
বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদ (১৯১৮-৭৪) এক স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বল প্রতিভার নাম। তাঁকে তাঁর কাব্যিক মিশনের কারণে সাধারণত ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাঁর কাব্যচেতনা ছিল মূলত একটি সামাজিক ও আত্মিক পুনর্জাগরণের ডাক, যেখানে ইসলামি আদর্শ ও বাঙালি মুসলিমের আত্মপরিচয় নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা এক শিল্পিত রূপ লাভ করেছিল।
এটি ছিল গভীর মননশীল সাহিত্য-আন্দোলন, যা আত্মবিস্মৃত জাতিকে তার স্বকীয়তা পুনরুদ্ধারে অনুপ্রাণিত করে।
ফররুখ আহমদের আবির্ভাবকাল ছিল বাংলার মুসলিম সমাজের জন্য এক ঘোর সংকটকাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ঔপনিবেশিক শোষণ ও মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ আত্মবিস্মৃতি—এই চতুর্মুখী অন্ধকারে কবি অনুভব করেছিলেন জাতির গভীর নিস্তব্ধতা। এই জরাগ্রস্ত ও হতাশাজনক বাস্তবতা তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি। তাঁর কবিতায় তিনি এই ঐতিহাসিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে এক বিপ্লবী দামামা বাজিয়েছেন।
কবির দৃষ্টিতে, মুসলিমদের অতীত ইতিহাস ছিল শৌর্য, বীরত্ব ও মানবতার। সেই ঐতিহ্য ভেঙে যাওয়ায় জাতির যে অধঃপতন, তা কবিকে ব্যথিত ও উদ্বেলিত করে তোলে।
তিনি উপলব্ধি করেন, এই জাতিকে জাগাতে হলে শুধু রোমান্টিকতা নয়, চাই এমন এক ‘পাঞ্জেরি’ (দিকনির্দেশক), যে অন্ধকার পেরিয়ে মঞ্জিলে পৌঁছানোর পথ দেখাবে। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪)-এর কালজয়ী কবিতা ‘পাঞ্জেরি’তে এই আর্তিই ধ্বনিত হয়:
‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলার এখনো ওঠেনি জেগে?’
এই ‘পাঞ্জেরি’ কবিতা কেবল একটি আশার বাণী নয়, বরং তা একটি জাতীয় আত্মসচেতনতার প্রতীক—যা বাঙালি মুসলিম সমাজকে তার সমৃদ্ধ অতীত ও ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির দিকে ফিরে তাকিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শেখায়। এটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার এক তীব্র ব্যাকুলতা।
রেনেসাঁর দার্শনিক ভিত্তি: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
ফররুখ আহমদের রেনেসাঁ চেতনা কেবল অতীত রোমন্থন ছিল না, বরং তা ছিল প্রাচীনকে ধ্বংস না করে পুরোনো ঐতিহ্যের ভিত্তির ওপর নতুন আদর্শ সৃষ্টি করার এক তাত্ত্বিক প্রয়াস। তাঁর চিন্তা ছিল আল্লামা ইকবালের মতো, যিনি পতনোন্মুখ মুসলিমদের মধ্যে আত্মমর্যাদা ও নতুন জীবনবোধ সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। ফররুখ বিশ্বাস করতেন, ইসলামের আদর্শই মানবমুক্তি, স্বাধীনতা ও চিন্তার মুক্তির প্রথম উদ্যোক্তা।
তাঁর এই বিশ্বাস কবিকে মানবতাবাদের প্রেরণা জুগিয়েছে, যা তাঁকে তৎকালীন ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নির্মম শোষণ ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতে সাহায্য করেছে। ‘লাশ’ কবিতায় তিনি যে অমানবিকতার চিত্র এঁকেছেন, তা প্রমাণ করে তাঁর কাব্য শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মুক্তির জন্যও নিবেদিত ছিল। তিনি লেখেন:
‘আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও
ধ্বংস হও, তুমি ধ্বংস হও।’
তাঁর কাব্যচেতনা ছিল একটি বিশ্বজনীন আদর্শের প্রতিচ্ছবি, যা নিম্নোক্ত দুটি ধারায় প্রস্ফুটিত হয়েছে—
ফররুখ আহমদের কাব্যচেতনার একটি মৌলিক দিক হলো—তাঁর কাব্যভাষা নির্মাণে স্বাতন্ত্র্যবাদী অবস্থান। তিনি সচেতনভাবে বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। এই শব্দভান্ডার কেবল ভাষার অলংকার ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর সংস্কৃতি ও তাহজিব-তামাদ্দুনের প্রতি গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির স্বকীয় সাহিত্য নির্মাণের জন্য তার নিজস্ব শব্দভান্ডার ও ঐতিহ্যের মিশ্রণ অপরিহার্য। এই প্রয়াস ছিল কাজী নজরুল ইসলামের হাতে শুরু হওয়া বাংলা কাব্যের সেই ধারার সম্প্রসারণ, যেখানে আরবি-ফারসি মিশ্রিত একটি প্রাণের ভাষা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল।
সবশেষে বলা যায়, কবি ফররুখ আহমদের কাব্যচেতনা ছিল বস্তুত এক বৈপ্লবিক প্রত্যয় ও শৈল্পিক সংগ্রাম। তাঁর সাহিত্যকর্ম সেই সময়ের বাঙালি মুসলিম সমাজকে আত্ম-অনুসন্ধান ও আত্ম-প্রত্যয়ের পথে চালিত করেছিল। একদিকে তিনি ছিলেন ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্যের প্রতি দ্বিধাহীনভাবে অনুরক্ত, অন্যদিকে ছিলেন আধুনিক কাব্যশৈলী ও মানবিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় আপসহীন। এই দুই আপাত-বিপরীতমুখী চিন্তাধারার শৈল্পিক ও দার্শনিক সমন্বয়ের ফলেই ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে ‘মুসলিম রেনেসাঁর কণ্ঠস্বর’ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর কবিতা প্রমাণ করে—আত্মপরিচয় ও আধুনিকতা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যা একটি জাতির জাগরণের পথ দেখায়।
লেখক: রিসার্চ ফেলো, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট

শাশ্বত চেতনাবোধের বিনির্মাণ ও অনুপম মনুষ্যত্ব অর্জনের এক কার্যকর প্রশিক্ষণের বার্তা নিয়ে আগমন করে রমজান। শাবান মাসের শেষে পশ্চিম আকাশে বাঁকা চাঁদ উঁকি দিতেই ধরণির বুকে রহমতের ফল্গুধারা নেমে আসে। শুরু হয় মুমিন হৃদয়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্নিগ্ধ প্রহর—পবিত্র মাহে রমজান।
৯ ঘণ্টা আগে
দিন শেষে রাত নেমে এসেছে মক্কার আকাশে। ধীরে ধীরে রাত গভীর হচ্ছে। বাড়ছে নিস্তব্ধতা। কমছে কোলাহল। এসবের মাঝেই নতুন এক আলোর আগমনের অপেক্ষা। মক্কার এক প্রান্তে বসে অপেক্ষা করছেন এক ইহুদি পণ্ডিত। তাঁর চোখ আকাশের দিকে স্থির। মনোযোগ গভীর। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেয়েছেন বলেই চেহারায়...
৯ ঘণ্টা আগে
মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ভাষা। এটি মানুষের চিন্তাচেতনা, নিজস্ব সংস্কৃতি, অনুভূতি প্রকাশ ও আত্মপরিচয়ের প্রধান বাহক। বিশেষত মাতৃভাষা মানুষের হৃদয় ও আবেগের ভাষা। যে ভাষায় মানুষ প্রথম কথা বলতে শেখে, শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চায় তা অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
৯ ঘণ্টা আগে
রমজানের স্নিগ্ধ আমেজ আর আনন্দের জোয়ারে মিসরের পুরোনো কায়রোর সমকক্ষ আর কোনো জনপদ নেই বললেই চলে। এখানকার প্রতিটি রাস্তা, অলিগলি দিয়ে হাঁটার সময় আপনার চোখে পড়বে পবিত্র মাসকে বরণ করে নেওয়ার একেকটি জীবন্ত দৃশ্য। কেউ হয়তো নিজের বাড়ির আঙিনায় বা দোকানের সামনে বসে লোহা কিংবা...
৯ ঘণ্টা আগে