Ajker Patrika

১৭ হাজার কোটির প্রকল্প ভুগছে নকশার ভুলে

মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
১৭ হাজার কোটির প্রকল্প ভুগছে নকশার ভুলে

প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প ভুগছে মূল নকশার ভুলে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব এবং সংশোধিত নকশা অনুমোদন না হওয়া। ফলে মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে একের পর এক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রকল্প সম্পন্ন করতে সময় ও খরচ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পে দরপত্র, বিল পরিশোধ, কর আদায় ও চুক্তি বাস্তবায়নে একাধিক আর্থিক অনিয়মও উঠে এসেছে সরকারি নিরীক্ষায়। এই আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পটি সম্পর্কে এসব তথ্য রয়েছে।

এই সমীক্ষা প্রতিবেদন সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। অথচ চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পে ইতিমধ্যে ৪ হাজার ৪২১ কোটি ৬৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ ৩ হাজার ৭০৪ কোটি ৬৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছে আইএমইডি।

জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক এ কে এম ফজলুল করিম বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী এগোলেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে। প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক জরিপের সীমাবদ্ধতার কারণে ডিএস-১ লটে কাদা (স্লাজ) এবং ডিএস-৭ লটে জৈব মাটি (অর্গানিক সয়েল) শনাক্ত হওয়ায় নকশা সংশোধন ও ভূমি উন্নয়ন করতে হয়েছে। এতে কাজে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর ও সংশোধিত নকশার অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন হলে প্রকল্পের কাজের গতি বাড়বে।

সমীক্ষায় ভুল, নকশা সংশোধন

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ভিত্তি হিসেবে ২০১৯ সালে প্রণীত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইনের অবস্থান যথাযথভাবে নির্ণয় করা হয়নি। বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে দুর্বল মাটি ও কাদার অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যা সড়ক নির্মাণের জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে একের পর এক নকশা সংশোধন, অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, দুর্বল মাটি অপসারণ এবং ভূমি উন্নয়নের প্রয়োজন হয়। এতে প্রকল্পের নির্মাণসূচি ব্যাহত হয়েছে এবং সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য ৮২৯ দশমিক ৮৩ একর জমি প্রয়োজন হলেও পরিদর্শনের সময় পর্যন্ত প্রকল্প কর্তৃপক্ষ মাত্র ৩১২ দশমিক ১৫ একর বা ৩৭ দশমিক ৬১ শতাংশ জমি বুঝে পেয়েছে। একইভাবে ১৯০ দশমিক ২৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ঠিকাদারদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে মাত্র ৯১ দশমিক ২২ কিলোমিটার।

ইউটিলিটি স্থানান্তরের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি প্রায় ৪৬ শতাংশ হলেও তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন স্থানান্তর হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং জালালাবাদ গ্যাসের ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

আইএমইডি বলেছে, জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ঠিকাদারেরা অনেক স্থানে কাজের উপযোগী এলাকা পাচ্ছেন না।

পরিদর্শনে দেখা গেছে, মূল সড়ক নির্মাণের অগ্রগতি মাত্র ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া সার্ভিস লেনের ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সেতুর ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ইউ-টার্ন, রাউন্ডঅ্যাবাউট ও ফুটওভারব্রিজের কাজ শুরুই হয়নি।

প্রায় ২৫০ কোটি টাকার অনিয়ম

প্রকল্পের সরকারি ও অভ্যন্তরীণ অডিটে একাধিক আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি, অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ এবং কর কর্তনে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ২৪৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা সংশ্লিষ্ট আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।

এ ছাড়া কাজ না করেই প্রকৌশলীদের অর্ধস্থায়ী আবাসনের জন্য ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বিল পরিশোধ, মূল্য সমন্বয়ে ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ, ঠিকাদারের বিল থেকে প্রাপ্য ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ভ্যাট ও আয়কর আদায় না করা, ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়া ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, বাধ্যতামূলক বিমা না করা এবং অন্যান্য আর্থিক অনিয়মের বিষয়ও অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আপত্তির বেশির ভাগই এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

আইএমইডির পরিদর্শন দল নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় কয়েকটি অংশে রিজিড পেভমেন্টে ব্যবহৃত কংক্রিটের কমপ্রেসিভ স্ট্রেংথ নকশায় নির্ধারিত মানের চেয়ে কম পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) ব্যবহার, নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সতর্কীকরণ সংকেতেও ঘাটতি পাওয়া গেছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

ধুলা-বর্জ্যে অতিষ্ঠ স্থানীয় মানুষ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের চলমান নির্মাণকাজের কারণে ৮৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ স্থানীয় মানুষ ভোগান্তির শিকার। ধুলা, শব্দ, নির্মাণবর্জ্য ও পানি নিষ্কাশন সমস্যায় ভুগছেন ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ স্থানীয় বাসিন্দা।

জমি অধিগ্রহণ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ জমির মালিক এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি। আর যাঁরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৭২ দশমিক ৫২ শতাংশ মনে করেন, তাঁরা ন্যায্য মূল্য পাননি।

জানতে চাইলে এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার (পরিবহন) হুমায়ুন কবির বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, নকশা পরিবর্তন এবং দুর্বল ঠিকাদার পারফরম্যান্স। তবে এডিবির পক্ষ থেকে অর্থ ছাড়ে কোনো বিলম্ব হয়নি। তিনি বলেন, সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি এড়াতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে; সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি বৃদ্ধি, ঠিকাদার তদারকি জোরদার এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আইএমইডির সুপারিশে বলা হয়েছে, দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়–দুটিই আরও বাড়বে। তবে দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন, ইউটিলিটি স্থানান্তর, আন্তসংস্থার সমন্বয়, ঠিকাদারদের জনবল ও যন্ত্রপাতি বৃদ্ধি এবং নির্মাণের গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল দিতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত