Ajker Patrika

বিয়ের পর পুরুষের তুলনায় অসন্তুষ্ট থাকেন নারীরা

ফিচার ডেস্ক  
বিয়ের পর পুরুষের তুলনায় অসন্তুষ্ট থাকেন নারীরা
বিয়ের সামাজিক মোহ বা বয়সের ব্যবধানের চেয়েও বড় বিষয় হলো, সম্পর্কের স্বচ্ছতা এবং একে অপরের প্রতি সম্মান। ছবি: পেক্সেলস

বিয়ে নিয়ে লোকমুখে বহুল প্রচলিত একটি কথা হলো, বিয়ের লাড্ডু যে খায়, সে পস্তায়। আর যে খায় না, সেও পস্তায়। কথাটা বিয়ে করা নারী কিংবা পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে পুরুষেরা তাঁদের বন্ধু কিংবা বিবাহিত আত্মীয়দের কাছে এ কথাটা বেশি শোনেন। তাঁদের মতে, বিয়ের পর পুরুষের জীবনে এক অবর্ণনীয় অশান্তি নেমে আসে। তবে এ বিষয়ে দ্বিমত থাকে নারীদের। তাঁরা বরং নিজেদেরই বেশি অসন্তুষ্ট বলে মনে করেন।

এই মতবিরোধের আগুনে ঘি ঢালতে পারে একটি গবেষণা। নতুন সে গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষেরা বিয়ের পর বা সঙ্গীর সঙ্গে থাকতে শুরু করলে যতটা সন্তুষ্ট হন, নারীরা ততটা হতে পারেন না। বরং নারীদের ক্ষেত্রে চিত্রটা তার ঠিক উল্টো। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ আন্তর্জাতিক বেশ কিছু জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য বলছে, নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সন্তুষ্টির সংজ্ঞা এবং এর সময়কাল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

বিয়ের সামাজিক মোহ বা বয়সের ব্যবধানের চেয়েও বড় বিষয় হলো সম্পর্কের স্বচ্ছতা এবং একে অপরের প্রতি সম্মান। প্রতিটি মানুষের জন্য সুখের মাপকাঠি আলাদা হতে পারে। তাই সামাজিক রীতিনীতি বা অন্ধ অনুকরণ না করে নিজের ভালো লাগা এবং মানসিক প্রশান্তি যেখানে সর্বোচ্চ, সেখানেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে নেওয়া উচিত।

বিয়ে নাকি বিয়ের পরিকল্পনা

‘বিয়ের পর সব সুখ ফুরিয়ে যায়’ বন্ধুমহলের এ রসিকতা কি তবে কেবল কৌতুক নয়; বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেলিন্ডা হিউইটের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় ১৮ বছর ধরে প্রায় ২ হাজার ৮২০ জন মানুষের জীবনযাপনের মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নজর রাখা হয়। ফলাফল বলছে, একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে সুখের সময় হলো যখন তিনি তাঁর সঙ্গীর সঙ্গে প্রেম বা লিভ-ইনের সম্পর্কে রয়েছেন বা ভবিষ্যতে বিয়ের পরিকল্পনা করছেন। গবেষকদের মতে, বিয়ের আগের এ সময়টিতে একটি লক্ষ্য বা ‘প্রজেক্ট’ থাকে। বিয়ের আয়োজন, হানিমুন এবং সঙ্গীর প্রতিশ্রুতির এই আকাঙ্ক্ষা নারীকে একধরনের মানসিক পূর্ণতা দেয়। কিন্তু বিয়ের এক বছর পার হতে না হতেই এই সন্তুষ্টি ও সুখের মাত্রা কমতে শুরু করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তা বিয়ের আগের স্তরের চেয়েও নিচে নেমে যায়। এর কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলছেন, বিয়ের পর পরিকল্পনার সেই আগ্রহ শেষ হয়ে যায়। আর সে জায়গা দখল করে সামাজিক প্রত্যাশা ও নানামুখী পারিবারিক চাপ।

বিয়ের পর সম্পর্কের নিশ্চয়তা বা সম্ভাবনা না থাকলে নারীরা খুব একটা স্বাস্থ্যগত উন্নতি বা তৃপ্তি খুঁজে পান না। ছবি: পেক্সেলস
বিয়ের পর সম্পর্কের নিশ্চয়তা বা সম্ভাবনা না থাকলে নারীরা খুব একটা স্বাস্থ্যগত উন্নতি বা তৃপ্তি খুঁজে পান না। ছবি: পেক্সেলস

সুখের ভিন্ন রূপ

গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ের পর বা সঙ্গীর সঙ্গে থাকতে শুরু করলে পুরুষেরা সবচেয়ে বেশি সুখী থাকেন। তাঁদের স্বাস্থ্যগত অবস্থার কোনো বিশেষ পরিবর্তন না হলেও মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের পর সম্পর্কের নিশ্চয়তা বা সম্ভাবনা না থাকলে তাঁরা খুব একটা স্বাস্থ্যগত উন্নতি বা তৃপ্তি খুঁজে পান না। অর্থাৎ সম্পর্কের একটি সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ বা প্রতিশ্রুতিই নারীর সুস্বাস্থ্যের অন্যতম চাবিকাঠি।

বিয়ের চেয়েও বড় আনন্দ হলো সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা। ছবি: পেক্সেলস
বিয়ের চেয়েও বড় আনন্দ হলো সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা। ছবি: পেক্সেলস

বয়সের ব্যবধানের প্রভাব

‘রিলেশনশিপ থেরাপি’ জার্নালে প্রকাশিত এক লেখায় আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, যেসব নারী বয়সে ছোট পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন, তাঁরা তুলনামূলক বেশি সুখী। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নারীদের ওপর করা এই জরিপ বলছে, বয়সে ছোট সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কে থাকলে নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। তাঁরা নিজেদের ওপর বেশি আস্থা পান। এ ছাড়া তাঁদের মানসিক বুদ্ধিমত্তা বেশি ভালো থাকে। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের আবেগ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন থাকেন। এ ধরনের সম্পর্কে নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বেশি থাকে। প্রথাগত লিঙ্গীয় ভূমিকার বাইরে গিয়ে তাঁরা অনেক বেশি খোলামেলা সম্পর্ক উপভোগ করেন, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ থাকে। যদিও সমাজ এখনো বয়সে ছোট সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক তকমা ব্যবহার করে। তবুও পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ ধরনের সম্পর্কের রসায়ন ও গভীরতা অনেক সময় সমবয়সী সম্পর্কের চেয়েও বেশি হয়।

সম্পর্কের আসল শক্তি কোথায়?

গবেষণাগুলোর মধ্যে উঠে এসেছে ভালোবাসা বা সুখ কিংবা সন্তুষ্টি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা প্রথাগত ছকে বাঁধা নয়। সুখ আসলে লুকিয়ে থাকে সম্পর্কের গুণগত মানের ওপর। যেমন পরিকল্পনার আনন্দ। বিয়ের চেয়েও বড় আনন্দ হলো সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা। বিয়ের আগে ব্যক্তিগত সত্তা বজায় থাকে বেশি। বিয়ের পর যখন সামাজিক দায়িত্ব বা প্রত্যাশার চাপে নিজের সত্তা হারিয়ে যায়, তখনই সুখ বা সন্তুষ্টি কমতে থাকে। বয়সের ব্যবধান যা-ই হোক না কেন, যেখানে একজন নারী নিজেকে প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও গুরুত্ব পান, সেখানেই প্রকৃত সুখ ও সন্তুষ্টি স্থায়ী হয়।

সূত্র: এবিডি পোস্ট, দ্য বডি অপটিমিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত