Ajker Patrika

চুক্তিতে নিয়োগ আগের মতোই

  • ১৯৮১ সালের বিসিএস (নিয়োগ) বিধিমালা দিয়ে শুরু
  • ২০১৪ সালে নীতিমালার উদ্যোগ নিয়েও তা হয়নি
  • ঐতিহ্য অব্যাহত থাকায় পেশাদারত্বে প্রভাবের আশঙ্কা
  • দীর্ঘ আওয়ামী শাসনের কারণে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন
শহীদুল ইসলাম, ঢাকা
চুক্তিতে নিয়োগ আগের মতোই

জনপ্রশাসনের বিশেষায়িত কোনো পদে ভালো বিকল্প না পাওয়ায় গত শতকের আশির দশকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রচলন হয়। ১৯৯০ সালের শেষে এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রশাসনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও এভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পর থেকে সব সরকারই সেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।

২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের শেষ তিন মেয়াদের পুরো সময় শত শত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারেরও প্রশাসন চালাতে প্রধান হাতিয়ার হয় এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। বর্তমান নির্বাচিত সরকারও একই পথে হাঁটছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিতে নিয়োগের কোনো নীতিমালা না থাকায় এর ন্যায্য ব্যবহার নিয়ে সংশয়ের অবকাশ থেকে যায়। এর ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাদারত্ব উপেক্ষা করে সরকারের আনুগত্য লাভের চেষ্টা করার প্রবণতাও বাড়ে।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে ১৯৮১ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (নিয়োগ) বিধিমালায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে সরকারকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এরপর এ ধরনের নিয়োগের সংখ্যা ক্রমে বেড়ে যায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের মেয়াদগুলোতে তা তুঙ্গে উঠেছিল। সমালোচনার মুখে ২০১৪ সালে কাকে, কীভাবে এবং সর্বোচ্চ কত বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া যাবে, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা করার উদ্যোগ নেয় হাসিনা সরকার। সর্বোচ্চ কত বছর বয়স পর্যন্ত এই সুযোগ দেওয়া হবে, তা-ও বেঁধে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু উদ্যোগটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

নীতিমালা না হওয়ায় ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে অবসর গ্রহণের পর কোনো কর্মচারীকে সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করতে পারবেন। ২০১৮ সালের পর থেকে এই আইনের অধীনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়াদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তত ১২ জন সাবেক কর্মকর্তাকে চুক্তিতে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

চুক্তিতে নিয়োগে সমস্যা কোথায়

এখন সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী অবসরে যাওয়া যে কাউকেই চুক্তিতে চাকরিতে ফেরাতে পারে সরকার। তবে নিয়মিত ব্যাচের কর্মরত-কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এভাবে নিয়োগ দিলে কর্মকর্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে তাঁদের পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তারা দলীয় আনুকূল্য অর্জনের চেষ্টা করেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদেরই চাকরির মেয়াদ শেষে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ফলে নিয়মিতদের মধ্যে যোগ্য অনেক কর্মকর্তাই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদোন্নতি পান না।

সাধারণত রাষ্ট্রদূত, দু-একজন সচিব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন কমিশন ও কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক, হাসপাতালের পরিচালক, রেলওয়ের কারিগরি পদের মতো ক্ষেত্রে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হতো। গত এক যুগ ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিবের মতো বিশেষ পদেও চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পরিচালক পদেও পছন্দের ব্যক্তিকে চুক্তিতে নিয়োগ দিচ্ছে সরকার।

প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে এভাবে নিয়মিতভাবে চুক্তিতে নিয়োগ হওয়ায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। চাকরির বয়স আর ৭ মাস রয়েছে জানিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে যখন বছরের পর বছর চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় তখন অনেকেই মনঃক্ষুণ্ন হন। কারণ নিয়মিত কর্মকর্তাদের সেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন হলে কর্মকর্তারা আরও ভালো করার প্রতিযোগিতায় মধ্যে থাকতেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে চুক্তিতে নিয়োগ চলতে থাকায় সরকারি কর্মকর্তারাও অনুগত লোক হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড নষ্ট হয়।

এবার পরিস্থিতি ভিন্ন?

চুক্তিতে নিয়োগ নিয়ে সাধারণভাবে সমালোচনা থাকলেও বর্তমান সরকারের সময় বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে দেখার পক্ষে মত দিয়েছেন কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাঁদের একজন বলেন, আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের শাসনামলে তাদের অনুগত কর্মকর্তারা প্রশাসনের শীর্ষ পদে ছিলেন। তাঁরা অবসরে যাওয়ার পর যাঁরা পদোন্নতির তালিকায় ছিলেন, তাঁরাও ওই সরকারের অনুগত। ফলে এখন বিএনপি সরকার চাইলেই নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে বাছাই করতে পারছে না। ফলে নিজেদের মতো করে প্রশাসন চালাতে এই সরকারকে কিছু পদে চুক্তিতে নিয়োগ না দিয়ে উপায় নেই।

কোনো সরকারই শুধু মেধা ও কাজের দক্ষতা মূল্যায়ন করে শীর্ষ পদের জন্য কর্মকর্তাদের বিবেচনা করেনি বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বিধিবিধানে যা বলা আছে, সেগুলো মেনে চললে কখনো চুক্তিতে নিয়োগের প্রয়োজনই হতো না।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনে যেভাবে নিজেদের লোককে বসিয়েছিল, সেই হিসেবে বর্তমান সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সংযত আছে বলেই মনে হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পদায়ন না হলে আগের সরকারের মতো তাদেরও সমালোচনার মুখে পড়তে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার প্রয়োজন মনে করলে কাউকে স্বল্প সময়ের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দিতেই পারে। তবে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বিবেচনায় না নিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় এই নিয়োগ দিলে প্রশ্ন উঠবে। দীর্ঘ সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়ে রাখা হলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে। চুক্তিতে নিয়োগের নীতিমালা না থাকায় যেকোনো পদে যে কাউকেই নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এটা থাকা উচিত না। একেবারেই বিকল্প না পাওয়া গেলে স্বল্প সময়ের জন্য বিশেষায়িত পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ: বেশির ভাগ উঠবে না সংসদে

রোজার সময় সহবাসের নিয়ম ও বিধান

অবশেষে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া আসনে প্রার্থী ঘোষণা, কে তিনি

কবি মোহন রায়হানের বাংলা একাডেমি পুরস্কার না পাওয়ার যে কারণ জানালেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

ফরিদগঞ্জে শৌচাগার থেকে প্রবাসীর স্ত্রীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত