Ajker Patrika

অনলাইন আসক্তি থেকে অফলাইনে অশান্তি, জানুন স্ক্রিন টাইম কমানোর ৫ উপায়

ফিচার ডেস্ক
অনলাইন আসক্তি থেকে অফলাইনে অশান্তি, জানুন স্ক্রিন টাইম কমানোর ৫ উপায়
অনলাইন জগতে অতিরিক্ত সময় দেওয়া শুধু সময়ের অপচয় নয়, এটি ধীরে ধীরে আমাদের মানসিক চাপ বাড়ায়, মেজাজ খিটখিটে করে এবং জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ কেড়ে নেয়। ছবি: পেক্সেলস

হাতের মুঠোয় থাকা ৫ থেকে ৬ ইঞ্চির কাচের পর্দাটি এখন আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি অবচেতন মনের এক অদ্ভুত আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। কোনো কাজ শুরু করার আগে, সামান্য একটু ক্লান্তি এলে কিংবা কোনো জটিল ভাবনায় আটকে গেলেই হাতটা আপনাআপনি পকেটে চলে যায়। আঙুলগুলো স্ক্রিনের ওপর চঞ্চল হয়ে ওঠে। কিন্তু ক্ষণিক স্বস্তির এই অভ্যাসই যে ভেতরে-ভেতরে আমাদের শান্ত থাকার সক্ষমতা আর জীবনের স্বাভাবিক রস হারিয়ে দিচ্ছে, তা আমরা টের পাই অনেক পরে। জরুরি কাজ ফেলে রাখা, অহেতুক মেজাজ খিটখিটে হওয়া কিংবা চারপাশে মানুষ থাকা সত্ত্বেও ভেতরে একধরনের শূন্যতা অনুভব করা। এসব ডিজিটাল চক্রের খুব পরিচিত পরিণতি। এটি শুধু সময়ের অপচয় নয়, বরং মস্তিষ্কের ওপর একধরনের নীরব মনস্তাত্ত্বিক চাপ। অনলাইন জগতে অতিরিক্ত সময় দেওয়া শুধু সময়ের অপচয় নয়, এটি ধীরে ধীরে আমাদের মানসিক চাপ বাড়ায়, মেজাজ খিটখিটে করে এবং জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ কেড়ে নেয়।

গবেষণায় যা উঠে এসেছে

গত বছর জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব ডুইসবার্গ-এসেনের একদল গবেষক ৯০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর একটি নিবিড় গবেষণা চালান। গবেষণায় উঠে আসে, যাঁরা পর্নোগ্রাফি, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেমিং বা শপিংয়ের মতো কাজে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় সময় কাটান, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে মানসিক চাপ এবং বিষণ্নতার হার সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি। অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে তাঁরা সামাজিক সম্পর্ক, পড়াশোনা ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দায়িত্বগুলো অবহেলা করতে শুরু করেন। গবেষণার প্রধান লেখক আন্দ্রেয়াস ওলকার জানান, শুধু দৈনন্দিন মানসিক চাপ বা খারাপ মেজাজ মানুষকে ইন্টারনেটে টানে না; বরং অনলাইনে ঢোকার তীব্র মানসিক অনুভূতিটাই মূলত প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। আরেক সহ-লেখক ড. সিলকে এম. মুলার স্পষ্ট করেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের নির্দিষ্ট কোনো মুহূর্তে মনের মধ্যে যে আকস্মিক প্ররোচনা তৈরি হয়, তা চিহ্নিত করাই হলো এই সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি।

অনলাইনের প্রভাব অফলাইনে

অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটানোর প্রভাব শরীরের পাশাপাশি মনেও গভীর দাগ ফেলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকায় শরীরের কায়িক পরিশ্রম বন্ধ হয়ে যায়, যা মানসিক প্রফুল্লতা কমানোর অন্যতম বড় কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাজানো ও ফিল্টার করা জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে গিয়ে বহু মানুষ মানসিক হতাশায় ভোগেন। গভীর রাতে স্ক্রিনের নীল আলো এবং ডিজিটাল উদ্দীপনা ঘুম নষ্ট করে। এর ফলে মনোযোগের অভাব ঘটে এবং পরের দিন কাজের দক্ষতা কমে যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাজানো ও ফিল্টার করা জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে গিয়ে বহু মানুষ মানসিক হতাশায় ভোগেন। ছবি: পেক্সেলস
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাজানো ও ফিল্টার করা জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে গিয়ে বহু মানুষ মানসিক হতাশায় ভোগেন। ছবি: পেক্সেলস

অনলাইন থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন যেভাবে

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পারিন কামদার বলেন, অনলাইনে যাওয়ার এই তীব্র ঝোঁক অনেক সময় মানুষের অবচেতন মনে অভ্যাসগতভাবে কাজ করে। তাই সচেতনভাবে এই অভ্যাস ভাঙতে কিছু বাস্তবসম্মত কৌশল মেনে চলা যেতে পারে।

পাঁচ মিনিটের বিলম্ব নীতি: স্ক্রিনে ঢোকার তীব্র ইচ্ছা জাগলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন না ধরে অন্তত পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন। এই সময়ে একটু হাঁটাহাঁটি করুন, গান শুনুন বা দীর্ঘ শ্বাস নিন। ধীরে ধীরে এই অপেক্ষার সময় ১০ বা ১৫ মিনিটে নিয়ে যান।

নির্দিষ্ট স্ক্রিন-ফ্রি সময় নির্ধারণ: দিনে অন্তত নির্দিষ্ট কিছু সময় ফোন পুরোপুরি দূরে রাখুন। যেমন খাবারের টেবিলে বা ছুটির দিনের কিছুটা সময়। এই সময় পরিবারের সঙ্গে সমসাময়িক বিষয়ে আড্ডা দিন বা বোর্ড গেম খেলুন।

নোটিফিকেশনের লাগাম টানা: অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখুন। ফোনের টুংটাং শব্দ আমাদের মনোযোগ বারবার পিছিয়ে দেয় এবং অহেতুক কৌতূহল বাড়ায়।

শোয়ার ঘরে ফোনের দূরত্ব বজায় রাখা: ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে ডিজিটাল ডিভাইসের মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারেকটিভ ব্যবহার বন্ধ করুন। শোয়ার ঘরে ফোন বিছানা থেকে দু-তিন মিটার দূরে রাখুন, যাতে হাত বাড়ালেই না পাওয়া যায়।

পর্দার আকর্ষণ কমানো: ফোনের ডিসপ্লে ‘গ্রেস্কেল’ বা সাদা-কালো করে দিতে পারেন। অ্যাপগুলোর আকর্ষণীয় ও রঙিন মেকআপ উঠে গেলে সেগুলো ব্যবহারের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক আগ্রহ অনেকটাই কমে আসে।

ইন্টারনেট নিঃসন্দেহে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক দরকারি প্রযুক্তি। তবে এটি যেন জীবনের মূল চালিকাশক্তি না হয়ে ওঠে। প্রযুক্তিকে সঠিক সীমানায় রেখে ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ করুন। বাস্তব জগতে সময় দিন, প্রকৃতির সান্নিধ্যে যান এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ বাড়ান। এতেই মিলবে প্রকৃত মানসিক শান্তি ও টেকসই সুস্থতা।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত