Ajker Patrika

নিষ্পত্তি কম, বেড়েছে ডেথ রেফারেন্স

  • চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ১২৬৫ মামলা
  • গত বছর হাইকোর্টে যায় ১৫৭ ডেথ রেফারেন্স, নিষ্পত্তি ৩৯
  • ১৬ বছরে নিষ্পত্তির পরও ডেথ রেফারেন্স বেড়েছে ৭২৩টি
  • বর্তমানে বিশেষ বেঞ্চসহ পাঁচ বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হচ্ছে
এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা 
আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ০৮: ১৮
নিষ্পত্তি কম, বেড়েছে ডেথ রেফারেন্স
ফাইল ছবি

হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ১ হাজার ২৬৫টি ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা। এই হিসাব গত মার্চ পর্যন্ত। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৬টি ডেথ রেফারেন্স মামলা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, হাইকোর্টে প্রতিবছর আসা ডেথ রেফারেন্স মামলার চেয়ে নিষ্পত্তির সংখ্যা কম হওয়ায় অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা বাড়ছে। হাইকোর্টে চারটি বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হচ্ছিল। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মামলায় ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য হাইকোর্ট বিভাগে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন হওয়ায় এখন পাঁচ বেঞ্চে শুনানি হচ্ছে। এতে ডেথ রেফারেন্স মামলার নিষ্পত্তি বাড়বে, বলছেন আইনজীবীরা।

বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে তা কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হয়। সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত হাইকোর্টে ১ হাজার ২৬৫টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। গত তিন মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৬টি ডেথ রেফারেন্স মামলা। একই সময়ে বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্টে এসেছে ১৯টি। ২০২৫ সালে এক বছরে হাইকোর্টে আসে ১৫৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলা। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ৩৯টি। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ১০টি মামলা। বর্তমানে ২০১৮ সালের ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে।

সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ৫৪২টি মামলা শুনানির অপেক্ষায় ছিল। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন ছিল ১ হাজার ২৭২টি মামলা। চলতি বছরের মার্চে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ২৬৫টিতে। গত ১৬ বছরে নিষ্পত্তির পরও ডেথ রেফারেন্স মামলা বেড়েছে ৭২৩টি। ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স মামলা এসেছে ১ হাজার ৫৭৭টি। ওই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ১ হাজার ১৮১টি।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মাজহারুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, এত দিন হাইকোর্ট বিভাগের চারটি বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স এবং আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্ট বিভাগে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। এখন পাঁচটি বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হচ্ছে।

বিচারিক আদালত আইন অনুযায়ী আসামিকে যেকোনো দণ্ড দিতে পারেন। এর মধ্যে শুধু মৃত্যুদণ্ড দিলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী ওই দণ্ড কার্যকরের আগে হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হয়। ৩৭৬ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন বা খালাস দিতে পারেন বা অন্য যেকোনো দণ্ড দিতে পারেন। হাইকোর্টের রায়ের পর সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করতে পারেন। আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে রিভিউ আবেদন করার সুযোগ থাকে। রিভিউ আবেদন খারিজ হলে আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সুযোগ পান। সেই আবেদন নাকচ হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিজি প্রেস থেকে পেপারবুক তৈরি করতে হয়। বিজি প্রেস সরকারের অনেক কাজ করে। যার কারণে পেপারবুক তৈরিতেও দেরি হয়। তাই সুপ্রিম কোর্টের অধীনে প্রিন্টিং প্রেস করা যেতে পারে। এ ছাড়া ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানিতে বেঞ্চ বাড়ানো দরকার। এ জন্য সুপ্রিম কোর্টে যোগ্যতাসম্পন্ন আরও বিচারপতি বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।

কনডেম সেল নিয়ে আপিলের নিষ্পত্তি হয়নি দুই বছরেও

এদিকে মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগে দণ্ডিত বা দণ্ডিতদের কনডেম সেলে (নির্জন প্রকোষ্ঠ) রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লা কারাগারের কনডেম সেলের তিন কয়েদি। ওই রিট শুনানি করে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পরে রুল যথাযথ ঘোষণা করে ২০২৪ সালের ১৩ মে রায় দেন হাইকোর্ট। ওই রায়ে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নির্জন সেলে দীর্ঘদিন রাখা দ্বিগুণ সাজা। এটি সংবিধান ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা অনুমোদন করে না। রায়ে কনডেম সেলে থাকা আসামিদের পর্যায়ক্রমে দুই বছরের মধ্যে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সংক্রামক বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকা আসামি ছাড়া। আর তাঁদের বিশেষভাবে পৃথক রাখতে হলে বন্দীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দিনের মাথায় হাইকোর্টের ওই রায় স্থগিত করেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। এরপর নিয়মিত আপিল করা হয়। সেই আপিল নিষ্পত্তি হয়নি দুই বছরেও। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আসামিদের থাকতে হচ্ছে কনডেম সেলে।

এই মামলায় হাইকোর্টে অ্যামিকাস কিউরি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী। জানতে চাইলে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আপিল বিভাগে অনেক মামলা দীর্ঘ সময় ধরে বিচারাধীন। সবগুলোই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। তবে এটিসহ কিছু মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।’

ওই রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলেই কাউকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বলা যাবে না। এর জন্য হাইকোর্ট বিভাগ, আপিল বিভাগ ও রাষ্ট্রপতির কাছে করা আবেদন খারিজ হতে হবে। আসামিকে নির্জন সেলে ১৫-২০ বছর পর্যন্ত বন্দী রাখা হলে এটি দ্বিগুণ শাস্তি। কেননা, তাঁর সাজা নির্জন কক্ষে বসবাস নয়, সাজা মৃত্যুদণ্ড। এ জন্যই হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগে কনডেম সেলে রাখাকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে। দ্রুতই আপিল বিভাগে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত