Ajker Patrika

মানসিক চাপেও পেটে মেদ হয়: দূর করতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন

অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া
মানসিক চাপেও পেটে মেদ হয়: দূর করতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন
মানসিক চাপে পেটে মেদ জমা হয়। এ মেদ দূর করতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন। ছবি: পেক্সেলস

খাওয়াদাওয়ায় লাগাম টানার পরও বা অতিরিক্ত খাওয়া না হলেও শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় পেট যেন একটু বেশিই বড় মনে হয়। ব্যায়াম করেও বাড়তি মেদ ঝরানো মুশকিল হয়ে উঠছে। খাবারের নিয়মকানুন ও শরীরচর্চা করে অন্যরা মেদ ঝরাতে পারলেও আপনি পারছেন না কেন, সেটাই বারবার নিজেকে প্রশ্ন করে থাকলে এই লেখাটা আপনার জন্য। আপনার যা হয়েছে, তাকে সাধারণ মেদ বলে মনে করলে ভুল হবে; একে বলা হয় কর্টিসল বেলি। অর্থাৎ আপনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ভুগছেন। আপনার শরীরে কর্টিসল অর্থাৎ স্ট্রেস হরমোন বেশি নিঃসৃত হচ্ছে। সে কারণে খাওয়াদাওয়া নিয়ন্ত্রণ আর ব্যায়াম করেও আপনার পেটের মেদ কমছে না।

কর্টিসল বেলি কী

কর্টিসল বেলি মানে শুধু পেট মোটা হওয়া নয়, এটা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের ফলে পেটে জমা হওয়া একধরনের মেদ। এর কারণে পেট বড় হয়, কিন্তু হাত-পা থাকে রোগা।

চিনি, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার একেবারে বাদ দিয়ে খেতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার। ছবি: পেক্সেলস
চিনি, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার একেবারে বাদ দিয়ে খেতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার। ছবি: পেক্সেলস

কর্টিসল বেলির কারণ কী

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, কম ঘুম, অতিরিক্ত কাজের চাপ আর অস্বাস্থ্যকর খাবার—এগুলো মিলে শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়। তখন শরীর বারবার বলে, ‘তুমি বিপদে আছ, আমি চর্বি জমিয়ে রাখছি।’ আপনি কি দিনের পর দিন নিজের মনের কথাকে অবহেলা করছেন? তাহলে এখনো সময় আছে সচেতন হওয়ার।

কতজন এ সমস্যায় ভোগেন

বিশ্বের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো সময় কর্টিসলজনিত পেটের মেদ অনুভব করেন। এশিয়ায় এর হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। বাংলাদেশের গ্রামে কম হলেও ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে ১০ থেকে ১২ শতাংশ মানুষের এই সমস্যা হচ্ছে বলে ধারণা চিকিৎসকদের।

লক্ষণগুলো যেভাবে চিহ্নিত করবেন

দীর্ঘদিন ধরে শরীরে মানসিক চাপ এবং কর্টিসলের আধিক্য থাকলে প্রাপ্তবয়স্কদের পেট শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় স্থূল দেখা, ক্লান্তিবোধ কাজ করে, ঘুমের সমস্যা হয়, মেজাজ খিটখিটে থাকে। শিশুদের বেলায় পেট ফোলা থাকে কিন্তু ওজন কম হয়, স্কুলে মনোযোগ দিতে পারে না। একটুতেই কান্নাকাটি করে। প্রবীণদের ক্ষেত্রে পেশির সমস্যা দেখা দিতে পারে, হাত-পা রোগা হলে পেটটাই বড় দেখায়, সারাক্ষণ ঘুম পায়।

আমাদের মস্তিষ্ক যখন বিপদ টের পায়, তখন অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ করে। কর্টিসল রক্তের চিনি বাড়ায় এবং ভিসেরাল ফ্যাট বা পেটের ভেতরে মেদ জমতে সাহায্য করে।

যে কারণে ঝুঁকিপূর্ণ

যাঁরা দিনে ৬ ঘণ্টার কম ঘুমান, যাঁদের কাজ বা সংসারে সব সময় টানাপোড়েন থাকে, যাঁরা চিনি ও ভাজাপোড়া বেশি খান, ধূমপান বা মদ্যপান করেন, তাঁদের পেটে এ ধরনের মেদ জমার ঝুঁকি বেশি থাকে। মেয়েদের মেনোপজের পর কর্টিসলের প্রভাব আরও বেড়ে যায়।

যেভাবে প্রতিরোধ করা যেতে পারে

কর্টিসল মেদের চিকিৎসা সহজ কিন্তু ধারাবাহিক হতে হয়। জীবনযাপনেও আনতে হবে বড় পরিবর্তন। যোগাসন ও মেডিটেশনে ধীরে ধীরে হলেও সেরে ওঠা সম্ভব। রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। চিনি, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার একেবারে বাদ দিতে হবে। প্রতিদিন ২০ মিনিট দ্রুতগতিতে হাঁটতে পারলে ভালো। চিকিৎসক প্রয়োজনে মানসিক চাপ ঠিক করার জন্য কাউন্সেলিং এবং কিছু ওষুধ দিতে পারেন।

জেনে রাখা ভালো, ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সীরা এ সমস্যায় বেশি ভোগেন। কারণ, এই বয়সে চাকরি, সংসার, সন্তানের পড়াশোনা, ঋণ—সব মিলিয়ে একসঙ্গে চাপ আসে। বয়স বাড়ায় কর্টিসল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায় বলে পেটে মেদ জমে সহজে। তবে অতিরিক্ত কর্টিসল নিঃসরণই নয়, জীবনযাত্রা ঠিক না থাকলেও কর্টিসল বেলি হতে পারে। তাই দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট অভ্যাস বদলালেই আপনি ফিরে পেতে পারেন নিজের সুস্থ শরীর ও মনের শান্তি।

লেখক: সদস্যসচিব, প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত