কভিড লকডাউনের অলস এক দুপুরে ইনস্টাগ্রামের পাতায় স্ক্রল করছিলেন ক্রিস্টিন দাউদ। হঠাৎ একটি ভিডিও দেখে চমকে উঠলেন। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে গভীর সমুদ্রের বুকে নামছে এক অদ্ভুতুড়ে ছোট ডুবোজাহাজ যার নাম ‘টাইটান’। আটলান্টিকের হাজার ফুট গভীরে লুকিয়ে থাকা ঐতিহাসিক টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখাই নাকি এর কাজ। ক্রিস্টিন ভেবেছিলেন প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ভুয়া কোনো দৃশ্য। কিন্তু স্বামী শাহজাদা দাউদ ভিডিওটি দেখেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ঘটনা শতভাগ সত্যি। আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হলো দাউদ পরিবারের জীবনে এক মর্মান্তিক মোড়।
ইনস্টাগ্রামের এক রিলস থেকে টাইটানের হাতছানি
শাহজাদা বরাবরই ছিলেন ইতিহাস ও অভিযানের অনুরাগী। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন টাইটানিকে যাবেন। স্ত্রী ক্রিস্টিন ক্লাস্ট্রোফোবিয়া (আবদ্ধ স্থানের ভীতি) সত্ত্বেও স্বামীর সঙ্গী হতে রাজি হলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ১৯ বছরের তরুণ ছেলে সুলেমানের কথা ভেবে নিজের আসনটি তাঁকে ছেড়ে দিলেন ক্রিস্টিন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বাবা-ছেলের এক ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দেওয়া। ২০২৩ সালের ১৮ জুন। উত্তর আটলান্টিকের বুকে ভেসে থাকা ‘পোলার প্রিন্স’ জাহাজের ডেক থেকে ছেলে ও স্বামীকে বিদায় জানালেন ক্রিস্টিন। সুলেমানের পরনে ছিল তাঁর প্রিয় লাল হুডি। হাসিমুখে হাত নেড়ে টাইটান সাবমার্সিবলে চেপে বসলেন শাহজাদা, সুলেমান, দুর্ধর্ষ অভিযাত্রী হ্যামিশ হার্ডিং, গভীর সমুদ্রের অভিজ্ঞ ডুবুরি পল-হেনরি নারজিওলেট এবং ওশানগেটের প্রধান স্টকটন রাশ। নীল জলে অদৃশ্য হয়ে গেল সাবমেরিনটি।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত
ডাইভিং শুরুর কিছুক্ষণ পরেই বদলে গেল দৃশ্যপট। হঠাৎ খবর এল, টাইটানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে! জাহাজে থাকা ক্রুরা প্রথমে বললেন, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটতে লাগল, ফিরে এল না টাইটান। পরের ৯৬ ঘণ্টা ছিল ক্রিস্টিনের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়াবহ অধ্যায়। ক্রুরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর জন্য মুভি স্ক্রিনিং বা গান-বাজনার আয়োজন করলেও, ভেতরে-ভেতরে প্রার্থনায় দিন গুনছিলেন ক্রিস্টিন। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল—অন্ধকার সমুদ্রের তলদেশে কি দম বন্ধ হয়ে আসছে তাঁর প্রাণের মানুষগুলোর?
দীর্ঘ অপেক্ষার নির্মম সমাপ্তি
অবশেষে ২২ জুন এল সেই নির্মম খবর। মার্কিন কোস্ট গার্ড জানায়, টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ থেকে মাত্র ১ হাজার ৬০০ ফুট দূরে উদ্ধার করা হয়েছে টাইটানের অবশিষ্টাংশ। পানির প্রচণ্ড চাপে মুহূর্তের মধ্যেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে যানটি। মস্তিষ্ক বুঝে ওঠার আগেই চিরতরে হারিয়ে গেছেন ভেতরে থাকা পাঁচজন আরোহী। স্বামীর আর সন্তানের ফিরে আসার আশা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। এরপর শুরু হলো আরেক দীর্ঘ লড়াই। কোনো শরীর অক্ষত ছিল না; কেবল পাওয়া গিয়েছিল দুটি ছোট বাক্সে কিছুটা অবশিষ্টাংশ। আন্তর্জাতিক জলসীমা এবং বিভিন্ন দেশের আইনি জটিলতা পেরিয়ে ৯টি দীর্ঘ মাস পর ক্রিস্টিন তাঁর স্বামী ও সন্তানের দেহাবশেষ ফেরত পান।
ট্রমা পেরিয়ে নতুন জীবনের পথে
এই ভয়াবহ ট্রমা ক্রিস্টিনকে শারীরিকভাবে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছিল। চোখে ঝাপসা দেখা, মাথা ঘোরা ও ভারসাম্য হারানোর সমস্যায় ভুগতে থাকেন তিনি। কিন্তু ভেঙে পড়ার পাত্রী তিনি ছিলেন না। জার্মানির এক ট্রমা সেন্টারে দুই মাসের চিকিৎসায় নিজেকে কিছুটা সামলে নেন। আজ তিন বছর পর ক্রিস্টিন দাউদ তাঁর জীবনের সেই কালো অধ্যায়টি এক বইয়ে বন্দী করেছেন। বইয়ের নাম নাইনটি সিক্স আওয়ার্স। যুক্তরাজ্যের মাটিতে এখন তিনি একটি সাইকোসোমেটিক হিলিং সেন্টার চালু করার কাজ করছেন। সেখানে তিনি তাঁর মতো ট্রমা ও শোকে ভেঙে পড়া মানুষদের সাহায্য করা যায়।

লাল হুডির স্মৃতি এবং ভালোবাসার অন্তহীন লড়াই
কখনো কখনো সুরের বনের ভিড়ে হাঁটতে গিয়ে বা সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে শাহজাদা আর সুলেমানের উপস্থিতি অনুভব করেন ক্রিস্টিন। কোনো তরুণকে লাল হুডি পরে হাঁটতে দেখলে আজও বুকটা ধক করে ওঠে তাঁর। তবু তিনি শোককে শক্তিতে বদলে বাঁচতে চান। কারণ, তিনি জানেন, মৃত্যুর চেয়ে জীবনের লড়াইটা বড়, আর ভালোবাসা কখনো মুছে যায় না।
সূত্র: সিএনএন










