Ajker Patrika

মেলায় বিদায়ের সুর

শরীফ নাসরুল্লাহ, ঢাকা
মেলায় বিদায়ের সুর
ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

আজ রোববারই এবারের একুশে বইমেলার শেষ দিন। সন্ধ্যার কিছু পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙবে বই ঘিরে লেখক-পাঠকের এই বার্ষিক মিলনমেলা। বইপ্রেমীদের পদচারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ মুখরিত হতে আবার এক বছরের অপেক্ষা। মাত্র ১৮ দিন চলা এবারের মেলায় লোকসমাগম তেমন হয়নি। শেষের দুই দিন আগে প্রবল বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়াও অনেকের ক্ষতি করে দিয়ে গেছে।

প্রকাশকদের একটা অংশ জানান, কোভিডের সময়ের চেয়ে এবারের মেলায় তাঁদের লোকসান বেশি হয়েছে। রমজানের সময় মেলা বসায় এমনটা যে হতে পারে, তা অনুমান করেই অনেকে মেলা ঈদের পর নিতে দাবি তুলেছিলেন।

শুক্রবারের ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি স্টল। গতকাল ‘স্বরে অ’, দাঁড়িকমা’সহ বেশ কয়েকটি স্টলের সামনে বই শুকাতে দেওয়া হয়েছে দেখা গেল। স্বরে অ-র সম্পাদক অনিমেষ প্রাচ্য কাপড় দিয়ে বই মুছে সাজিয়ে রাখছিলেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বললেন, সিলিংয়ের ওপরে এখনো পানি জমে আছে। ওপরে টিনের ছাউনি থাকলেও মুষলধারে বৃষ্টি পড়ায় বই ভিজে গেছে।

কর্মীদের বই শুকানোর কাজ করতে দেখা যায় অনেক স্টলেই। বৃষ্টিতে মেলার মাঠেও পানি জমে গিয়েছিল। কোনো কোনো স্টলের সামনে কাদা হয়ে যায়। তবে গতকাল সকাল থেকেই কড়া রোদের তাপে কাদাপানি অনেকটাই শুকিয়ে যায়।

তারিখ নিয়ে বিসংবাদ আর অনিশ্চয়তার কারণে এবারের বইমেলায় অনেকেই শেষ দিকে এসে স্টল নিয়েছেন। তাড়াহুড়ো করে স্টল তৈরি করতে হয়েছে বলে বৃষ্টিতে তাদেরই ক্ষতি বেশি হয়েছে।

গতকাল রাতেই বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের সংবাদ সম্মেলন করে পুরো মেলার চিত্র তুলে ধরার কথা। একদল প্রকাশক তার আগেই এক সংবাদ সম্মেলনে মেলা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা কিছু দাবিদাওয়াও উল্লেখ করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) স্বত্বাধিকারী মাহরুখ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘প্রায় পাঠকশূন্য এই মেলায় অংশ নিয়ে প্রকাশকেরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত ২০২৫ সালের বইমেলায় বিক্রি কমেছিল ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ। আর চলমান ২০২৬ সালের মেলায় বিক্রি কমেছে ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ!’

মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, সামগ্রিকভাবে অন্যান্য স্বাভাবিক বছরের তুলনায় এ বছর মেলায় বই বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কম। এবারের মেলার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন মেলার চেয়ে শোচনীয়। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচটুকুও ওঠেনি। প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের ৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি।

ইউপিএলের স্বত্বাধিকারী আরও বলেন, ‘প্রতিবছর বইমেলায় ৩০-৪০ কোটি টাকার বই বিক্রির যে মুখরোচক তথ্য প্রচার করা হয়, বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। প্রকৃত বিক্রি তার চেয়ে অনেক কম। তবে আমরা স্বপ্ন দেখি, একটি ১০০ কোটি টাকার বইমেলার। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি বই বিক্রি করার স্বপ্ন কোনো অবান্তর কল্পনা নয়।’

সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের সহায়তার জন্য সরকারিভাবে মেলায় অংশ নেওয়া সব প্রকাশকের অন্তত একটি করে মানসম্পন্ন বইয়ের ৩০০ থেকে ৫০০ কপি কেনা, প্রকাশনাশিল্পে দক্ষ কর্মী তৈরিতে প্রশিক্ষণ, লাইব্রেরির উন্নয়ন ও পাঠাভ্যাস তৈরিতে কর্মসূচি নেওয়া, পরিকল্পিতভাবে আগে থেকেই মেলার সময় নির্ধারণ এবং জাতীয় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়ন করা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অনন্যা প্রকাশনীর মনিরুল হক, অনুপম প্রকাশনীর মিলনকান্তি নাথ, এডর্ন পাবলিকেশনের সৈয়দ জাকির হোসেন, আদর্শ প্রকাশনীর মাহাবুব রহমান প্রমুখ।

নতুন বইয়ের খোঁজে

‘তবক দেওয়া পান’ ষাটের দশকের প্রখ্যাত কবি আসাদ চৌধুরীর প্রথম কবিতার বই। আসাদ চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঐতিহ্য বইটির নতুন সংস্করণ বের করেছে।

তাশরিক ই হাবিবের লেখা ‘কথাশিল্পী শহীদুল জহির’ বের করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের রচনায় উঠে এসেছে ব্যক্তির মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ইতিহাস-রাজনীতির জটিলতা আর অন্যায়সহ সমাজবাস্তবতা। এই বইয়ে তাঁর গল্প ও উপন্যাসের নানা দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বাংলা একাডেমির স্টলে গতকাল এসেছে বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ১১টি গল্পের সংকলন ‘নো আদার চয়েস’।

গতকাল মেলার তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ১৫৭টি। গতকাল পর্যন্ত জমা পড়া মোট নতুন বইয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৭৭১।

অন্যান্য আয়োজন

মূলমঞ্চে ছিল সেকালের পূর্ববঙ্গের মুক্তচিন্তার পথিকৃৎ সংগঠন মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ নিয়ে আলোচনা। এতে প্রাবন্ধিক মোরশেদ শফিউল হাসান বলেন, মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেখকেরা মূলত সে সময়কার প্রচলিত সাহিত্যিক বাংলাতেই তাঁদের লেখালেখি করেছেন, যে ভাষাতে হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে সকলেই সাহিত্যচর্চা করতেন। বাঙালি মুসলমানের জন্য বাংলা ভাষা চর্চা কিংবা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এ ভাষার অপরিহার্যতার বিষয়টি গোড়া থেকেই মুসলমান সাহিত্য সমাজের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের চিন্তায় গুরুত্ব পেয়েছিল। তাঁরা মনে করতেন, মাতৃভাষার মধ্য দিয়েই জগতের ভাবধারার সঙ্গে সমাজকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত, তাহলেই আমাদের পক্ষে উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়া সহজ হবে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন মমতাজ জাহান। ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি জাকির আবু জাফর, কথাসাহিত্যিক-অনুবাদক শাকির সবুর, প্রবন্ধিক রাজীব সরকার এবং গবেষক খান মাহবুব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদ এবং আবদুল আলীম ফাউন্ডেশনের পরিবেশনা।

গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার (বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক বই প্রকাশ) পেয়েছে কথাপ্রকাশ। গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা বইয়ের জন্য যৌথভাবে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে ঐতিহ্য (আমিন বাবুর বই ‘কালি-কলম আর কাগজের অড রিসার্চ: ফাউন্টেন পেন’), প্রথমা প্রকাশন (মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের বই ‘শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা’) এবং ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (বাংলাপ্রেমী পশ্চিমা গবেষক ক্লিনটন বি সিলীর বই ‘বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড: এসেজ অন বাংলা লিটারেচার’-এর জন্য)।

রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার (সর্বাধিক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য) পেয়েছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার (মেলায় প্রথম অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশ) পেয়েছে সহজ প্রকাশ। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার (বইয়ের নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা) ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স, মাত্রা প্রকাশ ও বেঙ্গলবুকস।

আজ রোববার অমর একুশে বইমেলার সমাপনী দিনে মেলা শুরু হবে বেলা ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ৩টায় হবে সমাপনী অনুষ্ঠান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত