Ajker Patrika

এই শ্রাবণে ঘুরে আসুন টাঙ্গুয়ার হাওর

মীর মহিবুল্লাহ
এই শ্রাবণে ঘুরে আসুন টাঙ্গুয়ার হাওর

১৪ আষাঢ়, রোববার। বিকেল থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফাঁকে ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস। আমরা তখন ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় হেঁটে নয়, গাড়িতে। গাড়ির ভেতর বাজছিল আষাঢ়ের গান, ‘চলো কোথাও যাই, এই ঝড়-বর্ষায়...’। মুহূর্তেই মনে হলো, শহরের কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির কাছে না গেলে যেন আষাঢ় সত্যিকার অর্থে অনুভব করা হবে না।

সঙ্গে থাকা লোকজনকে বললাম, বর্ষার টাঙ্গুয়ার হাওরই আমাদের প্রকৃতির সবচেয়ে নির্মল রূপ দেখাতে পারবে। কথায় কথায় সিদ্ধান্ত হলো, সব কাজ ছেড়ে গন্তব্য টাঙ্গুয়ার হাওর। সেদিন রাতেই বিলাসবহুল হাউসবোট ‘ক্যানভাসে’ দুটি কক্ষ বুক করে পরদিন সকালে সুনামগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম।

IMG_1660

আগের রাত কাটালাম সুনামগঞ্জ শহরের একটি হোটেলে। ১৬ আষাঢ় সকালে তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ার ঘাটে পৌঁছাতেই চোখে পড়ল সারি সারি কাঠ ও স্টিলের হাউসবোট। প্রতিটি যেন অতিথিদের স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় উদ্‌গ্রীব হয়ে আছে।

আমাদের নির্ধারিত হাউসবোটে উঠেই মনে হলো ক্রুজে উঠেছি! পরিপাটি কক্ষ, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আর আন্তরিক আতিথেয়তা মুগ্ধ করল। সকালের নাশতা শেষ করে হাউসবোট যখন হাওরের বুকে এগোতে শুরু করল, তখন একে একে অসংখ্য নৌযানও পাড়ি জমাচ্ছিল একই গন্তব্যে।

তবে যাত্রার শুরুতেই ছোট্ট একটি বিপত্তি। হাউসবোটটি একটি চরে আটকে গেল। প্রায় দুই ঘণ্টার অপেক্ষা। কিন্তু হাসি, আড্ডা, ছবি আর গল্পে সেই সময়টুকুও আনন্দময় হয়ে উঠল।

ওয়াচ টাওয়ারে হাওরের প্রথম স্পর্শ

চর থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল টাঙ্গুয়ার হাওরের বিখ্যাত ওয়াচ টাওয়ার। বলাই নদীর তীরে হিজল বনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই টাওয়ার থেকে চোখে পড়ে হাওরের অপরিসীম বিস্তার। ছোট নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের কিশোর মাঝির কণ্ঠে ভেসে এল হাওরের গান। সেই সুর যেন বর্ষার হাওয়াকে আরও জীবন্ত করে তুলেছিল।

IMG_1654

এরপর স্বচ্ছ পানিতে নেমে ঘণ্টাখানেক গোসল। পানিতে নেমে আমাদের লম্ফঝম্পের একপর্যায়ে একজনের চশমাটি হারিয়ে যায়। শুরু হয় চশমা উদ্ধারের আরেক দফা অভিযান। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে সেটি উদ্ধার হয়। ছোট্ট এই ঘটনায় হাসি-আনন্দে জমে ওঠে আমাদের চারজনের দল। এরপর দুপুরের খাবার খেতে আবার বোটে রওনা হলাম।

বিকেলের নীলাদ্রি ও লাকমা ছড়ায়

বিকেলে পৌঁছালাম টেকেরঘাট। এটি সীমান্তঘেঁষা গ্রাম। সেখানে বোট বেঁধে আমরা নামলাম নীলাদ্রি লেক বা শহীদ সিরাজ লেকের তীরে। স্থানীয়দের কাছে পাথর কোয়ারি নামে পরিচিত এই লেকের স্বচ্ছ নীল পানি, মেঘালয়ের পাহাড় আর সবুজ টিলার মেলবন্ধন জায়গাটি সত্যিই অপূর্ব। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় নীলাদ্রি যেন অন্য এক রূপে ধরা দিল। ওখানে থেকে মোটরবাইক ভাড়া নিয়ে চলে গেলাম লাকমা ছড়ায়। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা শীতল পানির ছোঁয়া মুহূর্তেই দূর করে দিল সব ক্লান্তি। তবে পাহাড়গুলো আমরা ছুঁতে পারি না বলে আফসোসের শেষ নেই। সব পাহাড় পড়েছে সীমান্তের ওপারে। এ ছাড়া লাকমা ছড়ায় যে পাথর রয়েছে, সব নিয়ে গেছে স্থানীয়রা। শুধু ধু-ধু বালুকণা। এদিকে বোট থেকে থেকে নেমে হেঁটেও ঘুরে আসতে পারবেন লাকমা ছড়া। ঘাট থেকে সেখানে হেঁটে যেতে ২০ মিনিটের মতো সময় লাগবে। স্থানীয় যে কাউকে বললে পথ দেখিয়ে দেবে। এরপর মোটরসাইকেলে গ্রাম ঘুরে দেখে সন্ধ্যায় গেলাম ইন্ডিয়ান মার্কেটে। সেখানে ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়।

IMG_1656

বৃষ্টিভেজা রাতের উৎসব

সন্ধ্যায় ফিরে এলাম হাউসবোটে। রাত গভীর হতেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বাইরে বৃষ্টির অবিরাম শব্দ, বিদ্যুতের ঝলকানি আর হাওরের নীরবতা—সব মিলিয়ে এক মোহময় পরিবেশ।

কিন্তু সেই বৃষ্টি আমাদের আনন্দ থামাতে পারেনি। হাউসবোটে থাকা বিভিন্ন জেলার পর্যটকেরা একসঙ্গে বসে জমিয়ে তুললেন গান, নাচ আর আড্ডার আসর। কেউ গাইলেন ভাটিয়ালি, কেউ আধুনিক গান, আবার কেউ নাচে যোগ দিলেন। অচেনা মানুষগুলো মুহূর্তেই হয়ে উঠলেন আপনজন। বর্ষার সেই রাত টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকেই হয়ে রইল আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি।

পাহাড়, নদী আর ছড়ার দেশে

পরদিন ঝুম বৃষ্টির সঙ্গে শুরু হলো নতুন দিনের ভ্রমণ। টেকেরঘাট থেকে চলে গেলাম জাদুকাটা নদীতে। স্বচ্ছ পানির এ নদীটির এক পাশে মেঘালয় পাহাড়, অন্য পাশে সবুজ প্রকৃতি। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজেই এক জলরঙের ছবি এঁকেছে। সঙ্গে ঘুরে দেখলাম দেশের অন্যতম বৃহৎ শিমুল বাগান। যদিও বর্ষাকালে ফুল ছিল না, তবু সবুজে মোড়া পরিবেশ আর পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন ছুঁয়ে গেল। ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে দেখা যায় পুরো বাগান। অন্য পাশে বারিক্কা টিলা। টিলার ওপর দাঁড়িয়ে একসঙ্গে দেখা যায় পাহাড়, নদী আর হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শুধু প্রকৃতিকে অনুভব করলাম।

দুপুরের পরে খাবার খেয়ে রওনা দিয়ে বিকেলে ফিরে এলাম আনোয়ার ঘাটে। শেষ হলো দুই দিনের ভ্রমণ। কিন্তু আষাঢ়ের বৃষ্টি, টাঙ্গুয়ার হাওরের জল, মেঘালয়ের পাহাড়, জাদুকাটা নদী আর হাউসবোটের সেই বৃষ্টিভেজা রাত আজও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য বর্ষার চেয়ে সুন্দর সময় আর হয় না। একবার গেলে ফিরে আসবেন ঠিকই, কিন্তু মন রয়ে যাবে হাওরের অসীম জলরাশিতেই।

কীভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে যেতে হবে সুনামগঞ্জ। ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। এ ছাড়া ট্রেনে সিলেট গিয়ে সেখান থেকে বাস বা মাইক্রোবাসে সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। সুনামগঞ্জ শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা বা রিজার্ভ গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টায় তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ার ঘাট যাওয়া যায়। সেখান থেকে হাউসবোট বা ট্রলারে টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ শুরু হয়।

কোথায় থাকবেন

টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের জনপ্রিয় ব্যবস্থা হলো হাউসবোটে রাত্রিযাপন। বিভিন্ন মান ও বাজেটের হাউসবোট পাওয়া যায়। তবে অবশ্যই আগে বুকিং করে রাখবেন। অনলাইনে খুঁজলে পাওয়া যাবে প্রায় সব হাউসবোটের পেজ। সেখানে যোগাযোগ করে নেওয়া যাবে। চাইলে স্পিডবোট নিয়ে সারা দিন ঘুরে সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলেও রাত কাটাতে পারেন।

কী খাবেন

হাউসবোটে সকাল, দুপুর ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা থাকে। হাওরের টাটকা মাছ, দেশি মুরগি, ডাল, ভর্তা, সবজি এবং বারবিকিউ ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। আগে থেকেই খাবারের মেনু ঠিক করে নেওয়া ভালো।

ভ্রমণ সতর্কতা

  • বর্ষাকালে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন।
  • গভীর পানিতে বিনা প্রয়োজনে নামার ঝুঁকি নেবেন না।
  • আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে যাত্রা করুন।
  • প্লাস্টিক বা ময়লা হাওরে ফেলবেন না।
  • সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলুন।
  • স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সংরক্ষণে সচেতন থাকুন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত