দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সেবাদানকারী পরিবারের সদস্যরা যেভাবে নিজেদের যত্ন নেবেন

প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থায় যে রোগ কোনো দিন ভালো হবে না এবং মানুষটি ধীরে ধীরে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে, সেই মানুষের রোগমুক্তি নয় বরং ভোগান্তি কমানোর বিজ্ঞানসম্মত উপাত্তনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থা হলো প্যালিয়েটিভ কেয়ার। এই উদ্যোগ নিরাময় অযোগ্য রোগী এবং তার পরিবারের জীবনের গুণগত মান বাড়ায়। প্রাথমিক পর্যায়ে জীবন সীমিতকারী রোগ শনাক্তকরণ, তা প্রতিরোধ ও ভোগান্তি কমানো এবং নিখুঁত বিশ্লেষণসহ ব্যথা ও অন্যান্য শারীরিক মনোসামাজিক এবং আত্মিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। এসব সেবা রোগ ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় এবং রোগীকে এই রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হোক বা না হোক, প্যালিয়েটিভ সেবা চলতে থাকে। আমাদের দেশে এই প্যালিয়েটিভ কেয়ারের দায়িত্বের অনেকটাই কিন্তু রোগীর পরিবার পালন করেন।
প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ক্ষেত্রে পরিবার রোগীর জন্য যা যা করে থাকেন
ব্যথা ও অন্যান্য পীড়াদায়ক লক্ষণ থেকে মুক্তি দেওয়া।
রোগীর মানসিক ও আত্মিক যত্নের সমন্বয় সাধন করা।
রোগীকে আমৃত্যু যথাসম্ভব সচল রাখতে সাহায্য করা।
রোগীকে অসুস্থতা ও শোক কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা।
প্যালিয়েটিভ কেয়ার দেওয়া যে কারণে চ্যালেঞ্জিং
প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা উপশমকারী সেবা দেওয়া মানসিকভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। এই সেবার সঙ্গে যুক্ত পরিবারের সদস্যরা, চিকিৎসক, নার্স, কাউন্সিলর এবং স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিনিয়ত গুরুতর অসুস্থ রোগীর দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হন। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যরা রোগীর যত্ন নিতে গিয়ে অনেক সময়ই তাঁরা নিজেদের স্বাস্থ্যের কথা ভুলে যান। কিন্তু মনে রাখা জরুরি, নিজে সুস্থ না থাকলে অন্যকে সঠিক সেবা দেওয়া অসম্ভব।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রদানকারীরা যেভাবে নিজেদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারেন
আবেগের স্বীকৃতি দেওয়া এবং মানসিক চাপ প্রকাশ করা
রোগীদের মৃত্যু ও কষ্ট দেখতে দেখতে সেবাদানকারীদের মনে একধরনের আবেগীয় ক্লান্তি বা বার্নআউট তৈরি হতে পারে। নিজের এই দুঃখ বা আবেগকে চেপে না রেখে তা স্বীকার করা প্রথম ধাপ। নির্ভরযোগ্য কোনো বন্ধুর সঙ্গে নিজের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং সুস্থ থাকার একটি কার্যকর উপায়।
পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে স্পষ্ট সীমানা টানা
কাজের সময় শতভাগ মনোযোগ দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি কাজ শেষে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে আসা সমান গুরুত্বপূর্ণ। দিন শেষে রোগীদের চিন্তা মাথায় ধরে রাখলে দীর্ঘ মেয়াদে তা মানসিক অবসাদের কারণ হয়। তাই কাজ এবং ব্যক্তিগত সময়ের মধ্যে একটি সুস্থ সীমানা বজায় রাখতে হবে।
শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া
মানসিক সুস্থতার সঙ্গে শারীরিক সুস্থতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা শরীরকে চাঙা রাখে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং দীর্ঘ সময় একনাগাড়ে কাজ না করে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

দলগত আলোচনা বা ডিব্রিফিং সেশন
প্যালিয়েটিভ কেয়ার যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁরা সবাই মিলে তাঁদের কঠিন কেসগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন এবং নিজেদের মানসিক চাপ হালকা করতে পারেন। পারস্পরিক সমর্থন এই পেশায় টিকে থাকার বড় শক্তি।
নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া
কাজের বাইরে এমন কিছু করা উচিত, যা মনে আনন্দ দেয়। বই পড়া, গান শোনা, বাগান করা, কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক ক্লান্তি দূর করতে চমৎকার কাজ করে। এই নিজের জন্য রাখা সময়টুকু মনকে নতুন করে শক্তি জোগায়।
নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া
সব রোগীকে সুস্থ করা বা সবার কষ্ট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়—এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া জরুরি। একজন সেবাদানকারী হিসেবে আপনি আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন, এই ভাবনাটুকুই আপনাকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত রাখবে।
মনে রাখতে হবে, প্যালিয়েটিভ কেয়ার দেওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা। এই যাত্রায় নিজেকে সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখতে নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি আপনার দায়িত্বেরই একটি অংশ।
লেখক: সদস্যসচিব, প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশ










