Ajker Patrika

পর্তুগালের অদ্ভুত ৬ গ্রামে পাথরের তৈরি ঘর

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
পর্তুগালের অদ্ভুত ৬ গ্রামে পাথরের তৈরি ঘর
প্রায় ৭৬০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত মধ্যযুগীয় রূপকথার গ্রাম সোরেলহা। ছবি: সংগৃহীত

ছবি বা সিনেমার সেটে আমরা প্রায়ই অদ্ভুত সব ঘরবাড়ি দেখে থাকি। মানুষের হাতের ছোঁয়া আর প্রকৃতির কারুকাজ। এই দুয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলো মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করে। পর্তুগালে এমন কিছু গ্রাম আছে, দেখে মনে হবে স্থাপত্যশিল্প ও প্রকৃতির মাঝে যেন এক অদৃশ্য বোঝাপড়া রয়েছে। পাহাড়ের খাদে ঝুলে থাকা কিংবা বিশালাকার গ্রানাইট পাথরের নিচে আটকে থাকা এসব গ্রামে ঢুকলে মনে হতে পারে, আপনি রূপকথার কোনো পাথুরে রাজ্যে চলে এসেছেন। তেমন গ্রামগুলো সম্পর্কে ঝটপট জেনে নেওয়া যাক—

মনসান্টো: মাথার ওপর শত টনের পাথর

পর্তুগালের কাস্টেলো ব্রাঙ্কো অঞ্চলের এক পাহাড়ের ওপর অবস্থিত মনসান্টো গ্রাম। এর ইতিহাস বহু প্রাচীন। রোমান, ভিসিগথ ও মুসলিম শাসনামলে কৌশলগত প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হতো এই পাহাড়ি দুর্গম জায়গা। লোককথা অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে এখানকার বাসিন্দারা দীর্ঘ সাত বছর ধরে রোমান বাহিনীর অবরোধ সফলভাবে প্রতিরোধ করেছিল। পরে বারো শতকে সেই এলাকার প্রধান গালদিম পাইস পাহাড়ের চূড়ায় একটি দুর্গ ও প্রাচীর তৈরি করা হয়। চূড়ায় দুর্গ গড়ে তোলার পর পর নিচের বাসিন্দারাও ঠিক একইভাবে প্রথাবিরোধী এক উপায়ে বাড়িঘর বানানো শুরু করেছিল। এখানে বড় বড় গ্রানাইট পাথর সরিয়ে ঘর বানানো হয়নি। পাথরের খাঁজেই দেয়াল আর ছাদ বানিয়ে নেওয়া হয়েছে।

১৯৩৮ সালে এক প্রতিযোগিতায় মনসান্টো ‘পর্তুগালের সবচেয়ে পর্তুগিজ গ্রাম’ খেতাব লাভ করেছিল। ছবি: সংগৃহীত
১৯৩৮ সালে এক প্রতিযোগিতায় মনসান্টো ‘পর্তুগালের সবচেয়ে পর্তুগিজ গ্রাম’ খেতাব লাভ করেছিল। ছবি: সংগৃহীত

এখানকার কিছু ঘরকে রসিকতা করে ‘এক-টালির ঘর’ বলা হয় কেন, জানেন? কারণ, একটি বিশাল পাথরই সেই ঘরের একমাত্র চাল বা ছাদ। গ্রামটি ধরে হাঁটার পথে চোখে পড়বে মানুয়েলিন শৈলীর আকর্ষণীয় প্রবেশদ্বার, পুরোনো ম্যানর হাউস এবং চৌদ্দ শতকে নির্মিত তোরে দে লুকানো বা ঘড়ির টাওয়ার। সেদিকে তাকালেই চোখে পড়বে একটি রুপালি মোরগ। ১৯৩৮ সালে এক প্রতিযোগিতায় মনসান্টো ‘পর্তুগালের সবচেয়ে পর্তুগিজ গ্রাম’ খেতাব লাভ করেছিল। সেই ট্রফির প্রতীক হিসেবে এই মোরগকে টাওয়ারে স্থাপন করা হয়।

বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের কাছে এই গ্রাম চেনা লাগতে পারে। কারণ, এইচবিও চ্যানেলের একটি জনপ্রিয় সিরিজ ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’-এর কাল্পনিক দৃশ্যপট তৈরির জন্য ২০২১ সালে মনসান্টো দুর্গ এবং এর আশপাশের এলাকায় শুটিং করা হয়েছিল।

সোরেলহা: সময়ে থমকে যাওয়া পাথুরে দুর্গ

প্রায় ৭৬০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত মধ্যযুগীয় রূপকথার গ্রাম সোরেলহা। গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন দুর্গ। যেসব গ্রামের ইতিহাস শত বছরের পুরোনো, সেখানে তো রূপকথা থাকবেই! সোরেলহার অদ্ভুত সব গ্রানাইট পাথরের খাঁজে লুকিয়ে আছে এক নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প। কিংবদন্তি আছে, পর্তুগিজ পুনর্দখল যুদ্ধের সময় এখানকার স্থানীয় গভর্নরের এক রূপসী কন্যা প্রেমে পড়েন এক তরুণ মুর-এর। তাঁদের এই নিষিদ্ধ প্রেম মেনে নিতে পারেননি কন্যার মা। তিনি তাঁদের একান্তে চুম্বনরত অবস্থায় দেখতে পেয়ে অভিশাপ দেন। বিশ্বাস করা হয়, মায়ের অভিশাপে সেই প্রেমিক যুগল তাৎক্ষণিক পাথরে রূপান্তরিত হয়ে যান। আজও সোরেলহায় ঢুকলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বিশালাকার শিলাখণ্ড চোখে পড়ে, যাকে স্থানীয়রা বলেন অমর চুম্বনের পাথর।

সোরেলহার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো, প্রতিবছর আয়োজিত মধ্যযুগীয় মেলা মুরালহাস কম হিস্তোরিয়া। পর্তুগালের অন্যতম সুন্দর এই মেলায় অংশ নিতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক ছুটে যান সেখানে। মধ্যযুগীয় পোশাক, খাবার ও ঐতিহ্যে সেজে ওঠে পুরো গ্রাম। গ্রামটিতে ভ্রমণের নিয়ম হলো, গাড়ি রেখে প্রবেশ করতে হবে হেঁটে।

আজেনহাস দো মার: খাদের ওপর ঝুলন্ত সাদা বাড়ি

আটলান্টিক মহাসাগরের একদম গা ঘেঁষে পাহাড়ের খাঁড়া ঢালে ঝুলছে আজেনহাস দো মার। ছবি: সংগৃহীত
আটলান্টিক মহাসাগরের একদম গা ঘেঁষে পাহাড়ের খাঁড়া ঢালে ঝুলছে আজেনহাস দো মার। ছবি: সংগৃহীত

আটলান্টিক মহাসাগরের একদম গা ঘেঁষে পাহাড়ের খাঁড়া ঢালে ঝুলছে আজেনহাস দো মার। লিসবন ও সিনত্রার কাছে অবস্থিত গ্রামটির নামের অর্থ সমুদ্রের জলকল। একসময় এখানকার তীব্র স্রোত কাজে লাগিয়ে জলকল বা ওয়াটার মিল চালানো হতো।

এখানে পাহাড়ের উঁচু খাঁজ থেকে সারিবদ্ধ সাদা ধবধবে বাড়িগুলো যেন গড়িয়ে সমুদ্রের দিকে নামছে। সমুদ্রের একদম কাছে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে একটি সুইমিংপুল। সমুদ্রের ঢেউ আর পাহাড়ের ওপর ঝুলন্ত বাড়ির এই দৃশ্যকে পুরো পর্তুগালের অন্যতম আইকনিক ও আকর্ষণীয় দৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। একসময় এগুলো শুধু জেলেদের ঘরবাড়ি থাকলেও পরে ধনাঢ্য পর্তুগিজদের সামার হোমে পরিণত হয়। ছোট্ট এই গ্রামে ঘুরে বেড়াতে ৩০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না।

পেনা: পাহাড়ের কোলে ছোট্ট গ্রাম

পেনা নামে এই গ্রামের বাড়িঘরের দেয়াল থেকে শুরু করে চাল পর্যন্ত সব তৈরি হয়েছে স্থানীয় শিস্ট পাথর দিয়ে। ছবি: সংগৃহীত
পেনা নামে এই গ্রামের বাড়িঘরের দেয়াল থেকে শুরু করে চাল পর্যন্ত সব তৈরি হয়েছে স্থানীয় শিস্ট পাথর দিয়ে। ছবি: সংগৃহীত

সেরা দা লাউসা পর্বতমালার মাঝে লুকিয়ে আছে আলদিয়া দা পেনা নামের একটি ছোট্ট গ্রাম। উপত্যকার একদম গভীরে নেমে গেলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এই গ্রামের সৌন্দর্য। সেখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো শিস্ট বা বিশেষ ধরনের রূপান্তরিত শিলা। এই গ্রামের বাড়িঘরের দেয়াল থেকে শুরু করে চাল পর্যন্ত সব তৈরি হয়েছে স্থানীয় শিস্ট পাথর দিয়ে। এখানে গ্রামের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে স্ফটিক-স্বচ্ছ পানির পাহাড়ি ঝরনা বা নদী। চারপাশের পাহাড়ের রুক্ষ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এই গ্রাম ট্রেকিং বা প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর জন্য একেবারে আদর্শ।

ফাজাও: কোলাহলহীন নির্জন পাথুরে রাজ্য

ফাজাও গ্রামে পাহাড়গুলো যেন প্রহরীর মতো পাহারা দিয়ে রাখে চারপাশের ঘরবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত
ফাজাও গ্রামে পাহাড়গুলো যেন প্রহরীর মতো পাহারা দিয়ে রাখে চারপাশের ঘরবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

সেইরা উপত্যকার ওপরে অবস্থিত ফাজাও গ্রামটি পর্যটকদের কোলাহল থেকে বেশ দূরে এবং শান্ত। এর ঠিক ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে পেনেদোস দে ফাজাওয়ের খাঁড়া ও রোমাঞ্চকর পাথুরে পাহাড়। সেখানকার শিস্ট পাথরের ঘরগুলোতে কয়েক শতক ধরে জীবন চলছে অত্যন্ত ধীর ও শান্ত ছন্দে। ফাজাও গ্রামে পাহাড়গুলো যেন প্রহরীর মতো পাহারা দিয়ে রাখে চারপাশের ঘরবাড়ি। যাঁরা ক্লাইম্বিং বা পর্বতারোহণ করতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এই পাহাড়ের চূড়া থেকে চারপাশের ভিউ এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে সারা জীবনের জন্য। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে গ্রামটিতে ব্যাপক সংস্কারকাজ শুরু হয়। গ্রামের ঐতিহ্য রক্ষায় সাধারণ বাসিন্দারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন এবং আধুনিক কৃত্রিম অংশগুলো ভেঙে ঐতিহ্যবাহী শিস্ট শৈলীতে গ্রামটিকে পুনর্নির্মাণ করেন।

পিওদাও: পাহাড়ের কোলজুড়ে গ্যালারি

পিওদাও গ্রামের সবচেয়ে রহস্যময় ও বৈচিত্র্যময় দিক হলো এর ধূসর শিস্ট পাথরের বাড়িগুলোর দরজা ও জানালা।  ছবি: সংগৃহীত
পিওদাও গ্রামের সবচেয়ে রহস্যময় ও বৈচিত্র্যময় দিক হলো এর ধূসর শিস্ট পাথরের বাড়িগুলোর দরজা ও জানালা। ছবি: সংগৃহীত

সেরা দো আসোর পর্বতের ঢালে তৈরি পিওদাও গ্রামটিকে দূর থেকে দেখে মনে হবে পাথরের তৈরি এক বিশালাকার নাট্যমঞ্চ বা গ্যালারি। ১৯৭৮ সালে পিওদাও গ্রামটিকে পাবলিক ইন্টারেস্ট মনুমেন্ট হিসেবে ঘোষণা করে বিশেষ সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়। পাহাড়ের খাঁজে থরে থরে সাজানো এখানকার শিস্টের তৈরি ঘরগুলো। পিওদাও গ্রামের সবচেয়ে রহস্যময় ও বৈচিত্র্যময় দিক হলো এর ধূসর শিস্ট পাথরের বাড়িগুলোর দরজা ও জানালা। পুরো গ্রামের সব বাড়ির দরজা-জানালা গাঢ় নীল রঙে রাঙানো। এর কারণ আজও অজানা। এই অঞ্চলে আজও ঐতিহ্যবাহী উপায়ে মধু সংগ্রহের প্রচলন রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি, ইএনভলস, আউটলুক ট্রাভেলার ও অন্যান্য

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত