চল্লিশেও সতেজ লেডি গাগা: জেনে নিন ত্বক, সাজসজ্জা ও চুলের যত্নে তাঁর পছন্দ

পপসংগীতের জগতে লেডি গাগা শুধু একজন গায়িকা নন; তিনি একই সঙ্গে গীতিকার, অভিনেত্রী, মঞ্চশিল্পী ও ফ্যাশন আইকন। ২০০৮ সালে ‘দ্য ফেম’ অ্যালবামের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়ার পর ‘দ্য ফেম মনস্টার’, ‘বর্ন দিস ওয়ে’, ‘আর্টপপ’, ‘জোয়ান’, ‘ক্রোমাটিকা’ থেকে শুরু করে ‘মেহেম’—একেকটি গানের অ্যালবামের মাধ্যমে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। ‘পোকার ফেস’, ‘ব্যাড রোমান্স’, ‘বর্ন দিস ওয়ে’, ‘শ্যালো’ ও ‘রেইন অন মি’র মতো গান তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা।
সংগীত ও অভিনয়ে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে গাগার ঝুলিতে রয়েছে একাধিক গ্র্যামি, অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা পুরস্কার। শিল্পীজীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কাজেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় তিনি। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বর্ন দিস ওয়ে ফাউন্ডেশন’; যা তরুণদের মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা, সহমর্মিতা ও নিপীড়ন প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করে। এইডস সচেতনতা, দুর্যোগকবলিত মানুষের সহায়তা এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিয়েছেন তিনি।

এত কিছুর পরেও গাগা চল্লিশ বছর বয়সে তরতাজা আছেন কীভাবে? জানা যায়, মঞ্চের ঝলমলে আলো, বিচিত্র পোশাক আর সাহসী সাজসজ্জার আড়ালে লেডি গাগার সৌন্দর্যচর্চার জগৎটিও বেশ বৈচিত্র্যময়। কখনো নাটকীয় সাজ, কখনো একেবারে স্বাভাবিক চেহারা—প্রতিবারই যেন নতুন এক গাগাকে আবিষ্কার করেন তাঁর ভক্তরা। ত্বকের পরিচর্যা থেকে শুরু করে সাজসজ্জা ও চুলের যত্ন—সব ক্ষেত্রে রয়েছে তাঁর কিছু নির্দিষ্ট পছন্দ।
সকালে ত্বকের যত্ন

দিনের শুরুতে ত্বক পরিষ্কার করে নেন গাগা। এরপর তিনি ব্যবহার করেন টোনার ও ত্বকের জন্য উপকারী সেরাম। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে ময়শ্চারাইজার এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বক রক্ষায় সানস্ক্রিনও তাঁর পরিচর্যার অংশ।
প্রয়োজন অনুযায়ী ত্বকের ছোটখাটো দাগ বা অসম রং ঢাকতে ব্যবহার করেন কনসিলার। ঠোঁটে আর্দ্রতা ও উজ্জ্বলতা আনতে লিপ অয়েলও পছন্দ করেন তিনি।
তাঁর মেকআপ আর্টিস্ট সারাহ ট্যানোর মতে, গাগার ত্বকের সৌন্দর্যের পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যারও ভূমিকা রয়েছে। গাগার পছন্দের পরিচর্যা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ওলে হেনরিকসেন ট্রুথ সেরাম। এতে রয়েছে ভিটামিন সি। ত্বকে উজ্জ্বলতা আনতে তিনি ব্যবহার করেন ভিন্টনার্স ডটার অ্যাকটিভ বোটানিক্যাল সেরাম।
ময়শ্চারাইজারের ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দ এমব্রিয়োলিস লে-ক্রেম কনসেনত্রে। এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার পাশাপাশি সাজসজ্জার আগে প্রাথমিক স্তর হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
রাতে ত্বকের বিশ্রাম
সারা দিনের ব্যস্ততা ও মঞ্চসজ্জার পর ত্বক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে রাতের পরিচর্যাকে গুরুত্ব দেন গাগা। দিন শেষে মুখের মেকআপ ভালোভাবে পরিষ্কার করার পর তিনি বিভিন্ন ধরনের ফেস মাস্ক ব্যবহার করেন।
তাঁর পছন্দের পরিচর্যার পণ্যের মধ্যে রয়েছে টালিকা বায়ো এনজাইমস এবং ১১১ স্কিন ক্রায়ো ডি-পাফিং ফেশিয়াল মাস্ক। এসবের পাশাপাশি মুখের ত্বকে হালকা মালিশও তাঁর রুটিনের অংশ। এতে ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়ানো এবং মুখের পেশিকে শিথিল রাখতে সহায়তা করতে পারে।
সাজসজ্জায় যত বৈচিত্র্য
লেডি গাগার সাজসজ্জা মানেই নতুন চমক। মঞ্চসজ্জা ও কনসার্টে উপস্থিতির ক্ষেত্রে প্রচলিত সৌন্দর্যধারণা বারবার ভেঙেছেন তিনি।
২০১৯ সালের মেট গালায় বিশাল আকৃতির কৃত্রিম চোখের পাপড়ি যেমন তাঁর নাটকীয় উপস্থিতিকে আরও চোখে পড়ার মতো করে তুলেছিল। তেমনি ২০২০ সালের ভিএমএ অনুষ্ঠানে বেগুনি ঝলমলে চোখের সাজেও দেখা গিয়েছিল তাঁর সাহসী রুচির প্রকাশ।
তবে দৈনন্দিন জীবনে তাঁর সাজ অনেকটাই স্বাভাবিক ও হালকা। সাজসজ্জার আগে ত্বক ভালোভাবে আর্দ্র করে নেন তিনি, যাতে ত্বকে মসৃণ ভিত্তি তৈরি হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ফাউন্ডেশন, কনসিলার, ব্লাশ, আইলাইনার ও মাসকারা দিয়ে সাজ সম্পূর্ণ করেন তিনি।
নিজের প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান হাউস ল্যাবস-এর পণ্যও তাঁর সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়। তাঁর কাছে মেকআপ শুধু চেহারা বদলে ফেলার উপায় নয়; বরং নিজের সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের একটি মাধ্যম।
চুলে রঙের খেলা
লেডি গাগার চুলের রং ও ধরনও তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই পরিবর্তনশীল। কখনো গোলাপি, কখনো মধুরঙা সোনালি, কখনো নীল, রুপালি কিংবা চেরি লাল ইত্যাদি রঙে তাঁকে দেখা গেছে।
তাঁর অনেক আলোচিত সাজে বিশেষভাবে তৈরি কৃত্রিম চুল বা পরচুলা ব্যবহার করা হয়। এর ফলে মঞ্চসজ্জার জন্য বারবার প্রাকৃতিক চুলে রাসায়নিক রং, তাপ বা অতিরিক্ত সাজসজ্জার সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রয়োজন কিছুটা কমে। ফলে প্রাকৃতিক চুল অতিরিক্ত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
চুলের পরিচর্যায় ওলাপ্লেক্স নম্বর ৩-এর মতো ট্রিটমেন্ট এবং হেয়ার অয়েল ব্যবহার করেন লেডি গাগা।
সুগন্ধিতেও আলাদা গাগা
লেডি গাগার ব্যক্তিত্ব যেমন বৈচিত্র্যময়, তাঁর পছন্দের সুগন্ধিও তেমনই স্বতন্ত্র। তাঁর নিজস্ব সুগন্ধি ‘ফেম’-এ রয়েছে ফুলের গভীর ঘ্রাণের সমন্বয় রয়েছে। এতে ধূপ, বেলাডোনা ও জাফরানের মতো ঘ্রাণ-উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে।
মঞ্চ থেকে প্রসাধনী শিল্পে
লেডি গাগার সৌন্দর্য ভাবনার সবচেয়ে বড় প্রকাশ সম্ভবত তাঁর নিজস্ব প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান হাউস ল্যাবরেটরিজ। ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পরে নতুনভাবে হাউস ল্যাবস বাই লেডি গাগা নামে আত্মপ্রকাশ করে।
এই প্রতিষ্ঠানের দর্শন ছিল—প্রসাধনী শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানোর উপকরণ নয়; এটি নিজের সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।
গাগার নিজের জীবনও যেন সেই দর্শনেরই প্রতিফলন। কখনো অতিরঞ্জিত সাজ, কখনো স্বাভাবিক চেহারা, কখনো উজ্জ্বল চুলের রং—নিজেকে সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় আটকে রাখেননি তিনি; বরং নিজের চেহারা ও সাজকে বারবার নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
সূত্র: এনএসএস ম্যাগাজিন











