Ajker Patrika

নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান চেয়ে কাঁদলেন স্বজনেরা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান চেয়ে কাঁদলেন স্বজনেরা
রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ শিশুদের স্বজনেরা। ছবি: সংগৃহীত

‘মৃত্যুর আগে শুধু একবার আমার ছেলেকে দেখতে চাই। একবার দেখে মরতে চাই।’ —কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন সাড়ে আট বছর আগে নিখোঁজ হওয়া শিশু সকাল আহমেদের বাবা ইসমাঈল হোসেন।

শুধু তিনি নন, নিখোঁজ সন্তানের কথা বলতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। কেউ কথা শেষ করতে পারেননি, কারও কণ্ঠ আটকে গেছে সন্তানের কথা বলতে গিয়ে।

আজ রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান চান স্বজনেরা। ‘নিখোঁজ শিশুদের পরিবারবর্গ’র উদ্যোগে এবং ‘জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন’-এর সহযোগিতায় এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

লালবাগ থেকে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে সাড়ে আট বছর আগে নিখোঁজ হয় আট বছরের শিশু সকাল আহমেদ। তার বাবা জানান, ছেলে নিখোঁজের পর লালবাগ থানায় জিডি করলেও প্রশাসনিক সহযোগিতা পাননি। তখন বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় এমনটা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পেশায় ঠিকাদার এই বাবা জানান, ছেলের খোঁজ করতে গিয়ে সারা জীবনের সঞ্চয় প্রায় শেষ হওয়ার পথে।

নিখোঁজ শিশুদের বার্তা ছড়িয়ে দিতে কাজ করা সংগঠন মুন এলার্ট থেকে সহযোগিতা পেলেও লালবাগ থানা থেকে তেমন সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেন সকালের বাবা। সংগঠনটিকে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করার আবেদনও জানান তিনি।

গত বছরের ২০ মে স্কুলে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় মো. তামিম। স্কুলে খোঁজ নিয়ে পরিবার জানতে পারে, সেদিন তামিম স্কুলেই যায়নি। তার বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘১৬ মাস হয়ে গেছে, বাবা ডাক শুনি না।’

ছেলের সন্ধানে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন নজরুল। কবিরাজ, হুজুর ও বিজ্ঞাপন—সবই করেছেন। এ পর্যন্ত ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, একমাত্র ছেলেকে কেউ ফিরিয়ে দিলে নিজের যা সম্পদ আছে, সব দিয়ে দেবেন।

নজরুল ইসলাম ২০২২ সালে শারীরিক কারণে পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেন। সাবেক এই পুলিশ সদস্যের অভিযোগ, নিজে পুলিশের সদস্য হয়েও পুলিশের কাছ থেকে সম্মান বা সহযোগিতা পাননি। থানায় গেলে এমন আচরণ করা হতো, যেন তিনিই কোনো অপরাধ করেছেন।

চাঁদপুরের শাহরাস্তি থেকে পাঁচ বছর আগে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় এক মেয়ে। তার বাবা বলেন, জিডি করার এক মাস পরও পুলিশ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরে এক সাংবাদিক এসপিকে প্রশ্ন করার পর এলাকায় নিরপরাধ মানুষকে গণহারে গ্রেপ্তার শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে মেয়েকে না পাওয়ার পাশাপাশি গ্রামের মানুষদের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে জানান এই বাবা।

ওই বাবা বলেন, ‘বাংলাদেশে তখন যদি মুন এলার্ট থাকত, হয়তো এটার মাধ্যমে আমার মেয়েকে উদ্ধার করতে পারতাম।’ মুন এলার্টকে সরকার গুরুত্ব দিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে—এমন আবেদন জানান তিনি।

ঢাকার ধামরাই থেকে ৩৩৩ দিন ধরে নিখোঁজ গণেশ মণ্ডল। নিখোঁজ হওয়ার স্থানে তার জুতা পড়ে ছিল। গণেশের মা বলেন, সন্তান হারানোর পর তাঁর জীবনের আনন্দ শেষ হয়ে গেছে। পুলিশকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করার কথা বললেও তা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পুলিশের আচরণ এমন ছিল, যেন তিনিই আসামি—এমন অভিযোগও করেন তিনি।

মিরপুরে নিজ বাসার ভবন থেকে নিখোঁজ হয় মো. ইব্রাহিম। সিসি ক্যামেরায় তাকে ভবনে ঢুকতে দেখা গেলেও পরে আর বের হতে দেখা যায়নি। তার বাবা নিজে পেনড্রাইভ কিনে ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশকে দেন। তবে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ ইব্রাহিমের বাবার।

২০২২ সালে বাবার সঙ্গে মহাখালীর ৭ তলার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় ইব্রাহিম। তার বাবা মো. রানা মিয়া বলেন, বাজারে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখলাম, একজন মহিলা আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে দৌড়ে বাজার থেকে বের হচ্ছে। ওই নারীর ছবি প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্পষ্ট করার অনুরোধ করলেও পুলিশ গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বনানী থেকে আট দিন আগে নিখোঁজ হয় সাইবারা। জুতা কিনতে গিয়ে মেয়েকে হারান তার মা বিথী আক্তার। থানায় গেলে পুলিশ প্রথমে সহযোগিতা করতে চায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিথী। আবেগাপ্লুত হয়ে আর কথা শেষ করতে পারেননি।

৩৯ দিন ধরে নিখোঁজ মোহাম্মদ আলীর বাবা বলেন, মসজিদে কোরআন পড়তে যাওয়ার কথা বলে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ তাঁর ছেলে। জিডি করার পর থানায় খোঁজ নিতে গেলে পুলিশ তাঁদেরই দোষারোপ করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘থানা থেকে যে সাহায্য পাই নাই, তার চেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছি মুন এলার্ট থেকে।’

সংবাদ সম্মেলনে স্বজনদের বক্তব্যে উঠে আসে একই আকুতি—নিখোঁজ সন্তানদের খুঁজে বের করতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ চান তাঁরা। দীর্ঘ অপেক্ষা, অর্থ ব্যয় এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশা ছাড়েননি এই স্বজনেরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত