Ajker Patrika

নতুন টার্মিনাল, দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের অপেক্ষায় কক্সবাজার

শাহরিয়ার হাসান, কক্সবাজার থেকে ফিরে
আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৮: ৫২
নতুন টার্মিনাল, দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের অপেক্ষায় কক্সবাজার
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা

বাইরে থেকে মনে হয় বিশাল এক ঝিনুকের খোলস। ভেতরে আধুনিক যাত্রীসেবা, প্রশস্ত হোল্ডিং লাউঞ্জ, সারি সারি চেক-ইন কাউন্টার। টার্মিনাল পেরিয়ে চোখ মেললেই সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে বিস্তৃত রানওয়ে। একসময় যেখানে সীমিত পরিসরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালিত হতো, সেই কক্সবাজার বিমানবন্দর এখন আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচলের প্রস্তুতিতে অনেকটাই এগিয়েছে। নতুন টার্মিনাল চালু হয়েছে, সম্প্রসারণ করা হয়েছে রানওয়ে, তৈরি হয়েছে নতুন অ্যাপ্রন (টারমাক)। বাকি এখন আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর আনুষ্ঠানিকতা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় ৩৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঝিনুকের আদলের নতুন যাত্রী টার্মিনালটি আপাতত অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে চলছে এর কার্যক্রম। টার্মিনালে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার, ১০টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার ও দুটি লাগেজ বেল্ট। পুরোপুরি চালু হলে বছরে ২০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিমানবন্দরের রানওয়ে সমুদ্রের দিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। প্রশস্ত করা হয়েছে উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের জায়গা। বড় উড়োজাহাজের ওঠানামার উপযোগী অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগও চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী নভেম্বরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতে পারে।

শুরুতে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এয়ার এশিয়া। পাশাপাশি নেপালের কাঠমান্ডু, চীনের কুনমিং ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে বিমান যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার থেকে বিদেশে যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, এয়ার এশিয়া কক্সবাজারে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে নিশ্চিত করেছে। এই ফ্লাইট চালু হলে কক্সবাজারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

মন্ত্রী জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিমানবন্দরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা

কক্সবাজার থেকে নেপালের কাঠমান্ডু রুটেও সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। একই সঙ্গে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ চলছে। এর মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটকদের কক্সবাজারে আকৃষ্ট করার লক্ষ্য রয়েছে।

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা

একসঙ্গে পাঁচটি উড়োজাহাজ পার্ক করার ব্যবস্থা

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিমানবন্দরে তৈরি করা হয়েছে নতুন অ্যাপ্রন। এর আয়তন ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটার। সেখানে দুটি সুপরিসর ও তিনটি ক্লাস-৮ উড়োজাহাজ পার্ক করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রানওয়ের সঙ্গে পার্কিং ইয়ার্ড ও টার্মিনালের সংযোগ স্থাপনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে দুটি ট্যাক্সিওয়ে।

টার্মিনালের সামনেও রাখা হয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। সেখানে ৩৫টি ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ গাড়ি রাখা যাবে। নতুন এই অবকাঠামো যাত্রীদের যাতায়াত ও উড়োজাহাজ পরিচালনার কাজে বাড়তি সুবিধা দেবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা

যাত্রীরা কী বলছেন

নতুন টার্মিনাল নিয়ে যাত্রীদের মধ্যেও রয়েছে উচ্ছ্বাস। গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইটে কক্সবাজার থেকে ঢাকায় আসা যাত্রী আশিকুর রহমান বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দরটি খুবই সুন্দর ও আধুনিক হয়েছে। আমার কাছে এটি ঢাকার বিমানবন্দরের তুলনায় অনেক ভালো লেগেছে। বিমানবন্দরের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা দেখে বেশ ভালো লেগেছে। এখান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা গেলে সেটি খুবই ভালো হবে।’

আবিদুর রহমান নামের আরও এক যাত্রী বলেন, এখান থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা গেলে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। বিশেষ করে, ঢাকায় যাত্রাবিরতি ও বিমান পরিবর্তনের ঝামেলা কমে যাবে।

যাত্রীদের প্রত্যাশা, আধুনিক টার্মিনাল ও উন্নত অবকাঠামোর সুবিধা শুধু অভ্যন্তরীণ যাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। কক্সবাজার থেকেই সরাসরি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। এতে সময় ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি পর্যটকদের যাতায়াতও সহজ হবে।

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশের দীর্ঘতম ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করতে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগর থেকে জমি পুনরুদ্ধার করে আগের ৯ হাজার ফুট দীর্ঘ রানওয়েকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই সম্প্রসারণের ফলে বড় উড়োজাহাজের ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের নতুন অ্যাপ্রন। এতে একসঙ্গে পাঁচটি উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের সুবিধা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক মো. গোলাম মুর্তজা হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিমানবন্দরটি প্রস্তুত রয়েছে। নতুন অ্যাপ্রন ব্যবস্থাপনার ফলে একই সময়ে পাঁচটি উড়োজাহাজ পার্ক করা সম্ভব হবে। এতে উড়োজাহাজ পরিচালনা আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর হবে।

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা

বিমানবন্দরের পরিচালক জানান, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২৭টি আগমন, ২৭টি বহির্গমনসহ ৫৪টি ফ্লাইট মুভমেন্ট পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি দুটি বোয়িং উড়োজাহাজও একই ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

নতুন টার্মিনাল ভবনটি আপাতত অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে চলছে এর কার্যক্রম। বিমানবন্দরের পরিচালক আশা করছেন, নতুন অবকাঠামোর ফলে যাত্রীরা আগের তুলনায় আরও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবেন এবং উন্নত সেবা পাবেন। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে এই অবকাঠামোর পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হবে।

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন টার্মিনাল ও দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে প্রস্তুত। ছবি: আজকের পত্রিকা

সাগরপাড়ের মানুষের উচ্ছ্বাস

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজারের যাত্রা শুরুর উদ্যোগে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়বে। সে সঙ্গে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় গতি আসবে।

কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে পর্যটন ব্যবসায় নতুন গতি আসবে এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন, করপোরেট ইভেন্ট ও সাংস্কৃতিক আয়োজন সহজ হবে। এতে স্থানীয় লোকজনের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতি গতিশীল হবে।

কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়লে শহরটির পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা ও স্থানীয় পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত