাতির সংকট সামনে আসে। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক, অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত ভিত্তি হলো রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষাগার সেবা। রোগটি কী, কতটা গুরুতর, কোন জীবাণু দায়ী, কোন ওষুধ কার্যকর, ক্যানসারের ধরন কী, রক্ত দেওয়া নিরাপদ কি না—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর না মিললে চিকিৎসা অনেক সময় অনুমান নির্ভর হয়ে পড়ে।

একটি ভুল বা বিলম্বিত পরীক্ষার ফল শুধু একটি রিপোর্টের ভুল নয়; এটি ভুল ওষুধ, অপ্রয়োজনীয় ভর্তি, অকারণ ব্যয়, চিকিৎসায় দেরি এবং কখনো কখনো প্রাণহানির ঝুঁকি। তাই আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরীক্ষাগারকে হাসপাতালের সহায়ক সেবা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রোগীর নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কেন্দ্রীয় অবকাঠামো।

এই বাস্তবতায় স্বশাসিত, বৈজ্ঞানিক ও জবাবদিহিমূলক একটি আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং তার অধীনে জাতীয় থেকে উপজেলা পর্যন্ত স্তরভিত্তিক পরীক্ষাগার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সময়ের দাবি। এটি কোনো একটি ভবন বা কিছু ব্যয়বহুল যন্ত্রের প্রকল্প নয়; এটি নির্ভুল রোগ নির্ণয়, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মোকাবিলা, খাদ্য-পানি-রক্তের নিরাপত্তা এবং তথ্যভিত্তিক স্বাস্থ্য নীতি গড়ার জাতীয় কাঠামো।

পরীক্ষার ফলই চিকিৎসার পথ নির্দেশক

চিকিৎসকের ক্লিনিক্যাল বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পরীক্ষার ফল দিয়ে নিশ্চিত ও পরিমার্জিত হয়। বুক ব্যথার রোগীর ক্ষেত্রে ট্রোপোনিন; কিডনি রোগে ক্রিয়েটিনিন; ডায়াবেটিসে রক্তের শর্করা ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সূচক; সংক্রমণে কালচার ও অ্যান্টিবায়োগ্রাম; ক্যানসারে টিস্যু পরীক্ষা ও বিশেষ রঞ্জন; থাইরয়েড, লিভার কিংবা রক্তরোগে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগার ফল—সবই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

একই পরীক্ষার ফল একেক জায়গায় একেক রকম হলে রোগী বিভ্রান্ত হন, চিকিৎসক নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়। নমুনা সংগ্রহে ভুল, পরিবহনে বিলম্ব, রিঅ্যাজেন্টের মান বা সংরক্ষণে ত্রুটি, যন্ত্রের ক্যালিব্রেশনের ঘাটতি কিংবা প্রতিবেদনের ভুল যাচাই—যেকোনো একটি কারণে ফলের মান নষ্ট হতে পারে।

চিকিৎসা পরীক্ষাগারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘আইএসও ১৫১৮৯’ শুধু যন্ত্র বা কক্ষের মান নয়; নমুনা সংগ্রহ থেকে রিপোর্ট দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ার গুণগত মান, কারিগরি সক্ষমতা, কর্মীর দক্ষতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং রোগীর তথ্যের গোপনীয়তার কথা বলে। বাংলাদেশের পরীক্ষাগার ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে এ ধরনের স্বীকৃত মান কাঠামোর দিকে নেওয়া অপরিহার্য।

সমস্যাটি বিচ্ছিন্নতা ও মানের বৈষম্য

দেশে সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাত—সব মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক পরীক্ষাগার আছে। কিন্তু সব পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, জনবল, যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, রিঅ্যাজেন্টের মান, প্রতিবেদন দেওয়ার সময় এবং মাননিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি এক নয়। কোথাও আধুনিক যন্ত্র থাকলেও কিট বা রিঅ্যাজেন্টের ধারাবাহিকতা নেই; কোথাও দক্ষ জনবল নেই; কোথাও আবার পরীক্ষা হচ্ছে, কিন্তু ফলের নির্ভরযোগ্যতা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের নিয়মিত ব্যবস্থা নেই।

ফলে রোগীকে একই পরীক্ষা বারবার করাতে হয়, অনেক জটিল নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হয়, কখনো বিদেশেও পাঠাতে হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া পরীক্ষার তথ্য দ্রুত একত্র না হওয়ায় জনস্বাস্থ্য সিদ্ধান্তও বিলম্বিত হতে পারে। বিচ্ছিন্ন সক্ষমতা দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না; প্রয়োজন সমন্বিত নেটওয়ার্ক, অভিন্ন মান এবং দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন।

বর্তমানে জাতীয় ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট কী করবে

প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান রোগতত্ত্ব, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য, পরিবেশ, ওষুধ ও চিকিৎসা পরীক্ষাগারকে প্রতিস্থাপন করবে না। বরং তাদের নিজস্ব আইনগত দায়িত্ব ও দক্ষতাকে সম্মান করে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামো গড়ে তুলবে। এর প্রধান কাজ হতে পারে—

  • চিকিৎসা পরীক্ষাগারের জাতীয় মানদণ্ড ও মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রণয়ন;
  • জটিল ও বিরল পরীক্ষার জন্য জাতীয় রেফারেন্স সেবা চালু;
  • নতুন বা অজানা রোগজীবাণু শনাক্তে উন্নত আণবিক ও জিনগত সক্ষমতা গড়ে তোলা;
  • সব স্তরের পরীক্ষাগারের বাহ্যিক গুণগত মান মূল্যায়ন;
  • সংক্রামক রোগ, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ, খাদ্য-পানি ও পরিবেশগত ঝুঁকির তথ্য একত্র করা;
  • পরীক্ষাগার কর্মীদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা মূল্যায়ন ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের মানদণ্ড নির্ধারণ;
  • জরুরি পরিস্থিতিতে নমুনা পরিবহন, দ্রুত পরীক্ষা ও ফল আদান-প্রদানের কমান্ড কাঠামো গড়ে তোলা;
  • রোগীর গোপনীয়তা সুরক্ষিত রেখে জাতীয় পরীক্ষাগার তথ্যব্যবস্থা পরিচালনা।

এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডে চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ভাইরোলজি, জনস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও আইন বিশেষজ্ঞের প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত। একে শুধু প্রশাসনিক শাখা হিসেবে নয়, বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

চার স্তরের নেটওয়ার্ক: সবার জন্য উন্নত পরীক্ষার পথ

সব জটিল পরীক্ষা প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে চালু করা বাস্তবসম্মত বা ব্যয়সাশ্রয়ী নয়। আবার জটিল পরীক্ষার জন্য প্রতিটি রোগীকে রাজধানীতে আসতে বাধ্য করাও ন্যায়সংগত নয়। এর বাস্তবসম্মত সমাধান হলো স্তরভিত্তিক রেফারেল নেটওয়ার্ক।

উপজেলা ও প্রাথমিক সেবা কেন্দ্র: মৌলিক পরীক্ষা, প্রাথমিক স্ক্রিনিং, জরুরি নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত নিয়মে রেফারেল নমুনা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।

জেলা পরীক্ষাগার: নিয়মিত ও জরুরি পরীক্ষা, জীবাণু কালচার, প্রাথমিক অ্যান্টিবায়োগ্রাম, রক্ত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পরীক্ষা এবং রোগ নজরদারির তথ্য সংগ্রহ হবে।

বিভাগীয় রেফারেন্স পরীক্ষাগার: জটিল জীবাণুবিজ্ঞান, ভাইরাসবিজ্ঞান, টিস্যু পরীক্ষা, বিশেষ বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষা এবং আণবিক রোগনির্ণয়ের সক্ষমতা থাকবে।

জাতীয় রেফারেন্স পরীক্ষাগার ও ইনস্টিটিউট: নতুন জীবাণু, জিনগত পরিবর্তন, বিরল রোগ, উন্নত মলিকুলার পরীক্ষা, রেফারেন্স পরীক্ষা, জাতীয় মাননিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার সর্বোচ্চ সক্ষমতা থাকবে।

এই নেটওয়ার্কের প্রাণ হবে নিরাপদ নমুনা পরিবহন ও ডিজিটাল সংযোগ। নমুনা কোথা থেকে সংগ্রহ হলো, কখন পাঠানো হলো, কোথায় পৌঁছাল এবং ফল কখন দেওয়া হলো—সবকিছু অনুসরণযোগ্য হতে হবে। রোগীর ফল ডিজিটালভাবে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে ফিরে গেলে রোগীকে কেবল রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য দূরে যাতায়াত করতে হবে না।

মহামারির আগাম সতর্কতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া

ডেঙ্গু, কলেরা, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিপাহ, ভাইরাল হেপাটাইটিস অথবা অজানা জ্বর—যেকোনো সংক্রামক রোগে সময়মতো পরীক্ষা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রথম শর্ত। একটি জেলার কয়েকটি হাসপাতালে একই ধরনের রোগী অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে তা দ্রুত শনাক্ত না হলে স্থানীয় সমস্যা বৃহত্তর প্রাদুর্ভাবে রূপ নিতে পারে।

সমন্বিত পরীক্ষাগার নেটওয়ার্ক থাকলে প্রতিটি স্তরের তথ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে আসবে। অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ দল সতর্ক হবে, প্রয়োজনীয় নমুনা দ্রুত রেফারেন্স ল্যাবে পাঠানো হবে এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। এ ব্যবস্থা শুধু রোগ শনাক্ত করবে না; রোগ ছড়ানোর আগেই সতর্কতার সুযোগ তৈরি করবে।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ: পরীক্ষাগার ছাড়া লড়াই অসম্পূর্ণ

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় হুমকি। কোন জীবাণু কোন অ্যান্টিবায়োটিকে সংবেদনশীল, তা না জেনে চিকিৎসা করলে বিস্তৃত-কার্যক্ষম ওষুধের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বাড়ে। এর ফল জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যর্থতা, দীর্ঘ হাসপাতালে থাকা এবং ব্যয় বৃদ্ধি।

বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নজরদারি কার্যক্রম রয়েছে। তবে প্রতিটি জেলা ও হাসপাতালের নির্ভরযোগ্য কালচার-অ্যান্টিবায়োগ্রাম তথ্য একই কাঠামোয় যুক্ত হলে অঞ্চলভিত্তিক জীবাণুর ধরন ও প্রতিরোধ চিত্র পাওয়া যাবে। তখন চিকিৎসকেরা স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে প্রাথমিক অ্যান্টিবায়োটিক বেছে নিতে পারবেন এবং পরে কালচার ফল অনুযায়ী ওষুধ সমন্বয় করতে পারবেন।

এ জন্য জাতীয় নেটওয়ার্কে প্রতিটি হাসপাতালের অ্যান্টিবায়োগ্রাম প্রতিবেদন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কমিটি এবং অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ কর্মসূচির মধ্যে কার্যকর সংযোগ জরুরি। রোগীকে রক্ষা করতে হলে শুধু অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক ওষুধ ব্যবহারের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

খাদ্য, পানি, ওষুধ ও পরিবেশের ঝুঁকি একই সূত্রে বাঁধা

রোগের উৎস অনেক সময় হাসপাতালের বাইরে—খাদ্য, পানি, বায়ু, মাটি, শিল্পবর্জ্য বা প্রাণিজ উৎসে। তাই জাতীয় পরীক্ষাগার নেটওয়ার্কের পরিধি শুধু রোগীর নমুনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। খাদ্যে ভেজাল ও জীবাণু দূষণ, পানিতে আর্সেনিক-সীসাসহ ক্ষতিকর উপাদান, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, নিম্নমানের ওষুধ এবং পরিবেশগত দূষণের ঝুঁকির পরীক্ষাও সমন্বিত নজরদারির অংশ হওয়া দরকার।

স্বাস্থ্য, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ এবং ওষুধ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারগুলোর মধ্যে ‘এক স্বাস্থ্য’ দৃষ্টিভঙ্গিতে তথ্য বিনিময় হলে মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সম্পর্কিত ঝুঁকি আগেভাগে বোঝা যাবে। এতে কেবল অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নয়, অসুস্থ হওয়ার কারণ প্রতিরোধেও রাষ্ট্র কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবে।

ক্যানসার, রক্তসেবা ও বিরল রোগে সমতা আনবে

ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু করার আগে টিস্যু পরীক্ষার নির্ভুলতা অপরিহার্য। ভুল রোগ নির্ণয় হলে রোগী ভুল চিকিৎসার দিকে যেতে পারেন। একইভাবে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন, নবজাতকের জন্মগত রোগ শনাক্ত এবং বিরল জিনগত রোগ নির্ণয়ে উন্নত পরীক্ষার প্রয়োজন। জাতীয় রেফারেন্স সক্ষমতা তৈরি হলে জটিল পরীক্ষা দেশের ভেতরেই ধাপে ধাপে বাড়ানো সম্ভব হবে, বিদেশে নমুনা পাঠানোর ব্যয় ও বিলম্ব কমবে এবং নিম্নআয়ের রোগীও রেফারেল ব্যবস্থায় উন্নত পরীক্ষার সুযোগ পাবেন।

মাননিয়ন্ত্রণ ছাড়া যন্ত্র কেনা অর্থহীন

পরীক্ষাগারের মান নিশ্চিত করার জন্য দুটি ব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রথমটি অভ্যন্তরীণ মাননিয়ন্ত্রণ—নির্ধারিত সময় অন্তর পরীক্ষাগার নিজেই তার যন্ত্র, রিঅ্যাজেন্ট ও পদ্ধতির সঠিকতা পরীক্ষা করবে। দ্বিতীয়টি বাহ্যিক মান মূল্যায়ন—জাতীয় কর্তৃপক্ষ একই মানের নমুনা বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে ফল তুলনা করবে, ত্রুটি শনাক্ত করবে এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।

এর সঙ্গে থাকতে হবে যন্ত্রের নিয়মিত ক্যালিব্রেশন, রিঅ্যাজেন্টের উৎস ও সংরক্ষণ যাচাই, ফল প্রদানের নির্ধারিত সময়সীমা, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জানানো এবং রোগীর অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা। মাননিয়ন্ত্রণকে শাস্তিমূলক অভিযান হিসেবে নয়, নিরাপদ সেবা উন্নয়নের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দক্ষ জনবলকে কেন্দ্রেই গড়তে হবে পরিকল্পনা

যন্ত্র কেনা তুলনামূলক সহজ; দক্ষ জনবল তৈরি ও ধরে রাখা কঠিন। ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্ট, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট, প্যাথলজিস্ট, ভাইরোলজিস্ট, রক্ত ব্যাংক বিশেষজ্ঞ, তথ্যবিশ্লেষক ও বায়োইনফরমেটিশিয়ান—সবাইকে নিয়ে বহুমাত্রিক দল গঠন করতে হবে। তাঁদের জন্য স্বচ্ছ নিয়োগ, পর্যাপ্ত পদ, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার অগ্রগতি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করলে নেটওয়ার্ক টেকসই হবে না।

বাস্তবায়নের রূপরেখা: একবারে নয়, ধাপে ধাপে

এত বড় উদ্যোগ এক বছরে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়; তবে সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার ও সময়সীমা থাকলে তা বাস্তবায়নযোগ্য।

প্রথম ধাপ: সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা পরীক্ষাগারের জাতীয় মানচিত্র তৈরি, নিবন্ধন, সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং ন্যূনতম সেবার তালিকা নির্ধারণ।

দ্বিতীয় ধাপ: জাতীয় ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের আইন, পরিচালনা কাঠামো, অর্থায়ন ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পরামর্শক বোর্ড গঠন; নির্বাচিত বিভাগ ও জেলায় রেফারেন্স নেটওয়ার্কের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম।

তৃতীয় ধাপ: বাহ্যিক মান মূল্যায়ন, ডিজিটাল রিপোর্টিং, নিরাপদ নমুনা পরিবহন, অ্যান্টিবায়োগ্রাম তথ্যভান্ডার এবং জরুরি রোগ নজরদারি ড্যাশবোর্ড চালু।

চতুর্থ ধাপ: ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক মানভিত্তিক স্বীকৃতি, উন্নত আণবিক পরীক্ষা সম্প্রসারণ, গবেষণা তহবিল এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা।

এ কর্মসূচির অর্থায়নকে ব্যয় নয়, রোগীর ভুল চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, হাসপাতাল ভর্তি ও প্রাদুর্ভাবজনিত ক্ষতি কমানোর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

জবাবদিহি ও জনস্বার্থই হবে মূল কথা

জাতীয় ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট যেন আরেকটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান না হয়, তার জন্য স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। কোন পরীক্ষাগার কোন পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত, তাদের মানের অবস্থা কী, কোন পরীক্ষার ফল দিতে কত সময় লাগে, অভিযোগ কোথায় করা যাবে—এসব তথ্য জনস্বার্থে উন্মুক্ত থাকা উচিত। একই সঙ্গে রোগীর ব্যক্তিগত ও জেনেটিক তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে।

উপসংহার

হাসপাতাল ও চিকিৎসক বাড়ানো জরুরি, কিন্তু নির্ভুল পরীক্ষার ভিত্তি দুর্বল রেখে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। জাতীয় ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট ও দেশব্যাপী পরীক্ষাগার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে রোগী পাবেন সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয়; চিকিৎসক পাবেন নিরাপদ সিদ্ধান্তের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি; সরকার পাবে প্রাদুর্ভাব, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার নির্ভরযোগ্য তথ্য।

সুস্থ বাংলাদেশের ভিত্তি শুধু হাসপাতাল নয়—মানসম্মত, নির্ভুল, জবাবদিহিমূলক এবং সবার নাগালে থাকা পরীক্ষাগার ব্যবস্থা। চিকিৎসার এই অদৃশ্য ভিত্তি নির্মাণে আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

লেখক: এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত