Ajker Patrika

নদীভাঙন

সম্পাদকীয়
নদীভাঙন

কুড়িগ্রামে বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ধরলা ও তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে একের পর এক বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। জেলার রাজারহাট উপজেলার রামহরি, ফুলবাড়ী উপজেলার চর গোরকমন্ডলসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি এবং জমিও নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীভাঙন শুধু একটি বছরের সমস্যা না। প্রতিবছর দেশের কোথাও না কোথাও নদীভাঙনের কারণে অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করতে পারে না। শুধু ঘরবাড়িই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় না, শত শত বিঘা জমি নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার কারণে, বিশেষ করে জমির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো পথে বসে যায়। ফলে তাদের আয়-উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন শেষ হয়ে যায়। একদিকে পরিবার চালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়, অন্যদিকে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

নদীতীরবর্তী মানুষের জানমাল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে যে জিও ব্যাগ ফেলা হয়, সেটাও নদীভাঙনের তীব্রতায় তলিয়ে যায়। এবারও একই ঘটনা ঘটেছে। মান্ধাতার আমলের জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন রোধ করা যায় না। সেটা বারবার প্রমাণিত হওয়ার পরেও পাউবো বিকল্প কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করে না। রামহরি ও গোরকমন্ডল এলাকায় হাজার হাজার জিও ব্যাগ নদীতে তলিয়ে যাওয়া এবং কাজের ধীরগতির কারণে সুফল না মেলা প্রমাণ করে যে জরুরি বা সাময়িক তৎপরতা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ভাঙন শুরু হওয়ার পর বস্তা ফেলে নদীকে শাসন করার চেষ্টা মূলত রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং অকার্যকর পদ্ধতি বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

নদীভাঙন প্রতিরোধে একটি সুনির্দিষ্ট, টেকসই, দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় নীতিমালা এবং বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ভাঙন প্রতিরোধে রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান করণীয় হলো সাময়িক পদক্ষেপের বৃত্ত থেকে বের হয়ে এসে বছরব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো নির্মাণ করা। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা-সংকট দূর করা এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে স্থায়ী সিসি ব্লক ও উন্নত প্রযুক্তির বাঁধ নির্মাণ করা দরকার।

একই সঙ্গে, ভাঙন মৌসুমে ঠিকাদারদের অবহেলা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কাজ যেন বন্ধ হয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা। যথাসময়ে এবং সঠিক গুণগত মান বজায় রেখে প্রতিরক্ষামূলক কাজ সম্পন্ন করার জন্য একটি কঠোর জবাবদিহিমূলক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাঠপর্যায়ের কাজের নিয়মিত মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।

রাষ্ট্রীয়ভাবে আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো নদীভাঙনের শিকার এই বাস্তুচ্যুত নিঃস্ব মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। যাঁরা পাঁচ-ছয়বার ভাঙনের শিকার হয়ে ভূমিহীন ও দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন, তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ওই এলাকার নদীভাঙনের ভয়াবহ রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আর কোনো জোড়াতালি দিয়ে এটার সমাধান সম্ভব নয়; নতুন ভাবনা জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত