Ajker Patrika

ডার্ক ট্যুরিজম কেবল রোমাঞ্চ নয়, ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
ডার্ক ট্যুরিজম কেবল রোমাঞ্চ নয়, ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ
অ্যাডভেঞ্চার ও থ্রিল-সন্ধানী একদল ভিন্নধর্মী পর্যটক এখন আর সমুদ্রসৈকত বা কোনো বিখ্যাত শহরের রাস্তায় ঘোরে না। তাদের গন্তব্য এখন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় এলাকা, যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ কিংবা অভিশপ্ত কোনো স্মৃতিচিহ্ন। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

১৮৬১ সালের এক মনোরম দুপুর। আমেরিকার ভার্জিনিয়ার মানাসাস গ্রামীণ প্রান্তরে হঠাৎ ভিড় জমালেন শত শত সাধারণ মানুষ। হাতে পিকনিক বাস্কেট, চোখে অপেরা গ্লাস। কোনো নাটক বা অপেরা দেখতে নয়, তারা এসেছিল আমেরিকান গৃহযুদ্ধের প্রথম বড় যুদ্ধক্ষেত্র বুল রানে মানুষের রক্তক্ষয়ী লড়াই দেখতে। ছুটির দিনে আনন্দ করতে গিয়ে রক্তাক্ত সেই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে ফিরতে হয়েছিল তাদের। কোনো এক লেখক পরবর্তী সময়ে একে অভিহিত করেছিলেন ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে পিকনিক’ হিসেবে।

উনিশ শতকের সেই অদ্ভুত ও কিছুটা বিকৃত কৌতূহল কিন্তু ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। আধুনিক যুগে এসে সেই আগ্রহই জন্ম দিয়েছে এক নতুন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ধারা, যাকে বলা হচ্ছে ডার্ক ট্যুরিজম। অ্যাডভেঞ্চার ও থ্রিল-সন্ধানী একদল ভিন্নধর্মী পর্যটক এখন আর সমুদ্রসৈকত বা কোনো বিখ্যাত শহরের রাস্তায় ঘোরে না। তাদের গন্তব্য এখন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় এলাকা, যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ কিংবা অভিশপ্ত কোনো স্মৃতিচিহ্ন।

ডার্ক ট্যুরিজমের দুই রূপ

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ধকারের এই ভ্রমণের রূপ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হয় বিপজ্জনক ও সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে। যেমন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট যে দেশগুলোকে ‘ডু নট ট্রাভেল’ বা ভ্রমণ অনুপযোগী বলে চিহ্নিত করেছে, সেসব দেশে। উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান, সুদান, চাদ কিংবা হাইতি হতে পারে সে গন্তব্য। আর একটি হলো অভিশপ্ত বা ট্র্যাজিক কোনো জায়গায় ভ্রমণ। যেখানে কোনো এক সময়ে ঘটে গেছে নারকীয় হত্যাকাণ্ড বা ট্র্যাজেডি। যেমন কম্বোডিয়ার কিলিং ফিল্ডস, ইউক্রেনের চেরনোবিল কিংবা গায়ানার জন্সটাউন, যেখানে ১৯৭৮ সালে ৯ শতাধিক মানুষ আত্মহত্যা করেছিল।

ভ্রমণ তালিকায় এসব দেশ যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবও কম নয়। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে কিছুটা ভিন্নধর্মী ও চমকপ্রদ কনটেন্ট দেওয়ার প্রতিযোগিতা তরুণ প্রজন্মকে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কেন এই ভ্রমণ

দক্ষিণ কোরিয়ায় লুক্সেমবার্গের পর্যটক আরনল্ড কারবি। ছবি: সিএনএন
দক্ষিণ কোরিয়ায় লুক্সেমবার্গের পর্যটক আরনল্ড কারবি। ছবি: সিএনএন

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষ কেন সাধ করে নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে এসব জায়গায় যাবে? এই বিষয়ে লুক্সেমবার্গের অভিজ্ঞ পর্যটক আরনল্ড কারবি সিএনএনকে বলেছেন, ‘আমার প্রধান অনুপ্রেরণা হলো ইতিহাস। ইতিহাস বইয়ে কোনো জায়গার কথা পড়া আর সেখানে নিজে গিয়ে তার জটিল পটভূমি প্রত্যক্ষ করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।’ মার্কিন ও ব্রিটিশ প্রশাসনের জারি করা লাল সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই তিনি ঘুরে এসেছেন চাদ ও সিরিয়ার মতো সংঘাতময় এলাকা। চাদের জাকুমা ন্যাশনাল পার্কের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সেখানকার বন্য হাতির দল গাড়ির শব্দে পালিয়ে না গিয়ে বরং কৌতূহলী হয়ে গাড়ির কাছে চলে আসে, যা কেবল এমন অনাবিষ্কৃত জায়গাতেই সম্ভব। এ ধরনের পর্যটকের অনেকেই মনে করে, পশ্চিমা গণমাধ্যমে কোনো দেশকে যেভাবে ‘ভয়ংকর’ বা ‘খলনায়ক’ বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর কোরিয়ার মতো জায়গায় গিয়ে আরনল্ড স্থানীয়দের যে অপূর্ব আতিথেয়তা ও উষ্ণতা পেয়েছেন, তা তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। যদিও এই রোমাঞ্চের পথ সব সময় মসৃণ হয় না।

ইতিহাসের গভীর ক্ষত ছুঁয়ে দেখা

ডার্ক ট্যুরিজম কেবল বাকেট লিস্টের টিকচিহ্ন নয়। এটি মানবতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোকে বোঝার অন্যতম মাধ্যম। লেখক এইচ ই সোয়্যার চেরনোবিল থেকে শুরু করে নাৎসিদের বধ্যভূমি অস্ট্রিয়ার হার্টহেইম ক্যাসেল ভ্রমণ করে উপলব্ধি করেছেন, স্মৃতিসৌধগুলো কীভাবে সমাজ ও ইতিহাসের রূপ বদলে দেয়। সম্প্রতি গায়ানার জন্সটাউনে স্থানীয় গাইডদের সাহায্যে শুরু হয়েছে এই এডুকেশনাল ট্যুরিজম, যা মানুষকে সাইকোলজি ও ইতিহাসের এক ভিন্ন পাঠ শেখায়। প্রতিটি দেশেরই কিছু না কিছু দেওয়ার আছে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলে এসব বিপজ্জনক বা অন্ধকার ইতিহাস ছোঁয়া জায়গাগুলোতে পা রাখার পেছনে কাজ করে অদম্য কৌতূহল আর ইতিহাস নিজের চোখে স্পর্শ করার এক অদ্ভুত তীব্র বাসনা। ডার্ক ট্যুরিজম তাই কেবল রোমাঞ্চ নয়, বরং মানবতার অন্ধকার থেকে শিক্ষা নিয়ে আলোতে ফেরার এক অন্য রকম যাত্রা।

সূত্র: সিএনএন

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত