Ajker Patrika

বাংলাদেশ-ভারত: পুশ ইনে সীমান্তে উত্তেজনা

  • সীমান্তে ঝুঁকিপূর্ণ ৭০টি স্থান চিহ্নিত করেছে বিজিবি
  • টহল জোরদার করা হয়েছে। সহযোগিতা করছেন স্থানীয়রা
  • এক বছরে পুশ ইন করা হয়েছে ২৩৪৪ জনকে: বিজিবি
  • ২০২৫ সালে সীমান্তে হত্যার শিকার ৩৪ জন: আসক
 রাসেল মাহমুদ, ঢাকা
বাংলাদেশ-ভারত: পুশ ইনে সীমান্তে উত্তেজনা
৩০ থেকে ৩৫ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে বিএসএফ সদস্যরা। গত বুধবার কুষ্টিয়ায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সে দেশ থেকে লোকজনকে ধরে ধরে জোর করে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার (পুশ ইন) চেষ্টা করছে। দেশটির কেন্দ্রীয় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় আসার পর বিএসএফের এই তৎপরতা হঠাৎ বেড়ে গেছে।

পুশ ইন ঠেকাতে সীমান্তে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অনেক জায়গায় স্থানীয় লোকজন সহযোগিতা করছেন বিজিবি সদস্যদের। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বাড়ছে প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তে।

বিজিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের যেসব এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে পুশ ইন করার আশঙ্কা রয়েছে, এমন প্রায় ৭০টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু স্থানে পুশ ইনের আশঙ্কা বেশি। তাই সেসব এলাকায় বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি ও অতিরিক্ত বিজিবির সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া জনসাধারণকেও সচেতন করা হচ্ছে।

৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা, অবৈধ পুশ ইনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে জানায় বিজিবি।

বিজিবি সদর দপ্তরের উপপরিচালক কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বলেন, ‘এবারের সম্মেলনে আমরা পুশ ইন এবং সীমান্ত হত্যাকে এক নম্বর অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা করব। সেই প্রস্তুতি নিয়েই আমরা এবার যাচ্ছি। পুশ ইন এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতেই হবে।’

বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএসএফ মোট ২ হাজার ৩৪৪ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছিল। এর পর থেকে গত ৭ মে পর্যন্ত কোনো পুশ ইনের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে বিজিবি। তবে ৮ মে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঢেলে পাঠায় বিএসএফ। এর পর থেকে আবার একের পর এক ঘটতে থাকে পুশ ইন ও পুশ ইনের চেষ্টা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত আছে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত আছে দেশটির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে। এ ছাড়া ত্রিপুরার সঙ্গে ৮৫৬ কিলোমিটার, মেঘালয়ের সঙ্গে ৪৪৩ কিলোমিটার, মিজোরামের সঙ্গে ৩১৮ কিলোমিটার ও আসামের সঙ্গে ২৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দুই পর্বে ভোট হয় গত এপ্রিল মাসে। ফলাফল ঘোষণা হয় ৪ মে। ভোটে বড় ব্যবধানে জয় পায় বিজেপি। ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নিয়েই তিনি ঘোষণা দেন, ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ও ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আটক করে বাংলাদেশে পাঠানো হবে। তাদের আটক করতে হোল্ডিং সেন্টার তৈরির ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপিশাসিত ত্রিপুরা ও আসামে অনথিভুক্ত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরতসহ নানা বিষয় নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের বেশ অবনতি হয়। সেই পরিস্থিতিতে পুশ ইনের তৎপরতা বেড়ে গিয়েছিল। তবে তখন এই চেষ্টা বেশি হতো আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তে। পশ্চিমবঙ্গে কম হতো, কারণ রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেসনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ নিয়ে সোচ্চার ছিলেন তাঁর নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে। কিন্তু তখনকার বিরোধী দল বিজেপি নেতারা তখন হুংকার তুলতেন ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ইস্যুতে। এখন বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতায়।

পুশ ইন ছাড়াও সীমান্তে হত্যার অভিযোগ আছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। এ ছাড়া ২০২৪ সালে ৩০ জন এবং ২০২৩ সালে ৩১ জন বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে নিহত হন।

ঝুঁকিপূর্ণ ৭০টি স্থান চিহ্নিত

বিজিবি ও সীমান্ত সূত্র জানায়, পুশ ইন করার জন্য ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন এলাকায় লোকজনকে জড়ো করছে বিএসএফ। প্রায় সব এলাকাতেই এ ধরনের তৎপরতা চলছে। পুশ ইনের আশঙ্কায় বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ৭০টি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে যশোরের খোশালপুর বিওপির ইছামতী নদীসংলগ্ন ভারতের জঙ্গল এলাকা, যাদবপুর-রঘুনাথপুর ও বেনাপোল এলাকা পুশ ইনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর; সাতক্ষীরা, নওগাঁ জেলার সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা এবং দুর্গম ও জনবসতিহীন সীমান্তপথের কয়েকটি স্থানেও লোকজন জড়ো করে বাংলাদেশে পুশ ইনের আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর, ঝিনাইদহের যাদবপুর-মহেশপুর, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর, পঞ্চগড়ের রওশনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ, সিলেটের উৎমাছড়া, নেত্রকোনার কচুগড়া, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বাগিছড়া ও চম্পাছড়া, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের রেমা, ফেনীর ছাগলনাইয়ার মতুয়া, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দংয়ের ম্যাংগো গার্ডেন, কুড়িগ্রামের রৌমারীর বড়াইবাড়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরসহ সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় লোকজন জড়ো করে ঠেলে পাঠানোর আশঙ্কা রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে গত বুধবার গভীর রাতে নারী, পুরুষ, শিশুসহ ২৮ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়। পরে তাঁরা বাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের ব্রজনাথপুর এলাকায় ঘোরাফেরা করলে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের বিজিবির কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর বিজিবি তাঁদের সীমান্ত এলাকায় ফেরত পাঠায়। বর্তমানে তারা ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে নওগাঁ-১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বুধবার গভীর রাতে ২৮ ব্যক্তিকে অবৈধভাবে পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়। আমরা তাঁদেরকে ঠেকিয়ে দিয়েছি। তাঁরা শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) অবস্থান করছেন।’

বুধবারেই ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের একটি প্রিজনভ্যানে করে প্রায় ৩০-৩৫ জন ব্যক্তিকে সীমান্ত গেট খুলে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবি টহল দল ও স্থানীয় জনসাধারণের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের পুনরায় ভ্যানে তুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

এর আগে গত ৩১ মে রাতে যশোরের বেনাপোলের রঘুনাথপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের হরিদাসপুর এলাকায় শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে জড়ো করে বিএসএফ। পরে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে বিজিবি বাধা দেয়। তখন ওই ব্যক্তিরা দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) অবস্থান করছিলেন। পরে রাতে তাঁদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

যশোরের রঘুনাথপুরে বিজিবি-৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিএসএফ আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে লোকজনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ ইন করার চেষ্টা করছে। আমরা এভাবে অবৈধভাবে কাউকে প্রবেশ করতে দেব না। বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’

অবৈধভাবে পুশ ইন ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে বিজিবি। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অবৈধ পুশ ইন, মানব পাচার এবং মাদক ও অন্যান্য পণ্যের চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে।

অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে ভারত। তবে বাংলাদেশ বলছে, কাউকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আনুষ্ঠানিক ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। একতরফাভাবে সীমান্ত দিয়ে কাউকে পাঠানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

সচিবালয়ে গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশ কোনো ধরনের অবৈধ পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের পক্ষে নয়। এ কারণে সীমান্তে বিজিবিকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত