Ajker Patrika

বিশ্বকাপ ২০২৬

জার্সির ডিজাইন ও টাইপোগ্রাফিতে ছিল ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির মেলবন্ধন

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
জার্সির ডিজাইন ও টাইপোগ্রাফিতে ছিল ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির মেলবন্ধন
জার্সির নম্বর ও নামের ফন্টগুলোতে এবার নিখুঁত ইতিহাস আর জ্যামিতিক কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবি: কোলাজ

একজন খেলোয়াড়ের জার্সির কথা মনে করলে আপনার চোখে সবার আগে কী ভেসে ওঠে? পতাকার চিরচেনা রং, বুকের ওপর বড় কোনো স্পনসরের লোগো কিংবা চেনা কোনো ডিজাইন? আমরা অনেকে হয়তো খেয়াল করি না, কিন্তু একটি জার্সির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লুকিয়ে থাকে পিঠের ওপর জ্বলজ্বল করা খেলোয়াড়ের নাম আর নম্বরের ফন্টে। ইতিহাস, স্থাপত্য আর আধুনিক গ্রাফিকসের অনন্য মিশেলে এবারের বিশ্বকাপের জার্সিগুলোতে ঘটেছে টাইপোগ্রাফি বিপ্লব। জার্সির নম্বর ও নামের ফন্টগুলোতে এবারও নিখুঁত ইতিহাস আর জ্যামিতিক কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফিফার কঠিন সব নিয়ম মেনেও জার্সির নম্বরের মাধ্যমে একেকটি দেশের ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

স্থাপত্য ও আর্ট ডেকোর জাদু নিয়ে উরুগুয়ে

এবারের বিশ্বকাপে আলোচিত ও প্রশংসিত ফন্ট তৈরি হয়েছে উরুগুয়ের জার্সির জন্য। জনপ্রিয় ব্র্যান্ড নাইকি তাদের নম্বরের মাঝখান দিয়ে একটি নিখুঁত দাগ কেটে এটিকে একটি চমৎকার আর্ট ডেকো রূপ দিয়েছে। এর অনুপ্রেরণা এসেছে উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওর ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম এস্তাদিও সেন্সেনারিওর তোরণে খোদাই করা লিপি থেকে। এটি শুধু একটি নম্বর নয়, বরং ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস ও স্থাপত্যকে জার্সিতে জীবন্ত করে তোলার এক দুর্দান্ত প্রয়াস।

উরুগুয়ের জার্সির নম্বরের মাঝখান দিয়ে একটি নিখুঁত দাগ কেটে এটিকে একটি চমৎকার আর্ট ডেকো রূপ দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
উরুগুয়ের জার্সির নম্বরের মাঝখান দিয়ে একটি নিখুঁত দাগ কেটে এটিকে একটি চমৎকার আর্ট ডেকো রূপ দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

আর্ট ডেকো বিশ শতকের প্রথমার্ধের একটি আধুনিক ও প্রভাবশালী ডিজাইন শৈলী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে অতীতকে বর্জন এবং ভবিষ্যৎ ও প্রযুক্তিকে উদ্‌যাপনের মানসিকতা থেকে এর জন্ম। জিগজ্যাগ, শেভরন ও বৃত্তের মতো জ্যামিতিক নকশা এবং প্রাচীন সংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি এই স্টাইল স্থাপত্য ও ফ্যাশনে বিলাসিতা এবং আধুনিকতার প্রতীক ছিল।

কুয়াশা চিরে ভাইকিং লিপির প্রত্যাবর্তন

নরওয়ের জার্সির ফন্টের নাম তোকেফ্যার্দ। নাইকি এবং নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন যৌথভাবে এই বিশেষ ফন্ট তৈরি করেছে। ছবি: পেক্সেলস
নরওয়ের জার্সির ফন্টের নাম তোকেফ্যার্দ। নাইকি এবং নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন যৌথভাবে এই বিশেষ ফন্ট তৈরি করেছে। ছবি: পেক্সেলস

নরওয়ের জার্সির ফন্টের নাম তোকেফ্যার্দ। নাইকি ও নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন যৌথভাবে এই বিশেষ ফন্ট তৈরি করেছে। নরওয়েজিয়ান শব্দ তোকেফ্যার্দের অর্থ কুয়াশার মধ্য দিয়ে যাত্রা। দীর্ঘ ২৮ বছর পর নরওয়ের বিশ্বকাপে ফিরে আসার কঠিন লড়াইকে সম্মান জানিয়ে এই নামকরণ করা হয়েছে। এটি মূলত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের প্রাচীন ভাইকিংদের ব্যবহৃত খোদাই করা লিপি বা নরডিক রুনিক বর্ণমালা থেকে অনুপ্রাণিত। ২০২৪ সালে নরওয়ে যখন প্রথম এই রুনিক স্টাইলের ফন্ট জার্সিতে ব্যবহার করে, তখন অক্ষরগুলো এত বেশি আঁকাবাঁকা আর চোখা ছিল যে দূর থেকে চেনা যাচ্ছিল না। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নাইকি এই ফন্টকে নতুনভাবে ডিজাইন করে। তারা সেখানে ল্যাটিন অক্ষরের বাঁকানো অংশে রুনিক লিপির মতো কৌণিক ও ত্রিভুজাকার কাটিং ব্যবহার করে। বিষয়টি একই সঙ্গে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এবং ফিফার নিয়ম মেনে দূর থেকে সহজে পড়াও যাচ্ছে।

রাজপথের ফিলেতিয়াদো পোর্তেনো শিল্প এখন মাঠে

আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের ঐতিহ্যবাহী এবং ইউনেসকো স্বীকৃত লোকশিল্প শৈলী ফিলেতিয়াদো পোর্তেনো। এই শৈলীর উজ্জ্বল ও জাঁকালো রঙের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট এবং আলংকারিক ক্যালিগ্রাফি বা অক্ষরের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনার অ্যাওয়ে জার্সি। শহরের বাস, ট্রাক এবং দোকানের সাইনবোর্ডে এটি আঁকা হতো। এখন এটি ঘরের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জাতেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের নান্দনিকতাই মূলত ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অ্যাওয়ে জার্সির টাইপোগ্রাফি এবং ডিটেইলিংয়ে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি তাদের ফুটবল সংস্কৃতিকে সরাসরি বুয়েনস এইরেসের রাজপথের ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।

আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী এবং ইউনেসকো স্বীকৃত লোকশিল্প শৈলী ফিলেতিয়াদো পোর্তেনো। এই শৈলীর উজ্জ্বল ও জাঁকালো রঙের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট এবং আলংকারিক ক্যালিগ্রাফির মিশ্রণে তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনার অ্যাওয়ে জার্সি। ছবি: সংগৃহীত
আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী এবং ইউনেসকো স্বীকৃত লোকশিল্প শৈলী ফিলেতিয়াদো পোর্তেনো। এই শৈলীর উজ্জ্বল ও জাঁকালো রঙের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট এবং আলংকারিক ক্যালিগ্রাফির মিশ্রণে তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনার অ্যাওয়ে জার্সি। ছবি: সংগৃহীত

ভাস্কর্যের ঐতিহ্য নিয়ে মাঠে মেক্সিকো

আজটেক ক্যালেন্ডার স্টোন কোনো ক্যালেন্ডার নয়। এটি প্রাক্‌-কলম্বিয়ান মেসো-আমেরিকান সভ্যতার একটি ব্যাসল্ট ভাস্কর্য। স্পেনীয় ভাষায় এর নাম পিয়েদ্রা দেল সোল। এর ব্যাস প্রায় ১২ ফুট এবং ওজন ২৫ টন। বর্তমানে এটি মেক্সিকো সিটির জাতীয় নৃতত্ত্ব জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। পাথরটি ১৭৯০ সালে মেক্সিকো সিটির কেন্দ্রীয় প্লাজায় আবিষ্কৃত হয়েছিল। মেক্সিকোর হোম জার্সির নকশায় ফিরে এসেছে এই আজটেক সান স্টোন। এই বৃত্তাকার জটিল ক্যালেন্ডার প্যাটার্ন মেক্সিকোকে তাদের মেসো-আমেরিকান ঐতিহ্যের শিকড়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।

ব্র্যান্ডগুলোর ভিন্ন দর্শন

বিশ্বকাপের মূল তিন কিট স্পনসর কোম্পানি জার্সির ফন্ট নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনটি ধারায় কাজ করেছে।

নাইকি জ্যামিতিক ও র লুকের ওপর বেশি জোর দিয়েছে। উরুগুয়ের পাশাপাশি নরওয়ে এবং ফ্রান্সের হোম কিটের জার্সিতে নাইকি একদম শার্প, জ্যামিতিক এবং মেটালিক বা কৌণিক আকার ব্যবহার করেছে।

অ্যাডিডাস নিয়ে এসেছে ত্রিমাত্রিক ও সফট ভাইব। তারা তাদের বিখ্যাত ট্রেফয়েল অ্যাওয়ে কিটগুলোতে হ্যাচিং বা শেডের খেলার মাধ্যমে ফন্টগুলোর চমৎকার ত্রিমাত্রিক রূপ দিয়েছে। তবে হোম কিটের ক্ষেত্রে তারা বিপরীত পথ বেছে নিয়েছে। আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া ও জাপানের হোম জার্সিতে তারা অত্যন্ত নরম, বাঁকানো এবং মসৃণ ফন্ট ব্যবহার করেছে।

পুমা জোর দিয়েছে গভীরতা ও থ্রি-ডি ইফেক্টের ওপর। পুমাও এবার নম্বরের ফন্টে ডেপথ বা গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে থ্রি-ডি শ্যাডো ও লাইনের ওপর জোর দিয়েছে।

সূত্র: স্পোর্টস ক্রিয়েটিভ স্টুডিও, ফিফা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত