Ajker Patrika

সর্দিজ্বর-পরবর্তী ত্বকের নিস্তেজতা ও চুল পড়া রোধে করণীয়

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ১০
সর্দিজ্বর-পরবর্তী ত্বকের নিস্তেজতা ও চুল পড়া রোধে করণীয়
ছবি: পেক্সেলস

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হওয়া একটি সাধারণ বিষয়। জ্বর চলাকালে আমরা শরীরের যত্ন নিলেও জ্বর সেরে ওঠার পর অনেকেই এক নতুন সমস্যায় পড়েন। আয়নার সামনে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে ত্বকের শুষ্কতা, ঠোঁট ফেটে যাওয়া, চোখের নিচে কালো দাগ এবং মাথায় চিরুনি চালালেই গোছা গোছা চুল উঠে আসার সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। জ্বরের কারণে শরীরের উচ্চ তাপমাত্রা, তীব্র ডিহাইড্রেশন এবং অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য ওষুধের কড়া পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের ত্বক ও চুলের ওপর। তবে সঠিক নিয়মে যত্ন নিলে ও সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করলে খুব দ্রুতই এই ধকল কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সর্দিজ্বর থেকে সেরে ওঠার পর ত্বক ও চুলের হারানো উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনার বিস্তারিত উপায় নিচে আলোচনা করা হলো।

ত্বকের হাল ফেরাতে

ত্বকের হারানো উজ্জ্বলতা ও আর্দ্রতা ফেরাতে করণীয়

জ্বরের সময় শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও খনিজ উপাদান কমে যায়। ফলে ত্বক নিস্তেজ, খসখসে ও রুক্ষ দেখায়। এই সময়ে ত্বকের যত্নে প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ত্বকের আর্দ্রতা নিশ্চিত করা ও ত্বকের জন্য নিরাপদ যত্নের উপায় খুঁজে বের করা।

গভীর ময়েশ্চারাইজেশন ও হাইড্রেটিং উপাদান

ত্বকের শুষ্কতা দূর করতে দিনে অন্তত দুই থেকে তিনবার ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা জরুরি। ফেসওয়াশ ব্যবহার বা গোসলের পর ত্বক হালকা ভেজা থাকতেই ময়েশ্চারাইজার লাগান। এতে আর্দ্রতা ত্বকের ভেতরে লক হয়ে যায়। ময়েশ্চারাইজার কেনার সময় হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, সিরামাইড, গ্লিসারিন বা অ্যালোভেরাসমৃদ্ধ পণ্য বেছে নিন। এগুলো ত্বকের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যারিয়ার দ্রুত মেরামত করতে সাহায্য করে।

মৃদু ক্লিনজার বা ফেসওয়াশ ব্যবহার

জ্বর-পরবর্তী সময়ে ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে। তাই এই সময়ে কোনো ধরনের স্ক্রাব বা তীব্র কেমিক্যালযুক্ত সাবান ও ফেসওয়াশ ব্যবহার করা যাবে না। ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধরে রাখতে সালফেটমুক্ত ও ফোমিং কম হয় এমন মাইল্ড বা হাইড্রেটিং ক্লিনজার ব্যবহার করুন। দিনে দুবারের বেশি ফেসওয়াশ ব্যবহার না করাই ভালো।

ফাটা ঠোঁট ও চোখের চারপাশের যত্ন

সর্দিজ্বরের সময় অনবরত মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া বা সর্দি মোছার কারণে ঠোঁটের চারপাশ এবং নাক ছিলে যায় ও ফেটে যায়। ঠোঁটের মরা চামড়া জোর করে টেনে না তুলে নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি, শিয়া বাটার বা ভালো লিপবাম ব্যবহার করুন। জ্বরের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে চোখের নিচে কালো দাগ বা ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। ঘুমানোর আগে একটি ভালো আই ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন অথবা ঠান্ডা শসার টুকরা চোখে দিয়ে ১০ মিনিট বিশ্রাম নিতে পারেন।

ছবি: পেক্সেলস
ছবি: পেক্সেলস

রোদের আলো থেকে সুরক্ষা

দুর্বল ত্বকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বেশি ক্ষতি করে এবং পিগমেন্টেশন বা কালচে দাগ তৈরি করে। তাই ঘরে বা বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন, দিনের বেলা নিয়মিত এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সমৃদ্ধ সানস্ক্রিন ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

চুলের যত্ন

চুল পড়া রোধ ও স্কাল্পের বিশেষ যত্ন

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, গুরুতর কোনো অসুস্থতা বা জ্বরের দুই থেকে তিন মাস পর হঠাৎ প্রচুর চুল পড়তে শুরু করে। একে বলা হয় ‘তেলোজেন এফ্লুভিয়াম’। জ্বরের ধকলের কারণে চুলের ফলিকলগুলো অকালেই ঝরে যাওয়ার স্তরে চলে যায়। তবে সঠিক যত্নে এই চুল আবার গজানো সম্ভব।

স্কাল্প বা মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা

অসুস্থতার দিনগুলোতে নিয়মিত চুল না ধোয়ার কারণে স্কাল্পে ময়লা, মরা চামড়া ও তেলের স্তর জমে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে। সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন একটি মাইল্ড বা অ্যান্টি ড্যান্ড্রাফ শ্যাম্পু দিয়ে চুল ও মাথার ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। শ্যাম্পু করার সময় নখ দিয়ে মাথার ত্বক চুলকাবেন না, আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে ম্যাসাজ করুন।

কন্ডিশনিং ও হেয়ার মাস্ক

জ্বরে চুল তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারিয়ে খড়ের মতো রুক্ষ হয়ে যায়। শ্যাম্পু করার পর চুলের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী ভালো কন্ডিশনার লাগান এবং দুই-তিন মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে এক দিন ঘরোয়া প্রোটিন প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। যেমন—টকদই, ডিম ও এক চামচ মধুর মিশ্রণ চুলে ৩০ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেললে চুলের রুক্ষতা দ্রুত দূর হয়।

ভেজা চুল না আঁচড়ানো ও হিট স্টাইলিং বর্জন

এ সময় চুলের গোড়া অত্যন্ত নরম ও ভঙ্গুর থাকে। ভেজা অবস্থায় চুল কখনোই আঁচড়াবেন না বা তোয়ালে দিয়ে জোরে জোরে মুছবেন না। চুল শুকানোর জন্য মোটা দাঁতের কাঠের চিরুনি ব্যবহার করুন এবং চুলের নিচ থেকে জট ছাড়ানো শুরু করুন। চুল পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার, কার্লার বা কোনো ধরনের রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট (যেমন: কালারিং বা রিবন্ডিং) করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।

ভেতর থেকে সুস্থতা বজায় রাখতে

ত্বক ও চুলের বাহ্যিক যত্ন কেবল তখনই কাজ করবে, যখন শরীর ভেতর থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাবে। জ্বর-পরবর্তী দুর্বলতা কাটাতে খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ নজর দিতে হবে।

ভিটামিন সি ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট

লেবু, আমলকী, পেয়ারা, কমলা ও মাল্টার মতো ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফলমূল বেশি করে খান। এটি ত্বকের কোলাজেন তৈরি করতে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার

চুল মূলত ‘কেরাটিন’ নামের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। তাই নতুন চুল গজাতে ও ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম, মুরগির মাংস, মাছ, ডাল ও বাদাম রাখুন।

প্রচুর তরল

দিনে অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করুন। এর পাশাপাশি ডাবের পানি, ঘরে তৈরি তাজা ফলের রস, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা স্যালাইন ও পাতলা স্যুপ খান। এগুলো শরীরকে রিহাইড্রেট করে ত্বকের ভেতরের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনবে।

সর্দিজ্বর-পরবর্তী ত্বক ও চুলের এই সমস্যাগুলো সাময়িক। শরীর পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং নিয়মিত সঠিক পরিচর্যা করলে সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে ত্বক ও চুল আবার আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তবে যদি তিন মাস পার হওয়ার পরও অতিরিক্ত চুল পড়া বন্ধ না হয় কিংবা ত্বকে তীব্র অ্যালার্জি বা র‍্যাশ দেখা দেয়, তবে একজন ত্বকবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সূত্র: টাইপোলজি, ডেলমেডস ও অন্যান্য

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত