
মাথা ঢাকার রীতি পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এতটাই পুরোনো যে এর ইতিহাস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় খ্রিষ্টপূর্ব যুগে। আজকের দিনে মাথার ওড়না, স্কার্ফ, ঘোমটা কিংবা টুপিকে আমরা কখনো ধর্মীয় অনুশীলন, কখনো ফ্যাশন, আবার কখনো ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অংশ হিসেবে দেখি। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এসব আবরণের অর্থ ছিল আরও বিস্তৃত। কোথাও তা সামাজিক মর্যাদার চিহ্ন, কোথাও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ, আবার কোথাও নারীর বৈবাহিক বা সামাজিক অবস্থান বোঝানোর মাধ্যম। এমনকি রোদ, বাতাস ও ধুলা থেকে সুরক্ষার মতো একেবারে ব্যবহারিক প্রয়োজনেও মাথা ঢাকার প্রচলন হয়েছে।
নারীর মাথা ঢাকার প্রাচীন নথিবদ্ধ উদাহরণগুলোর একটি পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব তেরো শতকে, অ্যাসিরিয়ায়। সে সময় অভিজাত নারীরা মাথা ঢাকার মাধ্যমে নিজেদের সামাজিক অবস্থান আলাদা করে দেখাতেন। অর্থাৎ মাথার আবরণ তখন নিছক পোশাকের অংশ ছিল না; বরং কে সমাজের কোন স্তরে অবস্থান করছেন, সেটিও প্রকাশ করত। পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে এই ধারণা নানা রূপে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও তা শ্রেণির পরিচয় ধরে রাখে, কোথাও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়, আবার কোথাও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

ইহুদি ও খ্রিষ্টান ঐতিহ্যেও মাথা ঢাকার ধারণার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টধর্মীয় শিল্পকর্মে যিশুর মা মেরিকে প্রায়ই মাথা ঢাকা অবস্থায় দেখা যায়। একসময় গির্জায় যাওয়া নারীদের মধ্যে মাথা ঢাকার রীতি বেশ সাধারণ ছিল। যদিও আধুনিক সময়ে এর ব্যবহার অনেক কমেছে, কিছু ঐতিহ্যনিষ্ঠ গির্জায় এখনো এই প্রথা দেখা যায়। পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ঐতিহ্যেও বিশেষ ধরনের মাথার আবরণ রয়েছে। সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের পোশাকে ‘এপানোকামেলভকিওন’ নামের একটি বিশেষ মাথার আবরণ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার রোমান ক্যাথলিক গির্জার কিছু সন্ন্যাসিনী এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পোশাকেও ভেইল বা আবরণ গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়েছে।
ইসলামি সংস্কৃতিতেও নারীদের বিভিন্ন ধরনের মাথার আবরণ দেখা যায়। মুসলিম নারীদের নানা ধরনের হেড স্কার্ফ ও আবরণ ইসলামের শালীন পোশাকের নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব পোশাকের অনেকগুলো চুল, কান ও গলা ঢেকে রাখে, তবে মুখ খোলা থাকে। আবার নিকাব ও বোরকার মতো কিছু আবরণ মুখের বড় অংশও ঢেকে রাখে। আফগান বোরকা পুরো শরীর আবৃত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানে একই ধরনের মাথা ঢাকার ধারণার মধ্যেও অঞ্চল, সংস্কৃতি ও পোশাকের ধরন অনুযায়ী পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামিস সম্প্রদায়ের নারীদের মধ্যেও মাথা ঢাকার একটি নির্দিষ্ট ঐতিহ্য রয়েছে। মেয়েরা ও নারীরা নিয়মিত প্রেয়ার কভারিং ব্যবহার করেন। ঘরের কাজ বা দৈনন্দিন কাজের সময় মূল আবরণটি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তার পরিবর্তে কেরচিফ ব্যবহার করা হয়। তাদের পোশাকে বৈবাহিক অবস্থারও একটি দৃশ্যমান ইঙ্গিত থাকে। অবিবাহিত মেয়েরা গির্জায় গেলে মাথায় কালো রঙের আবরণ পরেন, আর বিবাহিত নারীরা সাধারণত সাদা আবরণ ব্যবহার করেন। অর্থাৎ এখানে মাথার আবরণ একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুশীলন ও সামাজিক পরিচয়ের সংকেত।
স্পেনের ম্যান্টিলা মাথা ঢাকার ঐতিহ্যের অন্যতম নান্দনিক উদাহরণ। হালকা ও অলংকারময় এই আবরণ উষ্ণ অঞ্চলে ধর্মীয় আবরণ হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এটি ধর্মীয় ব্যবহারের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্পেনের রাজদরবার ও অভিজাত সমাজের ফ্যাশনেও প্রভাব ফেলেছিল। আজও বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বিয়ে এবং কিছু ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে ম্যান্টিলার ব্যবহার দেখা যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার পোশাক সংস্কৃতিতেও মাথা ঢাকার ঐতিহ্য বেশ পরিচিত। শাড়ির আঁচল বা পল্লু শুধু পোশাকের সৌন্দর্য বাড়ানোর অংশ নয়; ঐতিহ্যগতভাবে অনেক বিবাহিত হিন্দু নারী সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এটি মাথার ওপর টেনে নিতেন। আবার কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষ উভয়েরই মাথা আবৃত রাখার রীতি রয়েছে। ফলে একই শাড়ির একটি অংশ কখনো হয়ে উঠেছে শালীনতার প্রতীক, কখনো ধর্মীয় আচারের অংশ, আবার কখনো সামাজিক রীতির প্রকাশ।
মাথার আবরণ শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশ্বের বিভিন্ন রাজপরিবারেও এটি দীর্ঘদিন ধরে মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের প্রকাশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যদের আনুষ্ঠানিক পোশাকে টুপি ও অন্যান্য মাথার আবরণের ব্যবহার তার একটি পরিচিত উদাহরণ। একইভাবে ইরানের সম্রাজ্ঞী ফারাহ পাহলভি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি জ্যাকি কেনেডির মতো ব্যক্তিত্বের পোশাকেও বিভিন্ন ধরনের মাথার আবরণ ফ্যাশন ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
জীবনের আনন্দের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শোকের সময়ও মাথা ঢাকার বিশেষ রীতি ছিল। বহু সমাজে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা শোকের সময়ে নারীরা বিশেষ ধরনের মাথার আবরণ ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট কাপড় বা পোশাক কখনো আনন্দের অনুষ্ঠানের সাজ, আবার কখনো শোক প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের ইতিহাসে স্নুড ছিল লম্বা চুলের ওপর পরা একধরনের জালের মতো মাথার আবরণ। মধ্যযুগে এর ব্যবহার দেখা যায় এবং স্কটল্যান্ড ও উত্তর ইংল্যান্ডের কিছু অঞ্চলেও এটি প্রচলিত ছিল। উনিশ বা বিশ শতকের শুরুর দিকে কিছু সমাজে অবিবাহিত নারীদের সামাজিক অবস্থান বোঝাতেও স্নুডের ব্যবহার করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে আবার স্নুডের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়। পোশাক তৈরির কাপড়ের ওপর রেশনিং থাকায় মাথার আবরণ তৈরিতে কম উপকরণ লাগত—এমন ব্যবহারিক কারণও এর জনপ্রিয়তার পেছনে ভূমিকা রাখে।
বিয়ের সঙ্গে মাথার আবরণের সম্পর্ক বহু সংস্কৃতিতে দেখা যায়। পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যবাহী কনের পোশাকে ব্রাইডাল ভেইল দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। আবার জাপানের শিন্তো বিয়েতেও কনের ঐতিহ্যবাহী মাথার আবরণ দেখা যায়। সংস্কৃতি বদলালেও বিয়ের পোশাকে মাথার আবরণ ব্যবহারের এই প্রবণতা দেখায়, বিশেষ দিনকে আলাদা করে তোলার ক্ষেত্রে পোশাক ও অলংকারের পাশাপাশি মাথার সাজও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান অ্যান্ড মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ

কখনো কি খেয়াল করেছেন, আপাতদৃষ্টে জীবনে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে আপনার ভেতরে অদ্ভুত একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। মনে হয় যেন হাজার মানুষের ভিড়ে থেকেও আপনি নিঃসঙ্গ, জীবনে অসংখ্য অর্জন থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্জনই আসলে যথেষ্ট মনে হয় না! কী একটা যেন নেই। সত্যজিৎ রায়ের ভাষায়, এমন কিছু একটা নেই, যেটা...
৫ ঘণ্টা আগে
দুর্গাপূজার আনন্দ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। পূজার আনন্দ নতুন পোশাক ছাড়া একেবারেই অসম্পূর্ণ। ষষ্ঠী থেকে দশমী—প্রতিটি দিনের জন্য নিখুঁত এবং আরামদায়ক পোশাক বেছে নিতে কেনাকাটার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। পূজার পোশাক কেনার সময় কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখলে পূজায় স্টাইলিশ লুকে ঘুরে বেড়ানোর...
৭ ঘণ্টা আগে
মেদ ঝরিয়ে সুস্থ ও সুস্থির জীবন পেতে অনেকেই নিয়মিত শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের ওপর জোর দেন। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে ব্যায়ামের ভূমিকা থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনিক ক্যালরির হিসাব।
৮ ঘণ্টা আগে
আমরা অনেকে ভাবি, ওজন না কমার পেছনে শুধু খাদ্যাভ্যাস বা অলসতাই দায়ী। কিন্তু জানেন তো, এ ক্ষেত্রে আসল খেলাটি খেলে আমাদের মস্তিষ্ক? কঠোর ডায়েট বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি শুরু করলে মস্তিষ্ক এটিকে অস্তিত্বের সংকট বা বেঁচে থাকার হুমকি হিসেবে ধরে নেয়। আর তখনই সে আপনার ওজন কমানোর চেষ্টা নিজেই থামিয়ে দেয়। মূলত...
৯ ঘণ্টা আগে