Ajker Patrika

তাঁবু সাজিয়েই রমজানের আমেজ এনেছে গাজাবাসী

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১: ০৯
তাঁবু সাজিয়েই রমজানের আমেজ এনেছে গাজাবাসী
গাজা উপত্যকায় ধ্বংসস্তূতের মাঝে আশ্রয়শিবিরের তাঁবুতে শিশুদের ঈদ আনন্দের প্রস্তুতি চলছে। ছবি: 'আল জাজিরা'য় প্রকাশিত ছবি থেকে এআই দিয়ে তৈরি।

টানা দুই বছরের বিধ্বংসী যুদ্ধ আর বাস্তুচ্যুতির ক্ষত নিয়ে ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডে শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান মাস। গত ১০ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া ‘যুদ্ধবিরতি’র প্রভাবে এবারের রমজানের পরিস্থিতি বিগত দুই বছরের তুলনায় কিছুটা শান্ত। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, স্বজন হারানোর শোক আর চরম অনিশ্চয়তা থাকলেও গাজাবাসী এবার তাদের অস্থায়ী আশ্রয়স্থল বা তাঁবুগুলোকে সাজিয়ে তোলার মাধ্যমে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের এই ঘর সাজানোর প্রচেষ্টা শুধু সাজসজ্জা নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিরোধও বটে। আল জাজিরা অবলম্বনে লিখেছেন ফারিয়া রহমান খান

তাঁবুর জীবনে উৎসবের ছোঁয়া

আশ্রয়শিবিরের জীবন। ছবি: আল জাজিরা
আশ্রয়শিবিরের জীবন। ছবি: আল জাজিরা

মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থীশিবিরের জীর্ণ তাঁবুগুলোতে বর্তমানে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ করা যাচ্ছে। তাঁবুগুলোর বাইরে যুদ্ধের ক্ষত ও ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন থাকলেও ভেতরে ঝুলছে রঙিন কাগজ আর ছোট ছোট ফানুস। বাস্তুচ্যুত অবস্থায় এটি গাজাবাসীর কাটানো তৃতীয় রমজান। অনেক তাঁবুর কাপড়ে এখনো বুলেটের ছিদ্র বা ড্রোনের হামলার চিহ্ন স্পষ্ট। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো রঙিন ফানুস আর হাতে আঁকা নকশা দিয়ে সেই ক্ষতচিহ্ন ঢেকে উৎসবের আমেজ তৈরির চেষ্টা করছে। চরম অর্থসংকটের মধ্যেও সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে অনেক অভিভাবক কষ্টার্জিত অর্থে রমজানের লন্ঠন সংগ্রহ করেছেন। মূলত যুদ্ধের বিভীষিকা আর দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা ভুলে শিশুদের মনে রমজানের পবিত্রতা আর আনন্দ ফিরিয়ে আনাই এই ঘরোয়া সাজসজ্জার প্রধান লক্ষ্য।

অনিশ্চয়তার মাঝেও রমজানের প্রস্তুতি

অনিশ্চয়তার মাঝেও ইফতারের প্রস্তুতি। ছবি: আল জাজিরা
অনিশ্চয়তার মাঝেও ইফতারের প্রস্তুতি। ছবি: আল জাজিরা

গাজার প্রতিটি পরিবার এখন ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে এক নতুন সজীবতায় রমজানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত বছরের সংঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভিক্ষের স্মৃতি এখনো সজীব থাকলেও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী মজুত করছে। একদিকে বাজারে পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম, অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে অধিকাংশ মানুষ এখনো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। তবে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ত্রাণ হিসেবে পাওয়া সাধারণ খেজুর বা ডাল দিয়ে তারা অতিযত্নে সাজাচ্ছে ইফতারের টেবিল। এই অভাব অনটনের মাঝেও ইফতারি ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা গাজাবাসীর সামাজিক বন্ধন ও উৎসবের প্রতি পরম মমত্ববোধ প্রকাশ করে।

অচল অবকাঠামো সচলের চেষ্টা

গাজার বিদ্যুৎ, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলেও সেখানকার বাসিন্দারা অদম্য মনোবল নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। খাবার সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা না থাকলেও তারা প্রতিদিনের সীমিত সুযোগেই ইফতার ও সেহরির আয়োজন করছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তাঘাটের কারণে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হলেও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তারা একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি নিজেদের বিধ্বস্ত ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে তারা তৈরি করছে নামাজের জায়গা। ধুলোবালি মাখা সেই প্রাঙ্গণগুলো আজ শুধু ইবাদতের জায়গা নয়, বরং প্রতিকূলতা জয় করে গাজাবাসীর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার এক দৃঢ় সংকল্প।

সীমাবদ্ধতার মাঝেও জীবনের জয়গান

দের আল-বালাহ এলাকার শরণার্থীশিবিরগুলোতে বর্তমানে শোক ও আশার এক মিশ্র প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গত বছরের সংঘাতে স্বজন হারানো পরিবারগুলো প্রিয়জনদের শূন্যতা অনুভব করলেও শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে চেষ্টার কমতি রাখছেন না অভিভাবকেরা। তাঁবুর এক কোণে রান্নার জায়গা গুছিয়ে নেওয়া কিংবা অতিকষ্টে জোগাড় করা গ্যাস সিলিন্ডারটি সেহরির জন্য জমিয়ে রাখা—সবই যেন টিকে থাকার অদম্য লড়াইয়ের অংশ। তীব্র জ্বালানি সংকটে প্লাস্টিকের শিট দিয়ে লাকড়ির চুলার আগুন আগলে রাখার দৃশ্য যেমন কষ্টের, তেমনি তা প্রতিকূলতা জয়ের এক দৃঢ় প্রতিচ্ছবি। মূলত ধ্বংসস্তূপের মাঝেও এই জীবনসংগ্রাম গাজাবাসীর একতাবদ্ধ থাকা এবং জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখারই এক নিরন্তর প্রয়াস।

ধ্বংসস্তূপ আর অনিশ্চয়তার মাঝে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনিরা এখন শুধু শান্তি আর নিজের ভিটেমাটিতে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে। গাজার প্রতিটি প্রান্তে এখন একটিই চাওয়া—রমজান যেন আর নতুন কোনো সংঘাত বা দুর্ভিক্ষের বার্তা নিয়ে না আসে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত