Ajker Patrika

ক্ষতিগ্রস্ত ২২ হাজার ঘরবাড়ি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ক্ষতিগ্রস্ত ২২ হাজার ঘরবাড়ি
বন্যায় ধসে পড়া একতলা একটি পাকা ঘর। গতকাল সাতকানিয়া পৌরসভার দক্ষিণ সামিয়ারপাড়া এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বন্যার পানি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, কিন্তু স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, মৌলভীবাজার, নোয়াখালীর হাতিয়া, রাঙামাটি ও ভোলার মনপুরা—বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও মানুষ এখনো পানিবন্দী, কোথাও ভাঙা ঘর আর নষ্ট ফসল নিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু হয়েছে। সরকারি হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিন বাড়ছে, তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবের ধ্বংসযজ্ঞ সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বিস্তৃত। এখন দুর্গত মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—ত্রাণের পাশাপাশি নিরাপদ পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনে কার্যকর সহায়তা।

চট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত ১৫২২৮ ঘরবাড়ি

চট্টগ্রামে টানা ৯ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার ২ হাজার ৬৫০টি পরিবার পানিবন্দী।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, প্রাথমিক হিসাবে বন্যায় জেলার ১৫ হাজার ২২৮টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাঁশখালীতে ৪ হাজার ৫১০টি, সাতকানিয়ায় ২ হাজার ৪৮০টি, মহানগরে ২ হাজার ২৪৬টি, সন্দ্বীপে ১ হাজার ৬৪০টি এবং সীতাকুণ্ডে ১ হাজার ২৫০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহানগরের ২৪টি ওয়ার্ড, জেলার ১৫ উপজেলার ১৩২টি ইউনিয়ন এবং ৪০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

মাসুদুর রহমান বলেন, এসব তথ্য প্রাথমিক; পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।

বাঁশখালীর ইলশা ইউনিয়নের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হারেস বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালীতে। বিশেষ করে মাটির ও আধা পাকা ঘরবাড়ি ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

মৌলভীবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ৪ হাজার ঘর

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মনু ও ধলাই নদের পানি বেড়ে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়। এতে জেলার ২৮টি ইউনিয়নে প্রায় ৪ হাজার কাঁচা ও আধা পাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরহারা হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে হাজারো মানুষ।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় মোট ৩ হাজার ৯৩২টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৯৩টি সম্পূর্ণ এবং ১ হাজার ৪৩৯টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তারা এ তালিকা প্রস্তুত করেছেন।

বন্যার পানির তোড়ে ধসে পড়া মাটির ঘর। গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার  বাহারছড়া এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা
বন্যার পানির তোড়ে ধসে পড়া মাটির ঘর। গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ১,৬১৩ বাড়িঘর

টানা বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে ২০ জন নিহত হয়। ৯ দিনে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিতে জেলার ১০ উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও ৫টি পৌরসভার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে অন্তত আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দী ছিল।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যা ও পাহাড়ধসে ১ হাজার ৬১৩টি বাড়িঘর এবং ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায়। শুধু পেকুয়াতেই ৪৫০টি বাড়িঘর ও ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হাতিয়ায় ২০ কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা

ভারী বর্ষণ, জোয়ারের পানিতে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার কৃষি খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। আউশ ধান, আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজি, ফল, মরিচ, বরজসহ প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৮০ হাজার কৃষক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

কৃষি অফিস জানায়, ২১ হাজার ৫২০ হেক্টর আউশ ধান, ১ হাজার ৯২০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৯৫০ হেক্টর মৌসুমি সবজি, ৫৮ হেক্টর ফলের বাগান, ৪ হেক্টর মরিচ এবং ১০ হেক্টর বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তা আবদুল বাছেদ সবুজ বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

মনপুরায় প্লাবিত নিম্নাঞ্চল

ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরায় মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমার ১০০ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বেড়িবাঁধের ভেতর ও বাইরের নিম্নাঞ্চল ৫-৬ ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে রামনেওয়াজ লঞ্চঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের ৬০ কলোনিতে প্রায় ৬০টি পরিবার পানিবন্দী। কোথাও কোথাও বুকপানি থাকায় অনেককে ঘরের টিনের ছাদে আশ্রয় নিতে হয়েছে। বেড়িবাঁধবিহীন কলাতলী ইউনিয়নের চরকলাতলী, কাজীরচর ও ঢালচর এলাকায় ৫-৭ ফুট জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। এদিকে রামনেওয়াজ লঞ্চঘাট পানিতে ডুবে যাওয়ায় যাত্রীদের কোমরপানি পেরিয়ে লঞ্চে ওঠানামা করতে হয়েছে।

মাথা গোঁজার ঠাঁই চায় ফারুয়াবাসী

রাঙামাটির বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নে ১২ জুলাইয়ের বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ১৭টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১ হাজার ৪৮৬টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত, ২৫টি বসতঘর ও দোকান সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। বন্ধ রয়েছে ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১১টি পাড়াকেন্দ্র ও ৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ত্রাণ নয়; নদী খনন, নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন এবং ভূমির স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হওয়ায় ভূমির মালিকানা না থাকায় উঁচু স্থানে ঘর নির্মাণও সম্ভব হচ্ছে না।

বিপৎসীমার ওপরে ৮ নদ-নদীর পানি

অমাবস্যার প্রভাবে বরিশাল বিভাগের প্রায় সব নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই আটটি প্রধান নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল বিকেলে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠির উপকূলীয় এলাকার নিচু এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে যেতে দেখা গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম জানান, বন্যা নয়, অমাবস্যার প্রভাবে পানি বাড়ছে। তবে বাড়লেও জোয়ার-ভাটার কারণে পানি নেমে যাচ্ছে।

[প্রতিবেদনে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা]

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত