Ajker Patrika

শৈশবের একাকিত্ব বার্ধক্যে স্মৃতি চুরির একটি কারণ

ফিচার ডেস্ক
শৈশবের একাকিত্ব বার্ধক্যে স্মৃতি চুরির একটি কারণ
পাড়া বা অ্যাপার্টমেন্টে শিশুদের খেলার মাঠ এবং একে অপরের সঙ্গে মেলামেশার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ছবি: পেক্সেলস

‘একলা আকাশ, একলা মাটি। এমন কথাগুলো কবিতার চরণে একাকিত্ব শুনতে রোমান্টিক মনে হয়। তবে শৈশবের নিঃসঙ্গতা আমাদের মস্তিষ্কের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি বিষ। আমরা অনেকেই মনে করি, বড় হলে ছোটবেলার কষ্টগুলো মুছে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। শৈশবের সেই বন্ধুহীন দিনগুলো বৃদ্ধ বয়সে আপনার স্মৃতিশক্তি কেড়ে নেওয়ার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল মেডিকেল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সম্প্রতি সাত বছর ধরে ১৩,৫৯২ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর একটি গবেষণা চালিয়েছে। গবেষণার ফলাফল বলছে, শৈশবের একাকিত্ব কেবল সাময়িক মন খারাপের বিষয় নয়। এটি বার্ধক্যে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগের ঝুঁকি প্রায় ৪১ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

একাকিত্ব বনাম ডিমেনশিয়া

গবেষকেরা ১৭ বছর বয়সের আগের সময়টাকে ‘শৈশব’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। যারা ছোটবেলায় দীর্ঘ সময় বন্ধুহীন ছিলেন বা তীব্র নিঃসঙ্গতায় ভুগেছেন, তাদের ক্ষেত্রে কিছু বৈশিষ্ট্য তারা লক্ষ করেছেন।

স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি ৪১ শতাংশ বেশি: যারা শৈশবে একাকী ছিলেন, মধ্যবয়স পার করার পর তাঁদের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ৪১ শতাংশ বেশি।

মস্তিষ্কের দ্রুত ক্ষয়: সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বা ‘কগনিটিভ ফাংশন’ অনেক দ্রুত কমতে শুরু করে। ভাষা, যুক্তি এবং নতুন কিছু মনে রাখার ক্ষমতা তাঁরা সময়ের আগেই হারিয়ে ফেলেন।

বয়সের ওপর প্রভাব: এই গবেষণার গড় বয়স ছিল ৫৮ বছর। দেখা গেছে, বড় হওয়ার পর একাকিত্ব দূর হলেও শৈশবের সেই নিঃসঙ্গতার প্রভাব মস্তিষ্কের কোষে গভীরভাবে থেকে যায়।

কেন এমন হয়

মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শৈশব। এ সময় নিঃসঙ্গতা একধরনের মানসিক চাপ বা ‘সাইকো-সোশ্যাল স্ট্রেস’ সৃষ্টি করে। গবেষকদের মতে, এটি মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনের কারণে হতে পারে, যা পরবর্তী জীবনে আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগকে ত্বরান্বিত করে। বড়বেলার একাকিত্ব এই ঝুঁকিকে ১৭ শতাংশ বাড়িয়ে দিলেও, শৈশবের প্রভাবটি এখানে একদম স্বাধীনভাবে কাজ করে।

মস্তিস্কের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় শৈশব। এই সময় নিঃসঙ্গতা এক ধরণের মানসিক চাপ বা ‘সাইকো-সোশ্যাল স্ট্রেস’ তৈরি করে। ছবি: পেক্সেলস
মস্তিস্কের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় শৈশব। এই সময় নিঃসঙ্গতা এক ধরণের মানসিক চাপ বা ‘সাইকো-সোশ্যাল স্ট্রেস’ তৈরি করে। ছবি: পেক্সেলস

পার্থক্য যেখানে

বয়স বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কাজ করার গতি কমে বা আমরা মাঝেমধ্যে টুকটাক জিনিস ভুলে যাই। একে বলা হয় ‘এজ-রিলেটেড ডিক্লাইন’। এটি কোনো রোগ নয়। কিন্তু ডিমেনশিয়া একটি রোগ। এখানে মস্তিষ্কের কোষ দ্রুত মারা যেতে থাকে। হিপোক্যাম্পাস (স্মৃতির আধার) সংকুচিত হয়ে যায় এবং মানুষ তার নিজের নাম বা কাছের মানুষকেও চিনতে পারে না। গবেষণার ভয়ংকর দিকটি হলো, শৈশবের একাকিত্ব এই স্বাভাবিক বার্ধক্যকে দ্রুত রোগের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

আমাদের করণীয়

গবেষণাটি আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর দিকে এক বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় আমাদের এখনই যা ভাবা প্রয়োজন:

প্রাথমিক হস্তক্ষেপ: শিশু যদি একা থাকে বা স্কুলে বন্ধু না পায়, তবে সেটিকে ‘শান্ত ছেলে বা মেয়ে’ ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। তার সঙ্গে কথা বলুন এবং মেশার সুযোগ করে দিন।

সামাজিক পরিবেশ: পাড়া বা অ্যাপার্টমেন্টে শিশুদের খেলার মাঠ এবং একে অপরের সঙ্গে মেলামেশার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব: কিশোর-কিশোরীরা যদি মন খারাপ বা নিঃসঙ্গতার কথা বলে, তবে তাকে গুরুত্ব দিন। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।

ডিমেনশিয়ার কোনো নিশ্চিত নিরাময় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আজকের একটি নিঃসঙ্গ শিশু হয়তো আগামী দিনের এক স্মৃতিভ্রংশ রোগী—এই শঙ্কা দূর করতে আমাদের শিশুদের শৈশবকে আনন্দময় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলা আজ সময়ের দাবি।

সূত্র: জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেন, ডেইলি মেইল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত