
৭ মার্চকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিগত ইউনূস সরকার। ৭ মার্চের জাতীয় ছুটিও বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তাতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে যা ঘটেছিল, তা কি উধাও হয়ে যাবে ইতিহাস থেকে? ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, আওয়ামী লীগের হাতেই ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে ইয়াহিয়া খানকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবকে ‘পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন ইয়াহিয়া খান।
৬ দফার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিল, তাতে পাকিস্তান সরকারের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত হবে দেশ, সেটাই ছিল জনগণের আশা। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে পরিষদের সভা বসতে পারেনি। ইতিহাসের বিশদ বর্ণনায় যাব না। যে কেউ চাইলেই ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে ২৫ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত কোন কোন ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলোর বিবরণ পেয়ে যাবেন। সে সময় শেখ মুজিবুর রহমান যে বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্যায়নগুলো পড়ে নিলে তার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
পূর্ব বাংলার জন্য সে এক সময় এসেছিল। মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের জিঞ্জির ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্য উন্মুখ হয়েছিল সবাই। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টো পাকিস্তানের রাজনীতিতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রধানমন্ত্রী হোক, সেটা চাননি। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিম পাকিস্তানিরাই শাসন করে আসছিল এই ভূখণ্ড। শাসন ও শোষণ চলছিল একই সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা ঘোষণা করে সেই বঞ্চনা থেকে বের হয়ে আসার যে পথ তৈরি করেন, সে পথই বাংলাকে পৌঁছে দেয় বাংলা নামের দেশের জন্মের দিকে।
হ্যাঁ, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। যার দল নির্বাচনে জয়ী হয়েছে, দেশের প্রধানমন্ত্রী তো তিনিই হবেন। ৬ দফা যে বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়, সে কথা শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনরা বহুবার সভা-সমিতি, বৈঠকে বলেছেন। ৬ দফা ১ দফার দিকে যেতে পারে কেবল রাজনীতি নিয়ে কোনো পক্ষ অসততা করলে। তা না হলে পাকিস্তান তার দুই ডানা নিয়ে আরও কিছুদিন হয়তো টিকে থাকত। কিন্তু অসততা করল। সেই অসততাই ঘটালেন ইয়াহিয়া-ভুট্টো। তাঁদের ষড়যন্ত্রে জটিল হয়ে পড়েছিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান যখন আসন্ন পরিষদ সভা স্থগিত ঘোষণা করলেন, তখন পুরো পূর্ব পাকিস্তান জ্বলে উঠল। শোষণ ও বঞ্চনার ক্ষোভ প্রশমিত করার আর কোনো পথই খোলা রইল না। এই জনস্রোতই নির্ধারণ করে দিল এগোনোর পথ। জাতির মুক্তিদাতা তখন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যা বলবেন, সেটাই মেনে নেবে জনগণ। ৭ মার্চ ছিল সেই অগ্নিপরীক্ষা।
স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার, অনেক রাজনৈতিক দলই ১৯৭০ সালের নির্বাচন বানচাল করতে চাইছিল। কেউ কেউ ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ ধরনের অতি উৎসাহী স্লোগান তুলে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে পরোক্ষ মদদ দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু নির্বাচনটি হতে হবে। এই নির্বাচনটা ছিল বাঙালির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের রায়ই বলে দেবে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ। নইলে পশ্চিমা শোষণ থেকে মুক্তি মিলবে না।
সে রকম এক অবস্থায় নির্বাচন যদি না হতো, তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ম্যান্ডেট পেত না। ম্যান্ডেট না পেলে ইয়াহিয়া সরকার বাঙালির আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে চালিয়ে দিতে পারত এবং সে প্রচারণার ওপর নির্ভর করে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সে আন্দোলনকে মাটিচাপা দিত।
নির্বাচনটি আওয়ামী লীগকে ম্যান্ডেট দিল। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় থেকেই তেতে ছিল বাঙালি। তাই নির্বাচন স্থগিত করা নিয়ে ইয়াহিয়ার ঘোষণা পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলকে নিজের হাতেই নিজের নির্ভরতার চাবিকাঠি নিতে সাহায্য করল। এই ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
৭ মার্চের ভাষণ এক অসাধারণ ভাষণ। এটি শুধু ভাষণ নয়, জননায়ক তাঁর দেশবাসীর কাছে তুলে ধরছেন শোষণ-বঞ্চনার কথা, পদে পদে অপমানিত হওয়ার কথা। এবং তারপর বলছেন ৪টি দাবি মানা না হলে পরিষদে যাবেন না তিনি। দাবিগুলো ছিল, অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা, সমস্ত সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, নিরস্ত্র মানুষের ওপর চালানো গণহত্যার তদন্ত করা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। দাবিগুলো ইয়াহিয়া সরকারের জন্য মেনে নেওয়া খুব কঠিন ছিল না। বঙ্গবন্ধু সে ভাষণেই বললেন প্রতিরোধের নানা কথা। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কথা এবং সবশেষে বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। অর্থাৎ তিনি আলোচনার পথ খোলা রাখলেন এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে কী করতে হবে, সে নির্দেশও দিয়ে দিলেন। ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ৪টি দাবি মেনে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে পথে হাঁটলেন না। গোলটেবিল বৈঠকের নামে করলেন শুধু সময়ক্ষেপণ। আর বিমান ভরে আনতে লাগলেন সৈন্য। কী ছিল তাঁর মনে, ইতিহাস তা জানল মাত্র কয়েকটা দিন পর।
নতুন প্রজন্মের তরুণদের বলা দরকার, পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধিনায়কেরা পূর্ব বাংলাকে দেখত ঘৃণার চোখে। তারা আশরাফ, আর পূর্ব বাংলার মানুষ আতরাফ—এভাবেই গড়ে উঠেছিল তাদের মনন। কী ছিল পাকিস্তানিদের মনোজগতে? বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানকে তারা কী চোখে দেখত? পাকিস্তানি সেনাপ্রধানেরা ধরেই নিয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ আসলে হিন্দু সম্প্রদায়ের কারসাজি। পূর্ব বাংলায় শিক্ষকদের মধ্যে হিন্দুরাই বেশি, তাঁরাই এখানকার আতরাফ মুসলমানদের মগজধোলাই করছেন। এ কারণেই ইসলামের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে চাইছে একদল বিচ্ছিন্নতাবাদী। শিক্ষককুলের প্রতি ঘৃণা এবং সেই শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিও সমহারে ঘৃণা জমিয়েছে তারা মনে। ফলে এদের প্রত্যেককেই হননযোগ্য বলে মনে করত পাকিস্তানি জেনারেলরা। এর প্রমাণ পাওয়া যাবে পাকিস্তানি জেনারেলদের লেখা বই থেকে। এ কারণেই ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সময় একটুও মন কেঁপে ওঠেনি তাদের।
সে সময় বামপন্থী কিছু দল এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে থাকা উগ্র একটা অংশও চাইছিল, বঙ্গবন্ধু যেন সেদিনই স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু সেই পথে হাঁটেননি। তিনি পুরো মার্চজুড়ে যে অসহযোগ আন্দোলন করছিলেন, তারই একটি সফল পরিসমাপ্তি চাইছিলেন। আলোচনা সফল হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ পরিচালনা করবেন, আলোচনা ভেস্তে গেলে কী করতে হবে, তা তো বলাই আছে সেই অমর ভাষণে—মুক্তি ও স্বাধীনতা।
বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় যে সামরিক নেতারা বিভিন্ন সেক্টরে লড়াই করেছেন, তাঁরাও ৭ মার্চের ভাষণ থেকেই পেয়েছিলেন সবুজসংকেত। জাতির নেতা কী বলছেন, কী বোঝাতে চাইছেন, সেটা তাঁরা বুঝে নিয়েছেন। ফলে ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট নামের সেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পরপরই তাঁরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছেন।
প্রতিটি জাতিরই গর্ব করার মতো ইতিহাস থাকে। ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না। কিন্তু ইতিহাসে যার যে স্থান, তাকে সেই স্থান দিতে হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির পথে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার হয়ে স্বাধীনতা পর্যন্ত পৌঁছানোর সময়টিতে যার যা ভূমিকা, তাকে সে মর্যাদা দিতে হবে। আমরাই একমাত্র জাতি, যে জাতির মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি এবং বিপক্ষ শক্তি রয়েছে। এর চেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা আর কী হতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি দেশকে যারা মেনে নিতে পারেনি, তাদের সংখ্যা এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাড়ছে, এ এক হতাশার কথা। মুক্তিযুদ্ধকে প্রাণে ধারণ করতে হলে যে ত্যাগ-আত্মত্যাগ-দূরদৃষ্টি, পরিকল্পনা, সততা প্রয়োজন হয়, আমাদের দেশের কোনো সরকারই তা দেখাতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, এমন সব বিষয়ে বিভাজন আনা হয়েছে, যা খুবই অস্বাস্থ্যকর। সময় এসেছে, এই আত্মঘাতী অবস্থান থেকে সরে আসার। কিন্তু সে জন্য যতটা আন্তরিকতা ও দেশের প্রতি দায় অনুভব করতে হয়, তা কি আছে আমাদের ওপর মহলের মানুষদের?
১৯৭১ সালের ৭ মার্চকে ধারণ করতে হলে যে ইতিহাস চেতনা প্রয়োজন হয়, মননে তার চাষবাস নেই বললেই চলে। ৭ মার্চকে তাই বিচ্ছিন্ন করে দেখলে চলবে না। একটি জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার উজ্জ্বলতম দিন হলো ৭ মার্চ। এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন।
জাহীদ রেজা নূর
উপসম্পাদক,আজকের পত্রিকা

আচ্ছা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তাঁরই সহপাঠীদের আপত্তিকর ছবি তুলেছেন গোপনে, তারপর এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিকৃত করেছেন—এ কথাও আমাদের হজম করতে হবে? শিক্ষার্থী বলতে তো সমাজে এগিয়ে থাকা একজন মানুষকেই বোঝানো হয়, কিন্তু শিক্ষার্থীর যদি এই দশা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো....
৬ ঘণ্টা আগে
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আজ অষ্টম দিনে গড়িয়েছে। থেমে নেই ইরানও। আক্রান্ত হওয়ার পরপরই তারাও ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১৫টি দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, ইতিমধ্যে সারা পৃথিবী তার বিরূপ প্রভাব...
৬ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো, ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার; সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। এটা শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। অধিকার, ন্যায়বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ—এই তিনটি শব্দ বাস্তবায়িত না হলে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
৬ ঘণ্টা আগে
আবার কি পৃথিবী অশান্ত হয়ে উঠল? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবসভ্যতা অনেকবার এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে অন্য সময়ের চেয়ে উদ্বেগ কিছুটা বেশিই বলে মনে হচ্ছে।
১ দিন আগে