Ajker Patrika

ট্রেনের ‘টাইম টেবিল’ লন্ডভন্ড

তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২: ০৮
ট্রেনের ‘টাইম টেবিল’ লন্ডভন্ড
ফাইল ছবি

কাগজ-কলমে ঢাকা থেকে রংপুরে যেতে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের সময় লাগে ৯ ঘণ্টা ৫০ মিনিট। কিন্তু বাস্তবে আরও অনেক রুটের মতো এই পথেও তা যেন সময়সূচির পাতায় সীমাবদ্ধ। ১ আগস্টের যাত্রায় পার্বতীপুরে ট্রেনটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। এতে ৪ ঘণ্টা ১০ মিনিট দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছায় ট্রেনটি। ৩১ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলা সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেন ১ ঘণ্টা ৫ মিনিট দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছায়। পরদিন ময়মনসিংহ-জারিয়া ঝানজাইল রুটের জারিয়া লোকালের গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হয় সাড়ে ৩ ঘণ্টা।

নানা কারণে ট্রেনের সময়সূচির হাল সাম্প্রতিককালে এমনই। গত ২৭ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট দিনের হিসাবেই দেখা গেছে, বিভিন্ন গন্তব্যের অন্তত ৭২টি ট্রেন নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেনি। রেলওয়ের দুই অঞ্চলের একটি পূর্বাঞ্চলে এই সংকট বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মিটারগেজ ইঞ্জিনের সংকট ও ইঞ্জিনের ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটিতে রেলযাত্রার সময় ঠিক থাকা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের এক অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। দেরি হওয়া ট্রেনগুলোর মধ্যে আন্তনগর, কমিউটার, মেইল ও লোকাল—সবই রয়েছে। দেরির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিলম্বিত মোট ৭২ ট্রেনের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে ছিল ২৮টি এবং পূর্বাঞ্চলে ৪৪টি। এতে স্পষ্ট, এ সময়ে ট্রেন বিলম্বের চাপ পূর্বাঞ্চলে অনেকটাই বেশি ছিল।

রেলসূত্র জানিয়েছে, ইঞ্জিন বিকল (ফেইলিউর), ইঞ্জিনে গোলযোগ, লাইনচ্যুতি, রেললাইন ব্রোকেন বা বাকলিং, অতিবৃষ্টি, কোচের ক্ষয়ক্ষতি, সিগন্যাল-পয়েন্ট-সিবিআই ও প্যানেল বোর্ডের সমস্যা, বৈদ্যুতিক সমস্যা, দুর্বৃত্তদের পাথর নিক্ষেপ এবং বিভিন্ন কারণে রেললাইন অবরোধের ঘটনায় এসব ট্রেন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।

নির্ধারিত সময়ে ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় বিশেষ করে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাসহ জরুরি কাজে যাওয়া যাত্রীরা সময়মতো পৌঁছাতে পারছেন না। স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দূরপাল্লার ট্রেন বিলম্বিত হলে পরবর্তী পরিবহন সংযোগও ব্যাহত হচ্ছে।

নিয়মিত ট্রেনযাত্রী আজাদুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সময়সূচির ওপর ভরসা করে যাত্রা শুরু করি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা দেরিতে ট্রেন পৌঁছালে কর্মস্থলে যাওয়া এবং অন্যান্য জরুরি কাজকর্ম ব্যাহত হয়। পাশাপাশি বাড়তি খরচও হয়।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘অর্থ ব্যয় করে যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে তারা ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হন। রেলের সময়সূচি মেনে চলাচল নিশ্চিত না হলে যাত্রীদের আস্থা আরও কমবে।’

ইঞ্জিন বিকল হওয়াতেই বড় ধাক্কা

রেলওয়েতে ইঞ্জিনের সংকট কার্যত চিরদিনের সমস্যা। এটি দিনে দিনে তীব্রতর হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতির অভিযোগও করেন। ২৭ জুলাই থেকে ৩ আগস্টের মধ্যে মাত্র আট দিনে দেশের বিভিন্ন রুটে অন্তত ১৮টি ট্রেনের ইঞ্জিন ফেইলিউর হয়েছে।

জামালপুর-সরিষাবাড়ী, লাকসাম, সীতাকুণ্ড, কাউরাইদ, সায়েদাবাদ-সান্তাহার, নাজিরহাট, রাজশাহী, গফরগাঁও, বিরামপুর, পার্বতীপুর, আলমডাঙ্গা, ফৌজদারহাট, গুণবতী, মোগলাবাজার ও বুড়িমারী সেকশনে এসব ঘটনা ঘটে।

বিকল্প ইঞ্জিন এনে ট্রেন সচল করতে বা ত্রুটি সারাতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এসব ঘটনায় ১৮টি ট্রেন সর্বনিম্ন ৩০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ৪ ঘণ্টা ১০ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছে।

যাত্রাপথে যান্ত্রিক ত্রুটি

২৯ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত যাত্রাপথে অন্য আরও ১২টি ট্রেনে বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। রেলের নথি অনুযায়ী, প্রধান ত্রুটিগুলোর মধ্যে ছিল মেইন রিজার্ভারের হাওয়া লিক, হুইল স্লিপ, কাপলিং খুলতে সমস্যা এবং এয়ার পাইপ ফেটে যাওয়া।

১ আগস্ট গরুর সঙ্গে জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কা লাগলে হোস পাইপ বিচ্ছিন্ন হয় এবং এয়ার পাইপ ভেঙে যায়। একই দিনে লাকসাম-লালমাই সেকশনে সুবর্ণ এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি প্রাইভেট কারের সংঘর্ষ হয়। এসব ঘটনায় ১২টি ট্রেন সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বিত হয়।

সিগন্যাল-প্যানেল বোর্ডে ত্রুটি

সিগন্যাল, পয়েন্ট, সিবিআই ও প্যানেল বোর্ডের ত্রুটির কারণে গত ২৮ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত ফাতেমানগর, ভানুগাছ, মুকুন্দপুর, ঢাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ফুলতলা, গৌরীপুর, তেজগাঁও, গঙ্গাসাগর, ভৈরব বাজার ও নরুন্দি স্টেশনে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এতে প্রায় ১৯টি ট্রেন সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বে চলাচল করে।

কোচ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিলম্ব

কোচের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত ২৭ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন রুটে প্রায় ১০টি ট্রেন বিলম্বে চলাচল করেছে। ঢাকা, সান্তাহার, ময়মনসিংহ, টঙ্গী আউটার, সীতাকুণ্ড-বারতাকিয়া, হাতীবান্ধা ও সরারচর সেকশনে এয়ার পাইপ বিচ্ছিন্ন হওয়া, ব্রেক বাইন্ডিং, ভ্যাকুয়াম ট্রাবল, শক অ্যাবজারবার ও হুইল সেটিংস গাইড ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি ঘটনা ঘটে।

এ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা ঘটে ৩০ জুলাই সীতাকুণ্ড-বারতাকিয়া সেকশনে। ঢাকা মেইল ট্রেনের একটি কোচের এয়ার সিলিন্ডার ভেঙে স্লিপারের সঙ্গে ঘর্ষণ হলে আগুনের ফুলকি দেখা দেয় এবং স্লিপার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোচটি সরাতে ট্রেনটি প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বিত হয়।

এ ছাড়া ২ আগস্ট ঢাকায় চিলাহাটি এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি কোচের হুইল সেটিংস গাইড ভেঙে যাওয়ায় সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট দেরি হয়। কোচের ক্ষতির ঘটনায় ১০টি ট্রেন সর্বনিম্ন ১৩ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছায়।

আলোচ্য সময়ের মধ্যে রেল ব্রোকেন, বাকলিং ও গাছ পড়ে বিলম্বিত হয় তিন ট্রেন। এ ছাড়া রেললাইন অবরোধ, ইঞ্জিনে আগুন ধরা, লাইনচ্যুত হওয়া, পাথর নিক্ষেপ এবং ক্রসওভার সমস্যার কারণে বেশ কয়েকটি ট্রেন বিলম্বিত হয়েছে।

মন্ত্রী ও রেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যাত্রীবাহী ট্রেনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে ইঞ্জিন বিকল হওয়া, সাম্প্রতিক কয়েকটি লাইনচ্যুতি এবং কুমিল্লায় বন্ধ লেভেল ক্রসিং এলাকায় লরি আটকে যাওয়ার মতো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পর ত্রুটি দ্রুত মেরামত এবং ভবিষ্যতে যেন এমন না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেল মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ৯ আগস্ট আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রেলের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ইঞ্জিন ও কোচের স্বল্পতা, বিশেষ করে মিটারগেজে। আবার ব্রডগেজ থেকে মিটারগেজে ট্রেন স্থানান্তরের সময়ও কিছু কারিগরি জটিলতায় অতিরিক্ত সময় লাগে। নানা দাবিতে রেলস্টেশন বন্ধ করে আন্দোলন করা হয়। এসব সমস্যা আমাদের প্রতিনিয়ত ফেস করতে হচ্ছে।’

সমস্যার সমাধানে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার এবং ঢাকা-সিলেট ডুয়েলগেজ ও ডাবল লাইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মিটারগেজ ইঞ্জিন এবং কোচের স্বল্পতায় সমাধানে নজর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যে মিটারগেজ ইঞ্জিনগুলো মেরামত করে চালানো যায়, সেগুলোর ওপর নজর দেওয়া হচ্ছে।

রেলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে যাত্রীবাহী ১১৬টি আন্তনগর, ১৫৬টি কমিউটার মেইল ও লোকাল ট্রেন চলে। সব মিলিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চলে ২৭২টি।

বিশেষজ্ঞের মত ও পরামর্শ

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রেলওয়ের বড় সমস্যা এখন শুধু অবকাঠামো নয়, পরিচালনাগত দুর্বলতাও। অধিকাংশ ট্রেন সময়সূচি মেনে চলতে পারে না। ইঞ্জিন বিকল হওয়া, পরিচালনাগত সমন্বয়হীনতা এবং আরও নানা কারণে ট্রেন বিলম্বিত হচ্ছে। এতে ভোগান্তি ছাড়াও যাত্রীর সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। রেলে বিপুল বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু সময়সূচি যদি শুধু কাগজেই থাকে, তাহলে সেই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। এখন নতুন প্রকল্পের চেয়ে বিদ্যমান সেবার নির্ভরযোগ্যতা, অপারেশনাল দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত