Ajker Patrika

ভূরাজনৈতিক আলোচনার বাইরে গ্রিনল্যান্ড পর্যটকদের জন্য কেমন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ইলুলিসাটের ডিসকো উপসাগরে ভেসে উঠছে বরফখণ্ড। ছবি: এএফপি
গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ইলুলিসাটের ডিসকো উপসাগরে ভেসে উঠছে বরফখণ্ড। ছবি: এএফপি

বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে চলছে হাড়কাঁপানো শীত। বছরের এই সময়ে আর্কটিকের এই বিশাল দ্বীপ প্রায় ২৪ ঘণ্টা অন্ধকারের চাদরে ঢাকা থাকে। কিন্তু এই হিমশীতল নীরবতা ভেঙে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ৫৬ হাজার জনসংখ্যার দ্বীপটি। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তাঁর ‘গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন’।

তবে নিউইয়র্ক ও মস্কোর ঠিক মাঝামাঝি অবস্থিত এই দ্বীপের নেপথ্যের গল্প কেবল ভূরাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পর্যটকদের জন্য এক স্বপ্নীল গন্তব্য।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছানো ছিল এক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রা। কোপেনহেগেন বা আইসল্যান্ড হয়ে ঘুরপথে যেতে হতো সেখানে। তবে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ রাজধানী নুউকে একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হওয়ার পর যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস নিউইয়র্ক থেকে নুউকে সরাসরি ফ্লাইট চালু করেছে। আগামী এপ্রিল মাসে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের ক্যাকোরতক এবং অক্টোবরে পর্যটকদের প্রধান কেন্দ্র ইলুলিসাটে আরও দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ইলুলিসাট মূলত একটি মাছ ধরার বন্দর। এখানকার ডার্ক রক বে বা অন্ধকারাচ্ছন্ন পাথুরে উপসাগরে বসে আপনি পান করতে পারেন ১ লাখ বছরের পুরোনো বরফ গলে তৈরি করা ক্রাফট বিয়ার। তবে এখানকার আসল আকর্ষণ হলো ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত ‘আইসফজর্ড’। বিশাল বিশাল হিমশৈল যখন গ্রিনল্যান্ডের বরফখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিসকো বে-তে ভুতুড়ে জাহাজের মতো ভাসতে থাকে, সেই দৃশ্য পর্যটকদের বিস্ময় জাগায়। অনেক হিমশৈল আয়তনে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন শহরের আকাশচুম্বী ভবনকেও ছাড়িয়ে যায়।

ডিসকো উপসাগরে একটি হ্যাম্পব্যাক তিমি ডুব দিচ্ছে। ছবি: শাটারস্টোকের সৌজন্যে
ডিসকো উপসাগরে একটি হ্যাম্পব্যাক তিমি ডুব দিচ্ছে। ছবি: শাটারস্টোকের সৌজন্যে

জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে হ্যাম্পব্যাক, ফিন ও মিনকে তিমির দেখা মেলে। ছোট নৌকায় করে পর্যটকেরা সমুদ্রের এই দানবদের খুব কাছ থেকে দেখতে পারেন। এ ছাড়া উত্তর-পূর্ব গ্রিনল্যান্ড ন্যাশনাল পার্কে টুন্ড্রা অঞ্চলে দেখা যায় মেরু ভালুক, কস্তুরী ষাঁড়, আর্কটিক শেয়াল ও সিন্ধুঘোটক।

গ্রিনল্যান্ডে পর্যটকেরা যেসব বন্য প্রাণীর মুখোমুখি হতে পারেন, তাদের মধ্যে কস্তুরী ষাঁড়ও রয়েছে। ছবি: শাটারস্টোকের সৌজন্যে
গ্রিনল্যান্ডে পর্যটকেরা যেসব বন্য প্রাণীর মুখোমুখি হতে পারেন, তাদের মধ্যে কস্তুরী ষাঁড়ও রয়েছে। ছবি: শাটারস্টোকের সৌজন্যে

গ্রিনল্যান্ডের ৮০ শতাংশ এলাকা পুরু বরফে ঢাকা থাকায় এখানকার আদিবাসী ইনুইটরা মূলত উপকূলীয় এলাকায় ছোট ছোট রঙিন বাড়িতে বাস করেন। তাঁদের জীবনধারা গড়ে উঠেছে সিল মাছ ও তিমি শিকারকে কেন্দ্র করে। পর্যটকদের জন্য এখানকার বিশেষ খাবারের তালিকায় থাকে ‘মাতাক’—যা মূলত তিমির চামড়া ও চর্বি দিয়ে তৈরি। এ ছাড়া নারহাল, মেরু ভালুক ও বলগা হরিণের মাংসও এখানকার ঐতিহ্যবাহী মেনুর অংশ।

২০২৪ সালের এপ্রিলে তোলা গ্রিনল্যান্ডের ইত্তোক্কোরতোরমিট গ্রামের একটি ছবি। ছবি: এএফপি
২০২৪ সালের এপ্রিলে তোলা গ্রিনল্যান্ডের ইত্তোক্কোরতোরমিট গ্রামের একটি ছবি। ছবি: এএফপি

ইলুলিসাট থেকে আরও ৫০০ মাইল উত্তরে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ডের সংস্কৃতির দিক থেকে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ‘ইত্তোক্কোরতোরমিট’ গ্রাম। তবে গ্রামটির নাম উচ্চারণ করতেই সময় লাগে, হেঁটে ঘুরে দেখতে সময় লাগে কম। এখানকার মাত্র ৩৪৫ জন বাসিন্দা বছরের ৯ মাসই বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। তাঁরা এখনো প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে মাটির নিচে মাংস গেঁজিয়ে সংরক্ষণ করেন।

গ্রিনল্যান্ডে শীতকালে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হলো তুষারযান বা স্নোমোবাইল। তবে ইনুইটরা এখনো ঐতিহ্যবাহী স্লেজ কুকুর পালন করেন। পর্যটকেরা হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় কুকুরচালিত স্লেজে চড়ে বরফের রাজ্যে ঘুরে বেড়াতে পারেন। অভিজ্ঞ গাইডের কাছে শিখতে পারেন কীভাবে ‘ইগলু’ বা বরফের ঘর তৈরি করতে হয়।

গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ‘নর্দান লাইটস’ বা অরোরা বোরিয়ালিস।
গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ‘নর্দান লাইটস’ বা অরোরা বোরিয়ালিস।

তবে গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ‘নর্দান লাইটস’ বা অরোরা বোরিয়ালিস। কোনো শহুরে আলোকদূষণ না থাকায় গ্রিনল্যান্ডের স্বচ্ছ আকাশে সবুজ ও বেগুনি আলোর অসাধারণ নাচ দেখা যায়, যা সারা বিশ্বের ফটোগ্রাফারদের আকৃষ্ট করে।

কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ভ্রমণের স্বপ্ন রঙিন হলেও এর খরচ বেশ চড়া। এখানকার স্থানীয় দোকানে একটি সাধারণ লেটুস পাতার দাম ১০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে সমুদ্রপথে মাল্টি-ডে কোস্টাল ফেরি ‘সারফাক ইত্তুক’ ব্যবহার করে কিছুটা সাশ্রয়ে ভ্রমণ করা সম্ভব। এতে ইনুইটদের যাপিত জীবনের একদম কাছে পৌঁছানো যায়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনীতির টানাপোড়েনে গ্রিনল্যান্ডের বরফ হয়তো গলছে, কিন্তু পৃথিবীর অন্যতম এই বুনো ও অকৃত্রিম গন্তব্যটি এখনো পর্যটকদের কাছে তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক নজর গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিলেও এর প্রকৃত রহস্য লুকিয়ে আছে এর হিমশীতল নির্জনতা আর প্রাচীন ইনুইট সংস্কৃতির গভীরে।

সিএনএন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানে ভর করে আইএমএফের ঋণ থেকে মুক্তি চায় পাকিস্তান

ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত যদি বদলাতে হয় তখন, বিসিবিকে তামিমের প্রশ্ন

‘ভারতের বাইরে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেললে সেটা ক্রিকেটের জন্য বাজে দেখাবে’

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ৬২ বছর বয়সে গর্ভধারণ, ভাইরাল নারী

ঋণখেলাপিতে আটকে যেতে পারেন কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত