Ajker Patrika

পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে আন্তসম্পর্ক গড়ে তুলতে যা করবেন

অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহ্‌রিয়া
পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে আন্তসম্পর্ক গড়ে তুলতে যা করবেন
ছবি: পেক্সেলস

নগরায়ণের ফলে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবার গড়ে উঠছে গ্রাম ও শহরে। শহুরে জীবনে বর্তমানে অনেক পরিবারেই স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী। ফলে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা সে পরিবারে থাকলেও দিনের বেশির ভাগ সময় তাঁরা একাকিত্বে ভোগেন। কারণ রাতের খাবারের টেবিল ছাড়া পারিবারিক জমায়েত তেমন একটা হয় না। কিন্তু নগরায়ণ আমাদের কি পরিবারের আন্তসম্পর্কে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে? বিশেষ করে বয়স্ক বাবা-মায়ের সঙ্গে? আমাদের পরিবারের বয়স্কদের সঙ্গে সম্পর্কটি নিয়ে কখনো ভেবেছি কি? তাঁদের মনস্তত্ত্ব, বিনোদন সবটা নিয়েই ভাবার সময় এসেছে। কারণ পরিবারের প্রতিটি সদস্যই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারের বয়স্কদের যেভাবে সময় দেবেন

বয়স্ক মানুষেরা কিন্তু জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন নিজেদের অভিজ্ঞতায়। আপনি যখন হামাগুড়ি দিচ্ছেন, তখন কিন্তু তিনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পৃথিবীর বুকে। সে কথাটা বিবেচনায় রেখে তিনি এখন প্রথম যে জিনিস দাবি করেন, সেটা সম্মান।

বয়স্ক ব্যক্তিদের বর্তমান শারীরিক অক্ষমতাকে করুণা নয়, সম্মান দিতে হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে পরিবারের।

বয়স্ক মানুষদের সম্মান দেখানোটা সমাজ জোর করে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আমরাও সেটা খুব আড়ম্বরের সঙ্গে কদমবুসি করে অথবা উপহার দিয়ে প্রকাশ করতে পছন্দ করি কখনো কখনো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উপহারের থেকে তাঁদের আসলে আরও বেশি দরকার স্বীকৃতি। তাঁদের এই স্বীকৃতি দিতে হবে যে আপনি সত্যিই সুখ-দুঃখ আনন্দ ভয় মিলিয়ে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে একটা জীবন পার করেছেন। আপনাকে স্যালুট।

এ ক্ষেত্রে আপনি এটা ঠিক করেছেন, আপনি সেটা ভুল করেছেন—এ ধরনের মন্তব্য একদম করা যাবে না। কারণ তাঁর যে মুহূর্তে যে অপশনটা ভালো মনে হয়েছিল, তিনি সেটা করেছেন।

ওনাদের কাছ থেকে অতীতের গল্পগুলো শুনতে চান। এতে অনেক হালকা হয়ে যায় মানুষ। তাঁকে বলতে দিয়ে নিজে শ্রোতার ভূমিকা নিন। হতেই পারে সেটা মোটে আধা ঘণ্টা, তাও মাসে এক দিন। কিন্তু সেটাই কোয়ালিটি টাইম হবে আপনাদের।

বয়স্কদের সঙ্গে পরিবারের শিশুদের সম্পর্ক তৈরি করা

প্যারেন্টিংয়ের ধারণা যুগের সঙ্গে পাল্টায়। বর্তমান সময়ের প্যারেন্টিংয়ের ধারণা দিয়ে বয়স্কদের সময়ের প্যারেন্টিংকে বিবেচনা করা যাবে না। তিনি যাই করুন, তাঁর ভালোবাসা মিথ্যা ছিল না। এবার শিশুদের সে ভালোবাসা দিতে শেখান বয়স্কদের।

শিশু ও বয়স্কদের এই সম্পর্কের পেছনে বিনিয়োগটা নিজের জন্য। ভবিষ্যতে আপনি যখন বার্ধক্যে পৌঁছাবেন, তখন আজকের শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হবে। তাকে আজ শিখিয়ে দিন, বয়স্কদের যত্ন নিতে হবে।

শিশুদের সামনে বয়স্কদের বদনাম করবেন না। কারণ বাবা-মায়ের আচরণ থেকে শিশুরা শিক্ষা নেয়।

ছবি: পেক্সেলস
ছবি: পেক্সেলস

বয়স্কদের আবদার যেভাবে মেটাবেন ও বোঝাবেন

একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরে মানুষের ধৈর্য কমে যায়। বয়স্ক ব্যক্তিরা মাঝে মাঝে জেদ করবেন, অবুঝ আচরণ করবেন। এটাই স্বাভাবিক।

আপনি প্রচণ্ড ব্যস্ত, তাই একটু সময় বের করা আপনার জন্য কঠিন হতে পারে। কিন্তু যাঁর অখণ্ড অবসর তিনি যদি আপনাকে একটু দেখতে চান, আপনার কি বিরক্ত হওয়াটা মানায়?

মানুষের বয়স বাড়লে, শরীরের শক্তি কমে গেলে ভয় বাড়তে থাকে। একজন বয়স্ক মানুষ ভয় পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাঁকে এ ভয় থেকে মুক্ত করুন। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করুন।

তাঁর চাহিদাগুলো আপনার বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কতটুকু মেটানো সম্ভব, সে বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার।

আমরা যখন কথা বলা বন্ধ করে দিই, তখন নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করতে থাকি। এই বলয়টি খুব অস্বাস্থ্যকর।

বয়স্ক মানুষটি যা চাচ্ছেন সেটা যে সব সময় দিতে হবে, এমন কথা নেই। তিনি প্রধানত জানতে চান, তাঁর কথাগুলো শোনা হচ্ছে কি না। তিনি গুরুত্ব পাচ্ছেন কি না। তিনি উপযুক্ত মর্যাদা পাচ্ছেন কি না। এই জায়গাগুলো সতর্কভাবে খেয়াল রাখলে সম্পর্কের ভিত মজবুত থাকে।

অবসর যাপনের ব্যবস্থা করে নিন

অবসর যে নেওয়া প্রয়োজন, আমাদের দেশে এই ধারণা নেই। অবসর মানে হাত-পা গুটিয়ে বসা নয়। মানে নিজেকে সমাজে অপ্রয়োজনীয় বা অপাঙ্‌ক্তেয় ঘোষণা করা নয়; বয়স্ক মানুষদের বিষয়টি বোঝাতে হবে।

অবসর মনে হতে পারে, আমি এত দিন এই পৃথিবী থেকে যা যা নিয়েছি, এবার সেই আলো-বাতাসের ঋণ শোধের পালা। তাই অবসর নিয়ে সমাজকল্যাণমূলক কাজে বয়স্ক মানুষদের যুক্ত করুন।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার পর্যায়

প্যালিয়েটিভ কেয়ার হচ্ছে নিরাময় অযোগ্য রোগীদের এবং তাঁর পরিবারের ভোগান্তি কমানোর চেষ্টা। পরিবারে যদি এমন অসুস্থ বয়স্ক মানুষ থাকেন, তাহলে তাঁর যত্ন কিন্তু আর একটু ভিন্নভাবে করা প্রয়োজন। প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবায় আমরা শুধু শারীরিক চিকিৎসাকে গুরুত্ব দিই। কিন্তু এ ধরনের নিরাময় অযোগ্য মানুষের সেবার ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক স্বাস্থ্য এবং আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব অপরিসীম।

লেখক: চিকিৎসক ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, ঢাকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত