Ajker Patrika

সঙ্গী ‘ইমোশনালি আনঅ্যাভেইলেবল’? যেভাবে বুঝবেন এবং যা করবেন

নাহিন আশরাফ 
সঙ্গী ‘ইমোশনালি আনঅ্যাভেইলেবল’? যেভাবে বুঝবেন এবং যা করবেন
একটি সম্পর্কে দুজন মানুষের সব অনুভূতি একই রকম হবে না। কিন্তু মতের পার্থক্য থাকা এবং অন্যের অনুভূতিকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

একটি সম্পর্কের শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিকের চেয়ে সুন্দর মনে হতে পারে। নিয়মিত মোবাইল ফোনে কল, দীর্ঘ সময় কথা বলা, ছোট ছোট বিষয়ে খোঁজ নেওয়া—এসব দেখে সহজে মনে হয়, দুজন মানুষের মধ্যে গভীর বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের অভিজ্ঞতা বদলে যায়। হঠাৎ দেখা যায়, একজন মানুষ দৈনন্দিন নানা বিষয় নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও নিজের অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে চান না। সম্পর্কের কোনো জটিল বিষয় উঠলে তিনি এড়িয়ে যান। অন্যজন কষ্টের কথা বললে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে না নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন। আবার কখনো সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সময় তিনি নিজেই দূরত্ব তৈরি শুরু করেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকে একটি শব্দ ব্যবহার করেন—ইমোশনালি আনঅ্যাভেইলেবল বা আবেগগতভাবে অনুপস্থিত।

কখন বুঝবেন সঙ্গী এমন

চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘কাউকে বিচার করার আগে বিষয়টি বোঝা জরুরি। কারণ, কম কথা বলা, নিজের ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখা বা সব সময় আবেগ প্রকাশ না করা মানেই একজন মানুষ আবেগগতভাবে অনুপস্থিত—এমন নয়।’

তিনি জানান, মূল বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্কের মধ্যে তাঁর আচরণে আগ্রহের অভাবের নির্দিষ্ট ধরন দেখা যাচ্ছে কি না, সেটা খেয়াল করতে হবে।

সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে একজন মানুষ সব সময় একটি অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখছেন, তখন বিষয়টি সম্পর্কের অন্য মানুষটির মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। প্রতিকী ছবি: পেক্সেলস
সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে একজন মানুষ সব সময় একটি অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখছেন, তখন বিষয়টি সম্পর্কের অন্য মানুষটির মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। প্রতিকী ছবি: পেক্সেলস

আবেগের কথা এলেই যে কারণে অস্বস্তি হয়

একজন মানুষ হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। সিনেমা, খেলাধুলা, অফিস কিংবা দৈনন্দিন ঘটনা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারেন। কিন্তু যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ‘তুমি কি কোনো বিষয়ে চিন্তিত?’ অথবা ‘আমাদের সম্পর্ক নিয়ে তোমার অনুভূতি কী?’—তখন তিনি অস্বস্তিতে পড়ে যেতে পারেন।

কেউ হয়তো সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন। কেউ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করেন। আবার কেউ মজা করে পরিস্থিতি এড়িয়ে যান।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতা একেকজনের একেক রকম। তাই একবার বা দুবার এমন ঘটলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যদি দেখা যায়, সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে একজন মানুষ সব সময় একটি অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখছেন, তখন বিষয়টি সম্পর্কের অন্য মানুষটির মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

ঘনিষ্ঠতা বাড়লেই কি আগ্রহ কমে যায়

সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘অনেক সম্পর্কেই একটি অদ্ভুত চক্র দেখা যায়। শুরুতে একজন মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক থাকেন। নিয়মিত যোগাযোগ করেন, সময় দেন এবং আগ্রহ দেখান। কিন্তু সম্পর্কটি যখন আরও গভীর পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করে, তখন তার আচরণ বদলে যেতে পারে।’

অর্থাৎ মানুষটি আগের মতো যোগাযোগ না করা, হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়া বা কথাবার্তায় আগ্রহ কমে যাওয়া—এসব আচরণ অন্য মানুষটিকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ভয় থাকতে পারে। কেউ হয়তো অতীতে আঘাত পেয়েছেন। আবার কেউ সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত না-ও থাকতে পারেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কি একটি সাময়িক পরিবর্তন, নাকি বারবার ঘটতে থাকা একটি অভ্যাস, সেটি বুঝতে পারা।’

অনুভূতিকে গুরুত্ব না দিলে যা হতে পারে

একটি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুজনের চিন্তা এক না-ও হতে পারে। কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে সৎ ও দায়িত্বশীলভাবে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: পেক্সেলস
একটি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুজনের চিন্তা এক না-ও হতে পারে। কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে সৎ ও দায়িত্বশীলভাবে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: পেক্সেলস

একটি সম্পর্কে দুজন মানুষের সব অনুভূতি একই রকম হবে না। একজন যে কারণে কষ্ট পাবেন, অন্যজন হয়তো সেটিকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন না। কিন্তু মতের পার্থক্য থাকা এবং অন্যের অনুভূতিকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।

ধরা যাক, একজন বললেন, ‘তুমি কয়েক দিন ধরে আমার সঙ্গে আগের মতো কথা বলছ না। এতে আমার খারাপ লাগছে।’

এর উত্তরে অন্যজন বলতে পারেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, তোমার খারাপ লাগছে, তবে আমি আসলে কাজের চাপে ছিলাম।’

এটি একটি প্রতিক্রিয়া।

অন্যদিকে বারবার যদি বলা হয়, ‘তুমি অযথা নাটক করছ’, ‘তোমার সমস্যা তুমি নিজেই তৈরি করছ’ কিংবা ‘এত সংবেদনশীল হওয়ার দরকার নেই’, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

একসময় মানুষটি ভাবতে শুরু করতে পারেন, নিজের কষ্টের কথা বলাই হয়তো ভুল। একটি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুজনের চিন্তা এক না-ও হতে পারে। কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে সৎ ও দায়িত্বশীলভাবে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ।

যখন সম্পর্কের আবেগের ভার একজনই বহন করেন

একটি সম্পর্কে কখনো কখনো দেখা যায়, একজন মানুষ নিজের সব কথা খুলে বলেন। তাঁর ভয়, দুঃখ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছুই সঙ্গীর সঙ্গে ভাগ করেন। কিন্তু অন্যজন সম্পর্কে নিজের ভেতরের জগৎ প্রায় অজানাই থেকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সম্পর্কের মধ্যে একটি অসমতা তৈরি হতে পারে। একজন ক্রমাগত নিজের আবেগ বিনিয়োগ করছেন, কিন্তু অন্যজন একইভাবে নিজেকে প্রকাশ করছেন না। দীর্ঘদিন ধরে যদি সম্পর্কটি একতরফাভাবে আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে একজন মানুষ সম্পর্কের মধ্যেই একাকিত্ব অনুভব করতে পারেন।

সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘একটি সুস্থ সম্পর্কে প্রতিটি মুহূর্তে দুজনের দেওয়া সমান হবে—এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষ কখনো বেশি দুর্বল থাকে, কখনো বেশি শক্ত থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যদি সব সময় একজনই অন্যজনকে সামলান, তাহলে সম্পর্কটি ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।’

তাহলে করণীয় কী

সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘প্রতিনিয়ত এমন ঘটনার শিকার হলে প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একটি সম্পর্কের মধ্যে বারবার যদি কেউ একা, অবহেলিত বা অনিশ্চিত বোধ করেন, তাহলে সেই অনুভূতিকে চেপে রাখা সমাধান নয়। তবে অভিযোগের ভাষায় কথা বলার পরিবর্তে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলা সহজ হতে পারে।’

তিনি জানান, এরপর গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্য মানুষটির প্রতিক্রিয়া। তিনি কি মনোযোগ দিয়ে শুনছেন? নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন? সম্পর্কের সমস্যাটি বোঝার চেষ্টা করছেন? নাকি প্রতিবার আপনার অনুভূতিকে অপ্রয়োজনীয় বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন, সেটি বুঝতে চেষ্টা করা।

কারণ, একজন মানুষের সমস্যা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সম্পর্ককে ভালো রাখার জন্য সেই সমস্যা নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

নিজের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠুন

ভালোবাসা শুধু নিয়মিত দেখা করা বা একসঙ্গে সময় কাটানোর নাম নয়। একজন মানুষ আপনার সঙ্গে থাকতে পারেন, কিন্তু আপনি তার কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে নিরাপদ বোধ না-ও করতে পারেন। আবার কেউ খুব বেশি কথা বলেন না, কিন্তু আপনার মন খারাপ হলে মন দিয়ে শোনেন। আপনার অনুভূতিকে ছোট করেন না এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকার চেষ্টা করেন। তাই সম্পর্ক নিয়ে ভাবার সময় শুধু ‘সে আমাকে ভালোবাসে কি না’—এই প্রশ্নই যথেষ্ট নয়। মানুষটির সঙ্গে আমি কি নিজের সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি? এ বিষয়টি বুঝতে পারাও জরুরি।

একটি সম্পর্ক তখনই গভীর হয়, যখন দুজন মানুষ সেখানে শুধু নিজেদের আনন্দ নয়, ভয়, দুর্বলতা এবং কষ্ট নিয়েও উপস্থিত থাকতে পারেন। আর যদি দীর্ঘদিন ধরে মনে হয়, মানুষটি শারীরিকভাবে খুব কাছে থেকেও আবেগের জায়গায় সব সময় দূরে, তাহলে সেই অনুভূতিকে অবহেলা না করে সম্পর্কের যোগাযোগের ধরনটি নতুন করে দেখা প্রয়োজন।

সূত্র: সাইক সেন্ট্রাল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত