Ajker Patrika

মেকআপহীন সৌন্দর্যের পেছনে আভিজাত্য, স্বস্তি নাকি শ্রেণিগত বৈষম্য

ফিচার ডেস্ক 
মেকআপহীন সৌন্দর্যের পেছনে আভিজাত্য, স্বস্তি নাকি শ্রেণিগত বৈষম্য
নিয়মিত পার্লারে যাওয়া, চুল ডাই করা, মেকআপ ও নখ সাজানোর মতো বিষয়গুলো নারীদের ওপর একটি অদৃশ্য মানসিক চাপ তৈরি করে। ছবি: পেক্সেলস

মেকআপ না থাকা সত্ত্বেও ঝলমলে ত্বক, টাইট করে বাঁধা চুল, সুতির সাদা টি-শার্ট আর হাতে এক কাপ মাচা চা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েক বছর ধরে রাজত্ব করছে ‘ক্লিন গার্ল’ নান্দনিকতা। আর এখন এই ধারার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘বেয়ার নেলস’ বা নেল পলিশ ছাড়া খালি নখের ফ্যাশন। বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে এটি অত্যন্ত সাধারণ, স্বাভাবিক ও সহজ এক জীবনধারা। কিন্তু ট্রেন্ডগুলোর গভীরের গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিয়মিত পার্লারে যাওয়া, চুল ডাই করা, মেকআপ ও নখ সাজানোর মতো বিষয়গুলো নারীদের ওপর একটি অদৃশ্য মানসিক চাপ তৈরি করে। সৌন্দর্য বজায় রাখার এই ‘হামস্টার হুইল’ বা সহজ বাংলায় ইঁদুর দৌড় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিশ্বজুড়ে নারীদের যে মানসিক ও অর্থনৈতিক স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা চলছে, তা আলোচনা করা যায়।

২০২১ সালে টিকটকে জন্ম নেওয়া ‘ক্লিন গার্ল’ ট্রেন্ডটির মূল কথা হলো, এমন এক রূপ যেন মনে হয় আপনি এইমাত্র গোসল সেরে সতেজ হয়ে বেরিয়ে এসেছেন। ছবি: পেক্সেলস
২০২১ সালে টিকটকে জন্ম নেওয়া ‘ক্লিন গার্ল’ ট্রেন্ডটির মূল কথা হলো, এমন এক রূপ যেন মনে হয় আপনি এইমাত্র গোসল সেরে সতেজ হয়ে বেরিয়ে এসেছেন। ছবি: পেক্সেলস

‘ক্লিন গার্ল’ অ্যাস্থেটিকের বিবর্তন

২০২১ সালে টিকটকে জন্ম নেওয়া এই ট্রেন্ডটির মূল কথা হলো, এমন এক রূপ—যেন মনে হয় আপনি এইমাত্র গোসল সেরে সতেজ হয়ে বেরিয়ে এসেছেন। হেয়ালি বাইবার বা অন্যান্য তারকাদের হাত ধরে এটি দ্রুত ফ্যাশন জগতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের ধারণা ছিল মেকআপের জটিলতা ও কৃত্রিমতা দূর করতেই বুঝি এই ট্রেন্ডের আবির্ভাব। তবে সময়ের সঙ্গে এই সাজে এসেছে পরিবর্তন। শুরুর দিকে নিখুঁত ও দাগহীন ত্বকের জয়জয়কার ছিল। কিন্তু বর্তমানে মেয়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকার করছেন যে, এই ন্যাচারাল লুক বা স্বাভাবিক চেহারা ধরে রাখতে তাদের কত কঠোর রুটিন, দামী স্কিনকেয়ার ও যত্ন নিতে হয়। ২০২৬ সালে এসে এটি শুধু একঘেয়ে মেকআপহীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাগ চার্ম, ভিনটেজ পোশাক বা লেসের ছোঁয়ায় নিজেদের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের দিকে গড়াচ্ছে।

নেল পলিশ বনাম ‘বেয়ার নেলস’ বা খালি নখ

‘ক্লিন গার্ল’ ট্রেন্ডেরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে যোগ হয়েছে ‘বেয়ার নেলস’-এর জনপ্রিয় ফ্যাশন। আজকাল নারীরা পার্লারে এসে নখ ফাইলিং বা ময়েশ্চারাইজ করালেও কোনো রঙ বা পলিশ লাগাচ্ছেন না। অনেক নারীরাই মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতি দুই সপ্তাহে পার্লারে গিয়ে পলিশ করানোর বাধ্যবাধকতা তার কাছে একটা মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় ও অর্থ বাঁচাতে অনেকেই পলিশ করানো ছেড়ে দেন। এই বিষয়টি ইন্টারনেটে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু অনেক ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ একে ফ্যাশনের একটি ধূর্ত রূপ হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকের জন্য এই সিদ্ধান্তটি শুধুই জীবনযাত্রাকে সহজ করার চেষ্টা।

ইতিহাস বলে, রঙিন ও নকশাদার নেল আর্টের সূচনা এবং বিকাশ প্রধানত কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিন ও এশীয় জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে ঘটেছিল। ছবি: পেক্সেলস
ইতিহাস বলে, রঙিন ও নকশাদার নেল আর্টের সূচনা এবং বিকাশ প্রধানত কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিন ও এশীয় জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে ঘটেছিল। ছবি: পেক্সেলস

আভিজাত্যের লড়াই ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি

নুযড বা সাধারণ লুককে ‘কোয়ায়েট লাক্সারি’ বা উচ্চ সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ইতিহাস বলে, রঙিন ও নকশাদার নেল আর্টের সুচনা এবং বিকাশ প্রধানত কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিন ও এশীয় জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে ঘটেছিল। কিন্তু এখন পলিশহীন খালি নখকে যখন ‘উচ্চমানের বা রুচিশীল’ বলা হচ্ছে, তখন তা পরোক্ষভাবে রঙিন নেল আর্টকে নিচু চোখে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। অর্থাৎ বিষয়টি এক ধরনের বর্ণবাদী বিউটি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে। ইতিহাসবিদ সুজান ই শাপিরো বিবিসিকে জানান, প্রাচীন চীনে বড় নখ ছিল পরিশ্রমহীন অভিজাত জীবনের প্রতীক। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে ভিয়েতনামী অভিবাসীদের হাত ধরে সহজলভ্য নেল বার গড়ে উঠলে সাধারণ মানুষ রঙিন ম্যানিকিউরের সুযোগ পায়। তখনই উচ্চবিত্ত সমাজ নিজেদের আলাদা প্রমাণ করতে রঙহীন ‘ন্যাচারাল’ লুকের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে, যাকে ফ্যাশনের ভাষায় বলা হয় ‘কাউন্টার সিগন্যালিং’। সবচেয়ে বড় আইরনি বা অসঙ্গতি হলো এই ‘ন্যাচারাল’ বা কৃত্রিমতাহীন নখ ধরে রাখতেও পার্লারে বিপুল অর্থ ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করতে হয়।

কৃত্রিমতার ছোঁয়া ও বাস্তব সত্য

সৌন্দর্য সচেতনতা বা হালকা সাজ পছন্দ করা অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু নেল আর্ট বা গাঢ় মেকআপকে ‘কম রুচিশীল’ আর ন্যাচারাল লুককে ‘উচ্চমানের’ তকমা দেওয়াটা অযৌক্তিক। কোনো ট্রেন্ডকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে, নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ও পছন্দ অনুযায়ী নিজের সাজ বেছে নেওয়াই আসল আভিজাত্য। কারণ মজার বিষয় হলো, যাকে ‘ন্যাচারাল’ বা পলিশহীন বলা হচ্ছে, তাও পুরোপুরি প্রাকৃতিক নয়। স্যালনগুলোতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক লুক পেতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ও প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। দিনশেষে এই ট্রেন্ড নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নখ সাজানো বা স্বাভাবিক রাখা সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কেউ নেল আর্ট পছন্দ করতে পারেন, আবার কেউ খালি নখ পছন্দ করতে পারেন। এটি নিয়ে কাউকে বিচার করা কিংবা সামাজিক মর্যাদা মেপ নেওয়াটা একদমই অযৌক্তিক।

সূত্র: বিবিসি, হু হোয়াট ওয়্যার

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত