Ajker Patrika

সাংবাদিকদের জন্য আপিল বিভাগের দ্বার খুলবে কবে

এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা  
সাংবাদিকদের জন্য আপিল বিভাগের দ্বার খুলবে কবে
ফাইল ছবি

সাংবাদিকদের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দ্বার বন্ধ পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে। সুপ্রিম কোর্টে প্রশাসনের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা, প্রধান বিচারপতি বরাবর চিঠি দেওয়া এবং মানববন্ধন করেও মেলেনি প্রবেশাধিকার।

সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গত ২৯ মার্চ অ্যাটর্নি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। ওই দিন প্রথম কার্যদিবসে তিনি বলেন, গণমাধ্যম সব সময় নির্বিঘ্নে কাজ করবে, এ ব্যাপারে তিনি সবার সঙ্গে একমত। সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি তিনি যথাস্থানে উপস্থাপন করবেন বলেও আশ্বাস দেন।

সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে ৯ জুন আপিল বিভাগে প্রবেশের চেষ্টা করেন এই প্রতিবেদক। তবে প্রধান বিচারপতির নিষেধাজ্ঞার কথা বলে প্রবেশ করতে দেয়নি দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মীরা। পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। আশা করছি এটি সুরাহা হবে।’ গত ৫ মাস ধরে একই আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে—এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। আশা করছি, শিগগিরই বিষয়টি সমাধান হবে।’

২০০১ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে সব এজলাসে প্রবেশ করে সংবাদ সংগ্রহ করতেন গণমাধ্যমকর্মীরা। কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে গণমাধ্যমকর্মীদের বসার ব্যবস্থা করে দিতেন বিচারপতিরা। নানা সময়ে মামলার শুনানিতে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশংসাও করেছেন প্রধান বিচারপতিসহ বেশ কয়েকজন বিচারপতি।

দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে জুবায়ের রহমান চৌধুরী শপথ নেন গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর। আর চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি থেকে আপিল বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। এরপর আপিল বিভাগের দোহাই দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের অনেকগুলো বেঞ্চেও সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। যদিও এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিবন্ধকতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ৫ মাসেও সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারের বিষয়টি সমাধান না হওয়া দুঃখজনক। আশা করছি দ্রুত এটি সুরাহা হবে। অন্যথায় সাংবাদিকেরা কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।  

সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে মামলা শুনানিতে সাংবাদিকদের নির্বিঘ্নে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে প্রধান বিচারপতির বরাবর দুই দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। আইন, বিচার ও মানবাধিকার বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) পক্ষ থেকে গত ১৯ ও ২৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে ওই চিঠি দেওয়া হয়। 

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন আজকের পত্রিকাকে বলেন, এটা স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ। গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সে ক্ষেত্রে যদি কোনো ব্যত্যয় ঘটে তখন আদালত এবং বিচারক গণমাধ্যমের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু এখানে হয়েছে উল্টো। গণমাধ্যমকর্মীরা কোনো ভুল করে থাকলে সে বিষয়ে আদালত কথা বলতে পারেন। ভুল সংশোধন করে দিতে পারেন। কিন্তু এভাবে গণমাধ্যমকর্মীদের দিনের পর দিন আদালতে প্রবেশে বাধা দেওয়াটা দুঃখজনক।

আইন কী বলছে

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারা ও সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে উন্মুক্ত আদালতে বিচারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট রুলসের আদেশ ১০–এ উন্মুক্ত আদালতে রায় ও আদেশ প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া প্রকাশ্য আদালতে রায় ও আদেশ প্রদানে অধস্তন আদালতের প্রতি ২০২১ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনাও রয়েছে।

সরাসরি সম্প্রচারে রুল

উচ্চ আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ও সাংবিধানিক প্রশ্ন সম্পর্কিত মামলার শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। এ-সংক্রান্ত রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২০ মে ওই রুল জারি করা হয়। ৫ জন আইনজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৬ জন শিক্ষার্থী ওই রিটটি করেছিলেন। রুলটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি হাসান জাবেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী যখন হাইকোর্ট বিভাগে ছিলেন তখনো তাঁর বেঞ্চে সাংবাদিকেরা প্রবেশ করতে পারতেন না। কিন্তু আপিল বিভাগ তো দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টে গত ২৬ বছর ধরে সাংবাদিকেরা এজলাসে প্রবেশ করেই সংবাদ সংগ্রহ করছেন। কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমরা দুই দফা চিঠি দিয়েছি। বারবার সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সঙ্গে বসেছি। শুধু আশ্বাস মিলেছে। দ্রুত সমাধান না হলে সব সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব।

অন্যান্য দেশে কী বিধান

ঐতিহাসিক রিচমন্ড নিউজ পেপারস মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেন, ফৌজদারি মামলার বিচার প্রক্রিয়া থেকে সংবাদমাধ্যম বা জনসাধারণের প্রবেশাধিকারকে ইচ্ছেমতো সীমাবদ্ধ করা যাবে না।

যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত স্কট বনাম স্কট (১৯১৩) মামলায় প্রকাশ্য বিচার নীতিকে বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। হাউস অব লর্ডস সিদ্ধান্ত দেয় যে, উন্মুক্ত বিচার ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সংবেদনশীল ক্ষেত্র ছাড়া কোনো বিচারক নিজের ইচ্ছেমতো কিংবা পক্ষগুলোর অনুরোধে আদালত কক্ষে সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করতে পারে না।

বিখ্যাত এডমন্টন জার্নাল (১৯৮৯) মামলায় কানাডীয় আদালত বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের উপস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। মামলাটি কানাডার আলবার্টা প্রদেশের ‘জুডিকেচার অ্যাক্ট’-এর ৩০ নম্বর ধারা নিয়ে উত্থাপিত হয়। 

এ ছাড়া বিখ্যাত মামলা স্বপ্নিল ত্রিপাঠীর মাধ্যমে ২০১৮ সাল থেকে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে সাংবিধানিক মামলাগুলোর শুনানিতে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ব্যবস্থা (সরাসরি সম্প্রচার) চালু করেছে।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারকাজ চলাকালে এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা দূর করার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরাও। বাংলাদেশ আইন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে স্পর্শকাতর মামলাগুলোর বিচার হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সেখানকার বিচারও লাইভ সম্প্রচার করা হয়। তাহলে এখানে (সুপ্রিম কোর্ট) এজলাসের ভেতরে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে প্রতিবন্ধকতাটা কোথায় সেটা বোধগম্য নয়। আমরা বিশ্বাস করি দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসন পরবর্তী বাংলাদেশে বর্তমান বিচার বিভাগ বিচার প্রার্থী মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে স্বচ্ছতা ও মানুষের বিশ্বাসের যে জায়গাটা– সেখানে কোনো সন্দেহের সৃষ্টি করবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত