Ajker Patrika

ফিলিপাইনের সিকিহোর দ্বীপে

হোসেন শরীফ
ফিলিপাইনের সিকিহোর দ্বীপে

মেয়েটি এল সন্ধ্যাবেলায়। বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ের ঢালে বনের ভেতরে আমাদের হোস্টেল। চারপাশে গাছপালা দিয়ে আবৃত ছোট ডরমিটরি। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। হোস্টেলের বারান্দায় বসে বনে সন্ধ্যাবেলার বৃষ্টি দেখছিলাম। গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটার টপটপ শব্দ শুনতে দারুণ লাগছে। ধীরে ধীরে বনের ভেতর অন্ধকার নেমে আসছে। আমার মাথার ওপর একটা হলুদ আলোর বাতি জ্বলছে। কয়েকটা পোকা তার চারপাশে উড়ছে। একটা উঁচু টুলে বসে আমি মোবাইল ফোনে কথা বলছিলাম বন্ধুর সঙ্গে। জায়গাটি ফিলিপাইনের মধ্য ভিসায়াস অঞ্চলের সিকিহোর দ্বীপ।

আমাদের হোস্টেল ম্যানেজার গ্রেইস তাকে বিছানা বুঝিয়ে দিলেন। জায়গা হলো আমার বিছানার পাশেই। সে ভেজা জামাকাপড় খুলে রুমে ছড়িয়ে দিল। তার অনাবৃত পিঠে একটা কচ্ছপের ট্যাটু। সুগঠিত মসৃণ পা। গোড়ালির ওপরে একটা তারা। আমার দিকে কোমলভাবে তাকিয়ে বলল, ‘আমার নাম আন্তানেল্লা। ইতালি থেকে এসেছি।’

আন্তানেল্লা বলল, আমার জন্ম হয়েছে অ্যারিটজো নামের ছোট এক শহরে। মধ্য ইতালির তাসকানি অঞ্চলে। ঢেউখেলানো পাহাড়, আঙুরখেত আর মধ্যযুগীয় পুরোনো সব বাড়ি। রাস্তার পাশে ছোট কফি শপ। জলপাইগাছ। মদ তৈরির কারখানা। এটি ফ্লোরেন্স থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে আজও মধ্যযুগীয় গ্রামীণ জীবন স্থির হয়ে আছে। একটু থেমে আবার সে বলল, সেখানে পুরোনো পাথুরে রাস্তায় মাইকেল এঞ্জেলো, লেওনার্দো দা ভিঞ্চি যেন হেঁটে চলেছেন অবিরাম। সুনীল আকাশের নিচে পিয়েরো দেল্লা ফ্রানচেস্কা ছবির ক্যানভাস খুলে রেখেছেন আজও।

বৃষ্টিভেজা রাস্তা। কোথাও কোনো কাদা নেই। জমে থাকা পানি নেই। আমি আর আন্তানেল্লা বনের বাড়ি থেকে ধীরে ধীরে বড় রাস্তায় উঠে এসেছি। কালো পিচঢালা পথ। বৃষ্টি থেমেছে। চারপাশে স্নিগ্ধতা। ঠান্ডা বাতাসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা ভেসে বেড়াচ্ছে। নিশ্বাস নিলে বুকের ভেতর ঠান্ডা ও প্রশান্তিদায়ক অনুভূতি দেয়। বাতাসে বৃষ্টি ও সাগরের নোনা গন্ধ।

রাত গভীর হয়নি। কিন্তু কোথাও মানুষ নেই। সবাই স্টোর, মদের দোকান, কফি শপ বন্ধ করে ঘুমোতে চলে গেছে। আমরা হেঁটে হেঁটে ভেতরে এসে একটা দোকান থেকে ব্রেড, ডিম আর দুধ কিনে নিলাম। ফ্রেন্স টোস্ট হবে ডিনারে আজ রাতে।

পরের দিন সকালে আমরা বের হলাম। স্কুটির পেছনে বসে আছি আমি। চালাচ্ছে আন্তানেল্লা। উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা। পাহাড়ের ঢালে ধান আর ভুট্টাখেত। নারকেলগাছের সারিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে পেছনে। আন্তানেল্লা পরেছে একটা খয়েরি রঙের লং হাওয়াইন শার্ট। বোতামগুলো খোলা। বাতাসে তার শার্ট উড়ছে। আন্তেনেল্লার শার্ট থেকে সুঘ্রাণ আসছে। পাহাড়ের উঁচু থেকে অনেক দূর পর্যন্ত সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। হালকা বাতাসের সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টির ছাট বেশ ভালো লাগছে। না থেমে আমরা চলে এলাম একটা পুরোনো বটগাছের নিচে। তার নিচে একটা প্রশস্ত কুয়া। চারপাশ পাথরে বাঁধাই করা। পানিতে মাছে ভরা। লাল, কমলা কার্প-জাতীয় মাছ। সঙ্গে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট মাছ। এটা মূলত একটা ফিশ স্পা। পানিতে পা ডুবিয়ে বসলে মাছ এসে ঠোকর দেয় পায়ের পাতায়। সুড়সুড়ি ও আরাম লাগে।

এখানে বৃষ্টিটা থেমে গেছে। স্কুটি পার্ক করে, টিকিট কেটে আমরা পাথরের সিঁড়ির পানিতে পা ভিজিয়ে বসলাম।

দুপুরের পরে আমরা ঝরনা দেখতে গেলাম। কয়েক স্তরবিশিষ্ট একটা ঝরনা। পানির রং ফিরোজা, তবে বেশ ঠান্ডা। পাহাড় থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। একটা প্রাকৃতিক জ্যাকুজি। মেয়েরা বিকিনি পরে সাঁতার কাটছে। ছেলেরা লাফিয়ে পড়ছে নিচে। সবাই আনন্দিত। আমিও লাফিয়ে পড়লাম। পরে আমরা হোস্টেলে ফিরে এলাম বিকেলে।

পরদিন বিকেলবেলায় আমরা চলে গেলাম সমুদ্রের পাড়ে। সুলু সাগর। সীমাহীন বিস্তৃত নীল জলরাশি। বুকে জেগে আছে হাজার হাজার দ্বীপ। ঘন সবুজ। তরু লতা-পাতা-পল্লবে আবৃত। ধবধবে সাদা বালুর সৈকত। নারকেলগাছের ছায়া পড়েছে আমাদের ওপর। পা ছড়িয়ে আমরা বসে আছি সাদা বালুর ওপর। আন্তেনেল্লা আমার ডান পাশে। সে ব্যাগ থেকে একটা আপেল আর কমলা বের করল। আমাকে জিজ্ঞেস করল, ম্যাগস, তুমি কোনটা খাবে?

আমি বললাম, কমলা। আন্তেনেল্লা আপেল নিল। বালুতে অনেক পিঁপড়া একটা মিষ্টি-জাতীয় খাবার নিয়ে হুড়োহুড়ি করছে। সে তাকিয়ে আছে পিঁপড়ার দলের দিকে। পড়ন্ত বিকেলে সমুদ্রে মিষ্টি বাতাস। মাথার ওপরে নারকেলপাতার শনশনানি। আমরা ধীরে ধীরে নীল পানিতে পা ভিজিয়ে দিলাম। হাঁটুপানি। তারপর কোমরসমান পানিতে এসে দাঁড়ালাম আমি। পানি বেশ উষ্ণ। আরামদায়ক। খুব স্বচ্ছ। এমনকি কয়েক মিটার পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। ঢেউ এসে আমাদের তরঙ্গের মতো দুলিয়ে দিচ্ছে। আন্তেনেল্লা সাঁতার কাটার চেষ্টা করছে। লবণের ঘনত্বের জন্য ভেসে থাকা খুব সহজ। আমরা দুজনে পাশাপাশি ভাসছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নামের মানে কী? আন্তেনেল্লা বলল, ছোট ফুল। আন্তে মানে ছোট, নেল্লা মানে ফুল। ছোটবেলা থেকে আমার মা এই নামে ডাকেন।

WhatsApp-Image-2026-07-29-at-4.49

মানচিত্র থেকে আন্তেনেল্লাকে আমার গ্রাম দেখালাম, আমার ছেলেবেলার দিনগুলো যেখানে কেটেছে। ভরা বর্ষা, স্নিগ্ধ বৃষ্টি আমাকে কেমন প্রাণ দিয়েছে। বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় জানালার পাশে বসে আমি আনমনা হয়েছি। ডুবে যাওয়া ধানখেতে কই মাছের লাফিয়ে লাফিয়ে ঘাসফড়িং ধরতে দেখেছি। চারপাশে ডুবু-ডুবু গ্রামে বর্ষায় আমি বন্দী ছিলাম। বাঁশের সাঁকো পার হয়ে স্কুলে গিয়েছি। কত সন্ধ্যায় আমার জ্বর এসেছে আবার পেটব্যথা হয়েছে।

শীতের কুয়াশামাখা সকালবেলায় আমি সরিষাখেতের মাঠ পেরিয়ে কীভাবে স্কুলে গিয়েছি। হলুদ ফুলের ওপর মৌমাছিরা কানে কানে কী কথা বলে, আমি খেতের আলে বসে তা শুনেছি। শরতের নীল আকাশ আমাকে কীভাবে উদাসীন করে তুলেছে। কলাগাছের ভেলায় ভেসে ভেসে আমি কচুরিপানার ফুল তুলে এনেছি। লাল শাপলা গলায় পেঁচিয়ে রাজা সেজেছি। সন্ধ্যারাতের ঝিঁঝি পোকার আলোয় পথ দেখে প্রতিবেশীদের বাড়িতে টেলিভিশন দেখতে গিয়েছি। সে বিস্ময়ে চোখ বড় করে বলল, তোমাদের গ্রামের রাত কি সত্যিই এত অন্ধকার হতো?

প্রতিদিন আমরা দুই বেলা ঘুরতে যাই। সৈকতে, ঝরনায় অথবা শুধু ড্রাইভে। মাঝে মাঝে বাজার করতে যাই। ফিরে এসে রান্না করি—চিকেন তিনলা, স্প্যাগেটি, ফ্রেন্স টোস্ট, সাদা ভাত, স্যার্ডিন মাছ। সে লক্ষ্মীমেয়ের মতো সব এশিয়ান খাবার খাচ্ছে। মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে না একেবারে। কোনো কিছুতে তার আপত্তি নেই। মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা। আগ্রহ, উচ্ছ্বাস, শ্রদ্ধা তার চোখে, চেহারায়। আমার থেকে সে ভালো ড্রাইভ করে। আমি তার পেছনে বসে থাকি প্রায়ই। দিন যাচ্ছে। বনের ভেতরে আমাদের খুব ধীরে সকাল হয়। মোরগের ডাকে ডরমিটরির দরজা খুলে দেখি, বাইরে আমাদের কাপড় ঝুলছে রশিতে।

আজ সকালে আন্তেনেল্লা একাই স্কুটি নিয়ে চলে গেল। আবার ফিরে এল দুপুরের আগে। খুব আনন্দিত আর উচ্ছ্বাস নিয়ে আমাকে ডেকে বলল, দেখো কী এনেছি! একটা কার্টনের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ফুটফুটে বিড়ালছানা, খুব ছোট। মুরগির বাচ্চার মতো লোমশ। আমাকে বলল, একে পথে আমি একা ফেলে আসতে পারিনি। কাঁদছিল খুব। আমি জানি, আমরা ট্রাভেলার। আমাদের নিজেদের থাকার জায়গা নেই; তারপরেও।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত