Ajker Patrika

ফাইবারম্যাক্সিং থেকে স্লিপম্যাক্সিং: নিখুঁত হওয়ার প্রতিযোগিতা কতটুকু নিরাপদ

ফিচার ডেস্ক
ফাইবারম্যাক্সিং থেকে স্লিপম্যাক্সিং: নিখুঁত হওয়ার প্রতিযোগিতা কতটুকু নিরাপদ
জীবনের কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অপটিমাইজ বা নিখুঁত করাই হলো ম্যাক্সিং ট্রেন্ডের মূল উদ্দেশ্য। ছবি: পেক্সেলস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আত্ম-উন্নয়ন বা লাইফস্টাইলের যেকোনো অভ্যাসের পেছনে ‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি যুক্ত করার এক অদ্ভুত প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানোকে বলা হচ্ছে ‘বুকসম্যাক্সিং’। ফাইবারযুক্ত খাবার বেশি খাওয়াকে ‘ফাইবারম্যাক্সিং’। চেহারার আকর্ষণ বৃদ্ধিতে ‘লুকসম্যাক্সিং’, কিংবা একটু স্বস্তির জন্য ‘রিল্যাক্সম্যাক্সিং’। মোদ্দাকথা, জীবনের কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অপটিমাইজ বা নিখুঁত করাই হলো এই ম্যাক্সিং ট্রেন্ডের মূল উদ্দেশ্য। গ্লোবাল ওয়েলনেস ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ওয়েলনেস বা স্বাস্থ্য-কল্যাণমূলক বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বাজারের এই তুমুল জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডও ঝুঁকছে হাই-ফাইবার খাবার বা স্লিপ-অ্যাট্রিবিউট পণ্যের দিকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জীবনের সবকিছুকে এভাবে 'ম্যাক্স' করতে যাওয়া কি আদতে স্বাস্থ্যের ভালো করছে, নাকি নতুন বিপদ ডেকে আনছে?

গবেষক ও মানস বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। ইউকে-ভিত্তিক মনস্তত্ত্ববিদ বিলি ডানলেভি এবং নিউইয়র্কের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট জেনিফার হার্টস্টাইনের মতে, স্বাস্থ্যের উন্নতি করার ইচ্ছা থাকা নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু ম্যাক্সিং ট্রেন্ডের ভেতরে একধরনের অবাস্তব ‘পারফেকশনিজমে’র প্রবণতা কাজ করে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর।

পুষ্টিতে ‘ম্যাক্সিং’: অতিরিক্ত নাকি সঠিক পরিমাপ

'প্রোটিনম্যাক্সিং' এবং 'ফাইবারম্যাক্সিং'-এর ক্ষেত্রে মানুষ ব্যাকুল হয়ে খাবারে এগুলোর পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমেরিকানদের জন্য সাম্প্রতিক ডায়েটারি গাইডলাইন অনুযায়ী, অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে ফাইবার ও প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। 'এন্টায়ারলি নারিশড'-এর প্রিভেনটিভ কার্ডিওভাসকুলার ডায়েটিশিয়ান মিশেল রুথেনস্টাইনের মতে, পুষ্টি সব সময় বয়সের চাহিদা ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করা উচিত। হঠাৎ অতিরিক্ত ফাইবার খেলে পেট ফাঁপা, গ্যাস ও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত প্রোটিন খেলে শরীরে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার (যেমন ভিটামিন বা কার্বোহাইড্রেট) গ্রহণের সুযোগ কমে যায় এবং পানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

স্লিপম্যাক্সিং এবং 'অর্থোসমনিয়া'র ঝুঁকি

ঘুমের মান বাড়াতে ব্ল্যাকআউট কার্টেন, ট্র্যাকারের মতো প্রযুক্তি কিংবা 'মাউথ টেপিং'-এর শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেকেই। ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন অনুযায়ী, পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার মূল চাবিকাঠি। তবে স্নায়ু বিশেষজ্ঞ ড. অ্যাডাম মেডনিক সতর্ক করে জানান, ঘুম ট্র্যাকিং ডিভাইসের স্কোরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা উল্টো দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। ঘুমে অনিদ্রাকে কেন্দ্র করে জন্ম নেওয়া এই নতুন উদ্বেগের নাম ‘অর্থোসমনিয়া’। তা ছাড়া শ্বাসনালিতে বাধা থাকলে মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুমানো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

'প্রোটিনম্যাক্সিং' এবং 'ফাইবারম্যাক্সিং'-এর ক্ষেত্রে মানুষ ব্যাকুল হয়ে খাবারে এগুলোর পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ছবি: পেক্সেলস
'প্রোটিনম্যাক্সিং' এবং 'ফাইবারম্যাক্সিং'-এর ক্ষেত্রে মানুষ ব্যাকুল হয়ে খাবারে এগুলোর পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ছবি: পেক্সেলস

ফার্টিলিটিম্যাক্সিং বা স্পার্মম্যাক্সিং

সোশ্যাল মিডিয়ায় পুরুষের প্রজননক্ষমতা বাড়াতে কাঁচা রসুন খাওয়া, টেস্টিকল আইস বাথ কিংবা মেল রোদে পোড়ানোর মতো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের মেল রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনের পরিচালক ড. ফিলিপ ওয়ার্থম্যানের মতে, মেইন স্ট্রিম চিকিৎসা জগতে পুরুষ প্রজনন স্বাস্থ্য অবহেলিত থাকায় তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের ভুল তথ্যের শিকার হচ্ছেন। টেস্টিকল ট্যানিংয়ের মতো অবৈজ্ঞানিক অভ্যাস উল্টো শুক্রাণুর সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে।

কেন বাড়ছে এই প্রবণতা, জানুন মুক্তির উপায়

বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অনিশ্চয়তা এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ফোকাস করা মানুষকে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বা স্থায়িত্বের অনুভূতি দেয়। কিন্তু এই প্রবণতা মানুষকে বিষণ্নতা, বডি ডিসমর্ফিয়া (শরীরের গঠন নিয়ে হীনম্মন্যতা) এবং সীমাহীন দুশ্চিন্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নিজের লক্ষ্যের দিকে অন্ধের মতো না ছুটে কিছু প্রশ্ন নিজেকে করুন,

-আপনি যা করছেন, তা কি অন্য কেউ না দেখলেও নিজের আনন্দের জন্য করবেন?

-কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পুরোপুরি পূরণ না হলেও কি আপনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন?

উন্নতি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, তবে তা যেন নিজস্ব স্বাভাবিক ছন্দের বাইরে গিয়ে জীবনকে একটি দমবন্ধ করা প্রতিযোগিতায় পরিণত না করে। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস সেটাই, যা থেকে প্রয়োজনবোধে কিছুদিন বিরতি নেওয়া যায়।

সূত্র: হেলথ লাইন, সিএনবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত