Ajker Patrika

কার্যক্রম নিষিদ্ধ: ১২ জেলায় কার্যালয় ঘিরে আ.লীগের ঝটিকা কর্মসূচি

  • শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ের ফটকে টানানো হলো পতাকা
  • ৯ জেলায় সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন
  • কুড়িগ্রামে জামায়াত, নারায়ণগঞ্জে এনসিপি, ময়মনসিংহে এমপি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
কার্যক্রম নিষিদ্ধ: ১২ জেলায় কার্যালয় ঘিরে আ.লীগের ঝটিকা কর্মসূচি
রাজধানীর ধানমন্ডিতে গতকাল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে জাতীয় পতাকা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রেখে স্লোগান দেন যুব মহিলা লীগের একদল নেত্রী। ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সক্রিয় হয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এ পর্যন্ত ১২ জেলায় দলীয় কার্যালয়ের তালা খুলে তাঁরা ঝটিকা মিছিল করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ের প্রধান ফটকে জাতীয় পতাকা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টানিয়ে মিছিল করেছেন যুব মহিলা লীগের কয়েকজন নেত্রী। এ ছাড়া কেরানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের একটি পরিত্যক্ত কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে।

আজকের পত্রিকার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে জানা যায়, ঢাকার বাইরে ফরিদপুর, পটুয়াখালী, খুলনা, রাজবাড়ী, নওগাঁ, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, পঞ্চগড় ও নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা খোলা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভোরের দিকে নেতা-কর্মীরা কার্যালয়ে গিয়ে পতাকা টাঙিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে স্থান ত্যাগ করেন। এসব ঘটনায় দলটির বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে অবশ্য গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা ওই জেলাগুলোর মধ্যে ফরিদপুর, পটুয়াখালী, রাজবাড়ী, নওগাঁ, দিনাজপুর, শরীয়তপুর, পঞ্চগড়, খুলনা ও নোয়াখালীর সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। কুড়িগ্রামে জামায়াত, নারায়ণগঞ্জে এনসিপি এবং ময়মনসিংহে জিতেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা।

আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, কার্যালয়ের তালা খোলার পর কিছু জেলায় ক্ষমতাসীন বিএনপির অঙ্গসংগঠন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা আবার ওই কার্যালয়ের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন। এ ছাড়া ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর আবার ওই কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতা-কর্মীদের তৎপরতা ঠেকাতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

আ.লীগ সভাপতির কার্যালয়ের সামনে পতাকা টাঙিয়ে স্লোগান গতকাল সকাল সাড়ে আটটার দিকে যুব মহিলা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম বি কানিজসহ ১০-১২ নেত্রী ধানমন্ডির ৩/এ সড়কের ৫১ নম্বর বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বন্ধ ফটকে জাতীয় পতাকা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টাঙিয়ে স্লোগান দেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে তাঁরা স্থান ত্যাগ করেন।

যুব মহিলা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম বি কানিজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘৩২ নম্বর সড়কসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে দেড় বছর ধরে মিছিল করে আসছি, আমাদের সঙ্গের অনেকে এখনো জেলে আছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সব সময় পুলিশের উপস্থিতির পাশাপাশি মব সন্ত্রাসীদের জন্য আসা কঠিন। আজকে যুব মহিলা লীগের নেতা-কর্মীরা একটু ঝুঁকি নিয়েই গিয়েছি।’

রাজধানীর বাইরের চিত্র

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার তারানগর ইউনিয়নের ঘাটারচর এলাকায় আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মডেল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন বিপ্লবের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার কার্যালয়ের ছাদে উঠে পতাকাটি উত্তোলন করেন। এরপর দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।

এদিকে গতকাল ভোরে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের পুরোনো কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন যুবলীগ ও বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ছবি প্রকাশ করেন তাঁরা। সেখানে ফরিদপুর শহর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসিবুর রহমান, ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক ভিপি কাওসার আকন্দ, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফাহিম আহমদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি দেবাশীষ নয়নসহ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে দেখা যায়।

এ ছাড়া গতকাল খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা কার্যালয় খুলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এ সময় উপস্থিত নেতা-কর্মীদের মুখে মাক্স পরা ছিল।

গত বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় উদ্বোধন করেন ১০-১২ জন নেতা-কর্মী। পরে রাত ৯টার দিকে তিনতলা কার্যালয়টির দোতলার ভেতরে টায়ার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। হাতুড়ি দিয়ে দেয়ালও ভাঙচুর করা হয়।

এর আগে গত সোমবার পটুয়াখালীর দশমিনা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করেন যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। সকাল সাতটার দিকে কার্যালয়টি খোলা হলেও চার ঘণ্টার মাথায় উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল বশারের নেতৃত্বে কয়েকজন সেখানে গিয়ে ভাঙচুর চালান। পরে তাঁরা কার্যালয়টি আবার তালাবদ্ধ করে দেন।

দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাহাদাৎ মো. হাচনাইন পারভেজ বলেন, ‘সোমবার সকালে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা অফিস খুলে ব্যানার টাঙিয়ে প্রায় ১০ মিনিট সেখানে ছিলেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে পায়নি। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।’

নোয়াখালীতে গত বুধবার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে তালা ভেঙে দলের জেলা কার্যালয় খুলে দেওয়ার পর বিএনপির নেতা-কর্মীরা এসে আবার তালা দিয়েছেন। এ ঘটনায় ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

একই দিন রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টানানো হয়। তবে ওই দিন বিকেলে ব্যানার খুলে ফেলে দেওয়া হয়।

ওই দিনই নারায়ণগঞ্জ শহরে জেলা ও মহানগর কার্যালয়ের সামনে ব্যানার ঝুলিয়ে যুবলীগের ৫ কর্মী স্লোগান দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর বিকেলে সেই ব্যানার বিএনপির কর্মীরা ছিঁড়ে ফেলে। বুধবার রাতেই স্লোগান দেওয়া এক যুবলীগ কর্মীকে ধরে মারধরের পর পুলিশে সোপর্দ করে বিএনপির নেতা জাকির খানের অনুসারীরা।

১৯ ফেব্রুয়ারি নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির নেতা-কর্মীরা। পরে দুপুরে থানা-পুলিশের সদস্যরা পতাকাগুলো খুলে নিয়ে যান।

এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান বলেন, ‘নিষিদ্ধ থাকা একটি দলের হঠাৎ এমন কার্যক্রমের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এদের মোকাবিলা করবে বিএনপি।’

১৫ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের বাসুনিয়াপট্টি এলাকায় আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ে হঠাৎ কয়েকজন নেতা-কর্মী হাজির হয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন। এর প্রতিবাদে বিকেলে কার্যালয়টিতে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একদল নেতা-কর্মী।

একই দিন বিকেলে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় বিজয় চত্বর এলাকায় একদল নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগের ভাঙাচোরা কার্যালয় পরিদর্শন করেন। গত বুধবার জেলার পার্বতীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে বেশ কিছু নেতা-কর্মী সমবেত হন। এ সময় তাঁরা দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করা হয়। খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে পাঁচ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী ব্যানার ও জাতীয় পতাকা টানিয়ে স্লোগান দেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে মুখোশ পরা কয়েকজন নেতা-কর্মী শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ঢুকে শেখ মুজিবুর রহমান ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ছবি টানান। তবে পরে সেটি কে বা কারা সরিয়ে ফেলে।

১৩ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। যদিও পরে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের কার্যালয় নয়, গুদামঘরের তালা খুলে দিয়েছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত