Ajker Patrika

অর্থনৈতিক ভারসাম্যে জাকাতের ভূমিকা

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
অর্থনৈতিক ভারসাম্যে জাকাতের ভূমিকা

পবিত্র মাহে রমজান আত্মসংযম ও ইবাদতের বসন্তকাল। রমজানে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এ মাসে তাই জাকাত আদায়ের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। নবীজি (সা.) রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। তাঁর উদারতা ছিল প্রবহমান বাতাসের মতো। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করেই রমজানকে জাকাত ও সদকার মৌসুম বলা হয়। ফলে দরিদ্র মানুষ ঈদের আগে কিছুটা স্বস্তি পায়। নতুন পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে। এতে সামাজিক আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে যায়।

নামাজ, রোজা ও হজের মতোই জাকাত ইসলামের অপরিহার্য ফরজ বিধান। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে জাকাত হলো তৃতীয় এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা ধনীদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো, জাকাত প্রদান করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো, যেন তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হতে পারো।’ (সুরা নুর: ৫৬)

জাকাতের নিসাব ও পরিমাণ

নিসাব হলো জাকাতযোগ্য সম্পদের সর্বনিম্ন সীমা। সোনা-রুপা বা নগদ অর্থের ক্ষেত্রে সাধারণত ৮৭.৪৮ গ্রাম (সাড়ে সাত ভরি) সোনা বা ৬১২.৩৬ গ্রাম (সাড়ে বায়ান্ন ভরি) রুপার মূল্যের সমপরিমাণ সম্পদ থাকলে জাকাত ফরজ হয়।

সোনা-রুপা, নগদ অর্থ ও ব্যাংক ব্যালান্স, ব্যবসায়িক পণ্য, শেয়ার ও বিনিয়োগ, (নির্দিষ্ট শর্তে) গবাদিপশু এবং কৃষিজ উৎপাদনের (উশর) ওপর জাকাত ফরজ। নিজের ব্যবহারের বাসাবাড়ি, আসবাবপত্র, পোশাক বা প্রয়োজনীয় যানবাহনের জাকাত নেই। তবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে রাখা সম্পদের ওপর জাকাত প্রযোজ্য।

সাধারণ সম্পদের ক্ষেত্রে জাকাতের হার ২.৫ শতাংশ (চল্লিশ ভাগের এক ভাগ)। বছর শেষে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে মোট সম্পদের ২.৫ শতাংশ জাকাত দিতে হবে। গবাদিপশুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে বেশি পশু থাকলে সংখ্যা অনুপাতে জাকাত দিতে হয়। কৃষিজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে এগুলোর বিধান অনুযায়ী জাকাত আবশ্যক। খনিজ সম্পদ ও গুপ্তধনের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ হারে জাকাত দেওয়ার বিধান রয়েছে।

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে

আল্লাহ তাআলা সুরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে এমন আট শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যাদের জাকাত দেওয়া যাবে। জাকাত দেওয়া যাবে: এক. ফকির, যার কিছুই নেই। দুই. মিসকিন, যার আয় প্রয়োজনের তুলনায় কম। তিন. আমিল, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। চার. মুআল্লাফাতুল কুলুব, যাদের অন্তর ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা প্রয়োজন। এই শ্রেণির মানুষকে জাকাত দেওয়া ইসলামের প্রাথমিক যুগে বৈধ ছিল, পরে এই বিধান রহিত হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে তাই অমুসলিমদের জাকাত দেওয়া যাবে না। পাঁচ. দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য দাস-দাসীদের জাকাত দেওয়া। এখনকার পৃথিবীতে যেহেতু দাসপ্রথার প্রচলন নেই, তাই বর্তমান সময়ে এই খাতেও জাকাত দেওয়ার সুযোগ নেই। ছয়. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যে ঋণের চাপে জর্জরিত। সাত. মুজাহিদ, যারা আল্লাহর পথে সংগ্রামরত। আট. মুসাফির বা পথচারী, যে বিপদগ্রস্ত বা অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এই আট শ্রেণি ব্যতীত অন্য কোথাও জাকাত দেওয়া বৈধ নয়।

জাকাত আদায়ের ফজিলত

জাকাত আদায় করলে আল্লাহর রহমত পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আমার রহমত তাদের জন্য নির্ধারণ করব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং জাকাত প্রদান করে।’ (সুরা আরাফ: ১৫৬)। এ ছাড়া জাকাত আদায়ের সওয়াব আল্লাহ তাআলা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন, এর মাধ্যমে বিপদাপদ দূর হয় এবং সম্পদে বরকত হয়।

জাকাত অনাদায়ের শাস্তি

জাকাত না দেওয়ার শাস্তি ভয়াবহ। যে ব্যক্তি যথাযথভাবে জাকাত দেবে না, পরকালে তার সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে এর মাধ্যমে তাদের কপাল, পাঁজর ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। (সুরা তওবা: ৩৪-৩৫)। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি স্বীয় সম্পদের জাকাত আদায় করবে না, পরকালে তার সম্পদকে টাকমাথার সাপ বানিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। এই সাপ তার দুই চোয়ালে দংশন করবে আর বলবে, ‘আমিই তোমার সংরক্ষিত ধনসম্পদ।’ (সহিহ বুখারি: ১৪০৩)

অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় জাকাত

আধুনিক অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য একটি বড় সংকট। বিশ্বের মোট সম্পদের সিংহভাগ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে। এই বৈষম্য কমাতে রাষ্ট্র যেখানে করব্যবস্থা ও পুনর্বণ্টন নীতি ব্যবহার করে, ইসলাম সেখানে দেড় হাজার বছর আগেই একটি বাধ্যতামূলক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা চালু করেছে।

জাকাতব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি অলস সম্পদ সঞ্চয়কে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। যে ব্যক্তি সম্পদ ব্যবহার না করে শুধু জমিয়ে রাখে, তার ওপরও জাকাত প্রযোজ্য। ফলে সম্পদশালীরা স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়, এতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

জাকাতের আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা

জাকাত সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমায়। এটি সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার মাধ্যমে দরিদ্রদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। আধুনিক যুগে জাকাতকে দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর বিবেচনা করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিম বিশ্বে প্রতি বছর সম্ভাব্য জাকাতের পরিমাণ শত বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। যদি এই অর্থ সঠিকভাবে সংগ্রহ ও বিতরণ করা যেত, তাহলে মুসলিম দেশগুলো থেকে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেত। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ন্যায়পরায়ণতার উজ্জ্বল প্রতীক খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর শাসনামলে জাকাতের সুব্যবস্থাপনার ফলে এমন সময়ও এসেছিল, যখন জাকাত গ্রহণ করার মতো উপযুক্ত ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

কবি মোহন রায়হানের বাংলা একাডেমি পুরস্কার না পাওয়ার যে কারণ জানালেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

অবশেষে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া আসনে প্রার্থী ঘোষণা, কে তিনি

ফরিদগঞ্জে শৌচাগার থেকে প্রবাসীর স্ত্রীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার

দিনদুপুরে সীতাকুণ্ডে নারীর মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এআইইউবির ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত