Ajker Patrika

পরিবহন থেকে বছরে চাঁদা ২ হাজার কোটি টাকা

  • প্রতিদিন চাঁদা তোলা হয় ৯ লাখ যানবাহন থেকে।
  • টার্মিনালে বাস-ট্রাক প্রতি চাঁদা ২০০ থেকে ৮০০।
  • শ্রমিক কল্যাণের চাঁদার বড় অংশ নেতাদের পকেটে।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
পরিবহন থেকে বছরে চাঁদা ২ হাজার কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত

পরিবহন খাতে দেশজুড়ে ‘শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড’-এর নামে নিয়মিত বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় হলেও তার যথাযথ সুফল শ্রমিকেরা পান না—এ অভিযোগ পুরোনো। পরিবহনশ্রমিকদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের কল্যাণের কথা বলে তোলা এ অর্থের স্বচ্ছ হিসাব নেই। একটি বড় অংশ সংগঠনের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।

নিয়মিত কল্যাণ তহবিলের চাঁদার পাশাপাশি নানা খাতে অঘোষিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অন্যদিকে চাঁদার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আইনভঙ্গের পাশাপাশি ঘটছে অপরাধ কার্যক্রম ও রক্তক্ষয়ী সহিংসতাও। মহাসড়কে চাঁদাবাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।

১৯ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পরিবহন খাতে চাঁদার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। মন্ত্রী সেদিন বলেন, মালিক ও শ্রমিক সমিতি সমঝোতার ভিত্তিতে অর্থ তোলে বলে তাকে তিনি চাঁদাবাজি মনে করেন না। জোরপূর্বক অর্থ আদায় হলে তাকে চাঁদাবাজি বলা যায়। প্রশ্রয়ের শামিল আখ্যা দিয়ে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহল থেকে মন্ত্রীর এ মন্তব্যের সমালোচনা করা হয়েছে।

পরিবহনশ্রমিকদের ভাষ্য, চাঁদার নির্ধারিত অঙ্কের বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়। সময়মতো চাঁদার অর্থ পরিশোধ না করলে গাড়ি আটকে রাখাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানির মুখে পড়তে হয়।

মন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘টার্মিনালে নেওয়া অর্থ পরিচালন ব্যয় মেটানোর অংশ। তবে সড়কে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা থাকলে তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত।’

সাইফুল আলম আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কল্যাণ তহবিল তোলা হচ্ছে না। অন্য কোথাও তহবিলের নামে টাকা তোলা হলে সে দায় আমাদের না।’

যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘মন্ত্রীর বক্তব্য পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য হতে পারে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।’

মোজাম্মেল হক বলেন, সড়কে বিভিন্ন যানবাহন থেকে গড়ে বছরে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয় অনৈতিকভাবে।

পরিবহন খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের ৯ লাখের বেশি বাণিজ্যিক যান থেকে বছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় হয়। অনানুষ্ঠানিকভাবে যে অর্থ তোলা হয়, তার নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে নজরদারি চালানো সংস্থা টিআইবির প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএর কেউ কেউ, মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা এ অর্থের ভাগ পান। অনেক ক্ষেত্রেই কল্যাণ তহবিলের নামে আদায়কৃত টাকার লিখিত রসিদ বা বার্ষিক হিসাব শ্রমিকদের দেখানো হয় না।

যেভাবে চাঁদা তোলা হয়

খোঁজ নিয়ে সারা দেশেই বিভিন্ন মাত্রায় চাঁদাবাজি চলার বিষয়টি জানা গেছে। রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়ার সময় টার্মিনাল টোল, শ্রমিক কল্যাণ, মসজিদ বা ধর্মীয় খাত, চেইন মাস্টার, কলার বয় ও মালিক সমিতি ফিসহ বিভিন্ন নামে ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনা সার্ভিস থেকেও প্রতিদিন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা ‘লাইন খরচ’ নেওয়া হয়। দূরপাল্লার যাত্রায়ও বিভিন্ন স্থানে অর্থ আদায়ের কথা জানান চালকেরা।

রাজশাহীর শিরোইল বাস টার্মিনাল ও ভদ্রা কাউন্টারে শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বাসপ্রতি ৬২০ টাকা এবং মালিক সংগঠনের নামে ২২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের একটি সূত্র বলেছে, আদায় করা টাকার পুরোটা কল্যাণ তহবিলে জমা হয় না। তবে রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পাখি দাবি করেন, এ অর্থ শ্রমিক কল্যাণ ও সার্ভিস ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়।

চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতু মোড় এলাকা থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামমুখী বিভিন্ন বাস ও মিনিবাসের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি ১২০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। থ্রি-হুইলার ও অটোটেম্পো থেকেও ‘ওয়েবিল’ ও লাইন খরচের নামে বড় অঙ্কের টাকা তোলা হয়। নতুন ব্রিজ মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত (১৭ নম্বর) রুটে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ আদায় হচ্ছে বলে অভিযোগ মালিকদের।

ফরিদপুরে বিভিন্ন পয়েন্টে বাস ও ট্রাক থেকে ১০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন চালকেরা। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লায়ও টার্মিনাল টোল, চেইন মাস্টার বা স্ট্যান্ড ইজারার নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কথা জানা গেছে।

মালিক-শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহনশ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু বলেন, ‘মালিকেরা কল্যাণ তহবিলের নামে যে টাকা তোলেন, তা বাস্তবে শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যবহার হয় না। যেটুকু দেওয়া হয়, তা খুব সীমিত এবং মূলত মালিকদের সুবিধার জন্য। চাঁদার টাকা মূলত মালিকদের আত্মীয়স্বজন বা উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে চলে যায়। আমরা জানি, শ্রমিক মারা গেলে বা অসুস্থ হলে যে অর্থ দেওয়া হয়, তার অঙ্কও সীমিত। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে সাধারণত সেই সুবিধা পাওয়া যায় না। তাই কল্যাণের নামে তোলা অর্থ শ্রমিকদের কাজে আসে না।’

আবদুর রহিম বক্স আরও বলেন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি; অনেক রুটে আগের মতোই চলছে।

বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি এবং শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ বলেন, ‘বড় পরিবহন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরাও নিয়মিতই চাঁদাবাজির ভুক্তভোগী। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলসহ নওগাঁ, বগুড়া ও বরিশাল অঞ্চলে বেশি অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। রাজধানীর ভেতরে মহাখালী ও সায়েদাবাদ এলাকায় এ ধরনের ঝামেলা তুলনামূলকভাবে বেশি।’

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, ‘মহাসড়কে চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। কোথাও এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আইনের অবস্থান

সড়ক পরিবহন আইনের ৩৮ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার বা অনুমোদিত সংস্থা গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে টার্মিনাল উন্নয়ন ও পরিচালনা করতে পারবে এবং নির্ধারিত টার্মিনাল চার্জ আরোপ করতে পারবে। তবে ওই নির্ধারিত চার্জ ছাড়া টার্মিনাল, সড়ক বা মহাসড়কে কোনো পরিবহন যান থেকে অর্থ আদায় আইনসম্মত নয়। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাঁদার নির্দিষ্ট অঙ্ক বেঁধে দিয়ে নতুন একটি খসড়া নীতিমালার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই খসড়া নীতিমালায় পরিবহন মালিক সমিতি থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে ২০ টাকা এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন থেকে ১০ টাকা করে চাঁদা তোলার প্রস্তাব ছিল। কোনো টার্মিনালে শ্রমিক কমিটি থাকলে আলোচনা সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

তবে বিরোধিতার মুখে তখন আওয়ামী লীগ সরকার নীতিমালাটি অনুমোদন করেনি। এরপরও মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে ৭০ টাকা চাঁদা তোলা অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত হয়ে যায়। পরে এর সঙ্গে আরও বিভিন্ন খাতে চাঁদা যুক্ত হয়।

প্রতিকার নিয়ে পর্যবেক্ষকের অভিমত

পরিবহন খাতের কারিগরি দিক এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক। এ খাতে চাঁদাবাজি বন্ধে সমাধান কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজি নতুন কোনো সমস্যা নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল এবং এখনো আছে। এটি মূলত রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনের চুপচাপ সমর্থনের কারণে গড়ে উঠেছে। এ সমস্যার সমাধান সম্ভব, তবে তা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে সরকার ও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। চাঁদাবাজি নির্মূল করা গেলে পরিবহনব্যবস্থা অনেক পরিচ্ছন্ন ও নিয়ন্ত্রিত হবে।’

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাই মূল সমাধান। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা ও দৃশ্যমান শাস্তি, টার্মিনালে সরকারি নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’

(এই প্রতিবেদন তৈরি করতে সহায়তা করেছেন চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও সিলেট প্রতিনিধি)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুদ্ধ এড়াতে পরমাণু ইস্যুতে ছাড়ে প্রস্তুত, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যা চাইছে ইরান

নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের পরিচয়

বিএনপির যে নেতাদের ৬ সিটিতে প্রশাসক করল সরকার

বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা নিয়ে যা বললেন মির্জা ফখরুল

ভারতে পণ্ডিত ও ধনাঢ্য দুই ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ নয়, ঘটনা উল্টো

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত