Ajker Patrika

রাশা ইউসিফের ১৯৫ দেশ ভ্রমণ

মুহাম্মদ সফিকুর রহমান
রাশা ইউসিফের ১৯৫ দেশ ভ্রমণ

বাহরাইনের রাশা ইউসিফ ‘পৃথিবীর সব দেশ ঘুরে দেখা’ রোমাঞ্চকর কিন্তু কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন। ভ্রমণের সঙ্গে ফটোগ্রাফিকে সঙ্গী করে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৫টি দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। তবে রাশার ভ্রমণের গল্প শুধু দেশসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি দৃশ্যমান পরিচয়—হিজাব। রাশার কাছে হিজাব শুধু পোশাক নয়; এটি তাঁর পরিচয়, মূল্যবোধ এবং পৃথিবীর সামনে নিজেকে উপস্থাপনের একটি অংশ। বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে হিজাবকে তিনি দেখেছেন নানা রূপে।

নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে রাশা লিখেছেন, ‘আমার হিজাব কীভাবে আমি পৃথিবীর পথে চলি, নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করি এবং আমি কিসের পক্ষে দাঁড়াই—এসবকেই প্রভাবিত করে। ১৯৫টি দেশ ভ্রমণ করে আমি আরও দেখেছি, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নারীরা কত ভিন্নভাবে হিজাব পরেন।’

বিশ্বের নানা প্রান্তে ভ্রমণ করতে গিয়ে নারীদের শক্তির যে চিত্র তিনি দেখেছেন, সেটিও তাঁর কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি এমন নারীদের দেখেছি, যাঁরা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে হিজাব পরে কাজ করছেন, সন্তান বহন করছেন এবং এমন শারীরিক পরিশ্রম করছেন, যা অধিকাংশ মানুষকেই ক্লান্ত করে ফেলবে। হিজাব থাকুক বা না থাকুক, নারীরা শক্তিশালী।’

রাশার বক্তব্যে তাই হিজাব কোনো সীমাবদ্ধতার প্রতীক নয়; বরং এটি তাঁর যাত্রার সঙ্গে থাকা একটি পরিচয়।

ক্যামেরা থেকে বিশ্বভ্রমণ

রাশার ভ্রমণের গল্পের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ফটোগ্রাফি। একটি আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলন কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, শিকাগো ও ওয়াশিংটন ডিসি ভ্রমণের সময় তাঁর হাতে আসে প্রথম ক্যামেরা। সেই ক্যামেরাই পরবর্তী সময়ে তাঁর পৃথিবী দেখার অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে।

২০১৬ সালে বাহরাইনের ‘আল-ওয়াসাত’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশা জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন ফটোগ্রাফি কর্মশালা এবং প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ভ্রমণের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। তখনই তিনি বুঝতে শুরু করেন, পৃথিবীকে শুধু পর্যটকের চোখে নয়, একজন আলোকচিত্রীর চোখেও দেখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে এক দেশের পর আরেক দেশ ঘুরেছেন। নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন গল্প—সবকিছুই জায়গা করে নেয় তাঁর ক্যামেরায়।

২০২৪ সালের অক্টোবরে বাহরাইনের ‘বিজ বাহরাইন’ তাঁকে বিশ্বের সব দেশ ভ্রমণকারী প্রথম বাহরাইনি হিসেবে উল্লেখ করে। প্রতিবেদনে তাঁর ১২ বছরের ভ্রমণযাত্রার কথা বলা হয়। এই দীর্ঘ যাত্রার শেষ পর্যায়টিও সহজ ছিল না। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়ে তাঁকে নিজের অনলাইন কমিউনিটির সহায়তা নিতে হয়েছিল। নিজের তোলা ছবির প্রিন্ট বিক্রি করেও তিনি ভ্রমণের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। অর্থাৎ রাশার বিশ্বভ্রমণ শুধু বিমানের টিকিট, হোটেল আর পাসপোর্টের গল্প নয়। এর সঙ্গে ছিল পরিকল্পনা, সংগ্রাম, অর্থসংকট এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি অটুট বিশ্বাস।

পৃথিবী দেখার সঙ্গে মানুষকে দেখাও

রাশার কাছে ভ্রমণ মানে শুধু নতুন একটি দেশের বিখ্যাত স্থাপনা দেখা নয়। একজন আলোকচিত্রী হিসেবে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি। বিভিন্ন দেশে গিয়ে মানুষের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তাও হয়েছে; বিশেষ করে হিজাব নিয়ে মানুষের কৌতূহল অনেক সময় তাঁকে নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে।

সংখ্যার চেয়ে বড় যে গল্প

এ বছরের একটি লেখায় রাশা ১৯৫টি দেশে ভ্রমণের কথা উল্লেখ করেছেন। আবার পরবর্তী একটি সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বেশি সংখ্যার কথা বলেছেন। তাই তাঁর ভ্রমণ করা বর্তমান মোট দেশের সংখ্যা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সরাসরি তাঁর কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া নিরাপদ। তবে সংখ্যার এই পার্থক্য তাঁর মূল কৃতিত্বকে ছোট করে না। ১৯৫ হোক কিংবা পরবর্তী সময়ে তাঁর উল্লেখ করা আরও বড় সংখ্যা—এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ভ্রমণ, অসংখ্য সীমান্ত অতিক্রম, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং নিজের পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীকে দেখার সাহস। রাশার গল্প তাই শুধু একজন ভ্রমণকারীর গল্প নয়, এটি এক নারীর নিজের পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীকে আবিষ্কারের গল্প।

সূত্র: ভোগ সিঙ্গাপুর, বিজ বাহরাইন, উম্যান দিস মান্থ, রাশা ইউসিফ ডট কম

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত