Ajker Patrika

খুলনার আইনশৃঙ্খলা: কথার আগে চলছে গুলি

  • পাঁচ দিনে গুলির ঘটনা তিনটি, ছয় মাসে ১৯ হত্যাকাণ্ড
  • সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পরিস্থিতি বেসামাল
  • জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে সন্ত্রাসীরা
শাহরিয়ার হাসান, ঢাকা ও কাজী শামিম আহমেদ, খুলনা
খুলনার আইনশৃঙ্খলা: কথার আগে চলছে গুলি
প্রতীকী ছবি

নিজেদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল খুলনার রূপসা উপজেলার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ সড়কের বাসিন্দা দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী। হঠাৎ মোটর সাইকেলযোগে এসে হেলমেট পরা দুই যুবক তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। একটি গুলি তার বাম পায়ে বিদ্ধ হয়ে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ওই স্কুলছাত্রী খুলনা মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর বোন।

গত শুক্রবার সন্ধ্যার এ ঘটনার এক দিন আগে নগরের লবণচরা থানার আশিবিঘা বালুর মাঠে ২২ বছর বয়সী এক যুবককে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তাঁর ডান ঊরুতে গুলি লাগে। এরও আগে গত ২৯ জুন রাতে নগরের গল্লামারী এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন রফিকুল ইসলাম (৩৫)। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে খুলনায় ঘটেছে তিনটি গুলির ঘটনা।

পুলিশ প্রশাসন ও স্থায়ীদের ভাষ্য, খুলনায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস। প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার এবং পুরোনো বিরোধকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা ঘটছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খুলনা মহানগরে ১৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আর ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর ঘটেছে ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, যেগুলোতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, নগরীতে অন্তত কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যরা এখন এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকাতেও অস্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধা করছে না। পুলিশের দাবি, অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে সন্ত্রাসীরা আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না।

খুলনায় কেন একের পর এক খুনোখুনি হচ্ছে এবং কেন তা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না—জানতে চাইলে খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান গত শুক্রবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মহানগরে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস। পাশেই সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা, যশোর, বাগেরহাট জেলা। অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলেছে। তবে প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হয়েছে, অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে।

আশা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’

দাপট দেখাচ্ছে যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপ

খুলনার অধিকাংশ আলোচিত অপরাধে ঘুরেফিরে কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনীর নাম উঠে এসেছে। এগুলো হলো রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানি’, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব বাহিনী এখন এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে জনবহুল এলাকাতেও প্রকাশ্যে গুলি করতে দ্বিধা করছে না। সাধারণ মানুষও ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহস পাচ্ছে না।

যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল তৎপরতা ও দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এসব বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়েছে।

কাগজে-কলমে পুলিশের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা রয়েছে। অভিযানও চলে। মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার ও মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের কথাও জানানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারীরা অধরাই থেকে যায়। কেউ গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আসে। ফলে একটি হত্যাকাণ্ড থেকে আরেকটি হত্যার পটভূমি তৈরি হচ্ছে।

জামিনে বেরিয়ে আবারও সক্রিয়

পুলিশ, কারাগার এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনার একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের সক্রিয় সদস্যরা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পর তারা আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

খুলনা পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ১৩ মে তৎকালীন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে ভারতের কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে হত্যা করা হয়। বহুল আলোচিত ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শীর্ষ চরমপন্থী আমানুল্লাহ সাঈদ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া। গত ৮ জুন তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন হাইকোর্ট।

গত ২২ ডিসেম্বর মাদকের ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে গুলিবিদ্ধ হন এনসিপি নেতা মোতালেব শিকদার। ওই ঘটনার চার দিন পর নগরের বসুপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন শুটার শামীম ওরফে ঢাকাইয়া শামীম ও তাঁর সহযোগী। পরে ১৩ মে তিনি জামিনে মুক্তি পান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, কারাগার থেকে বেরিয়ে ঢাকাইয়া শামীম ও তার সহযোগীরা আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।

শুধু ঢাকাইয়া শামীম নন, বি কোম্পানির প্রধান গ্রেনেড বাবু, নূর আজিম বাহিনীর সদস্যসহ আরও কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যও সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ৬ মে রাতে খুলনার একটি শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর সহযোগী কালা তুহিনসহ তিনজনকে রিভলবার, গুলি ও মাদকসহ বটিয়াঘাটার চক্রাখালী এলাকা থেকে নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করেন। পরে কালা তুহিন ও জিতু নামের দুই সন্ত্রাসী কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, মুক্তি পাওয়ার পর যৌথ বাহিনীকে তথ্য দিয়ে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করায় ৮ মে আজিজুল নামের এক ব্যক্তিকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে বটিয়াঘাটার নির্জন এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করে কালা তুহিনের সহযোগীরা। এরপর তাদের হামলায় নিহত হন কাজী রাশেদ নামের আরও এক যুবক।

এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কেএমপি কমিশনার জাহিদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা। জামিন দেওয়া বা কারাগার থেকে মুক্তির সিদ্ধান্ত আদালতের। জামিনে বের হলে আমাদের কিছু করার থাকে না।’

কমিশনার আরও বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা শহরের বাইরে থেকে এসে অপরাধ করে দ্রুত চলে যায়। এতে তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও অপরাধ দমনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠন এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত