Ajker Patrika

আলজেরিয়ার যে মসজিদে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার

কাউসার লাবীব
আলজেরিয়ার যে মসজিদে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার
আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অবস্থিত মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’। ছবি: সংগৃহীত

চার লাখ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে ভূমধ্যসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা স্থাপত্যিক নিদর্শন—‘জামিউল জাজাইর’ (جامع الجزائر)। আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অবস্থিত এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি আধুনিক প্রকৌশল ও ইসলামিক ঐতিহ্যের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদে নববির পর এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এবং আফ্রিকার বৃহত্তম মসজিদ।

আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অবস্থিত মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’। ছবি: সংগৃহীত
আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অবস্থিত মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’। ছবি: সংগৃহীত

২০২১ সালে শিকাগো আর্কিটেকচার মিউজিয়াম এবং ইউরোপীয় সেন্টারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সেরা স্থাপত্য ডিজাইনের পুরস্কার বিজয়ী এই স্থাপনাটি কেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা, তা এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ঔপনিবেশিক কলঙ্ক মুছে ইসলামের জয়গান

যে স্থানে আজ জামিউল জাজাইর গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, ফরাসি উপনিবেশ আমলে (১৮২৫-১৮৯২) তার নাম ছিল ‘লাভিজেরি’। আলজেরিয়ার মুসলিমদের জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করার বিতর্কিত ধর্মপ্রচারক কার্ডিনাল চার্লস লাভিজেরির নামানুসারে এই অঞ্চলের নামকরণ করেছিল ফরাসিরা। তারা এখানে একটি খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুল তৈরি করে আলজেরিয়ার ইসলামিক পরিচয় মুছে দিতে চেয়েছিল।

জামিউল জাজাইরের দৃষ্টিনন্দন মিনার। ছবি: সংগৃহীত
জামিউল জাজাইরের দৃষ্টিনন্দন মিনার। ছবি: সংগৃহীত

১৯৬২ সালে স্বাধীনতা লাভের পর, আলজেরিয়া এই কলঙ্কময় ইতিহাসকে ধুয়ে-মুছে সাফ করার উদ্যোগ নেয়। প্রথমত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সম্মান জানিয়ে স্থানটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘আল-মুহাম্মাদিয়া’। পরবর্তীকালে, ফরাসিদের সেই ধর্মীয় আগ্রাসনের কেন্দ্রবিন্দুতেই নির্মাণ করা হয় এই বিশাল মসজিদ।

জামিউল জাজাইরের দৃষ্টিনন্দন মিম্বর। ছবি: সংগৃহীত
জামিউল জাজাইরের দৃষ্টিনন্দন মিম্বর। ছবি: সংগৃহীত

শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশের অন্ধকারের বিপরীতে এটি আজ উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের এক নতুন আলোকবর্তিকা। ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তব্বুন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

জামিউল জাজাইরে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার

এই মসজিদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর ২৩৫ মিটার (৮৬৯ ফুট) উঁচু দৃষ্টিনন্দন মিনারটি। এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার। ৪৩ তলাবিশিষ্ট এই মিনারটি কেবল আজান দেওয়ার স্থানই নয়, এর ভেতরে রয়েছে ১৫ তলাবিশিষ্ট ‘ইসলামিক সভ্যতা জাদুঘর’, ১০ তলাবিশিষ্ট ‘আন্তধর্মীয় সংলাপ গবেষণা কেন্দ্র’, পাঠাগার এবং রেস্তোরাঁ।

জামিউল জাজাইরের মনোমুগ্ধকর বাগান। ছবি: সংগৃহীত
জামিউল জাজাইরের মনোমুগ্ধকর বাগান। ছবি: সংগৃহীত

মিনারের ৩৮ ও ৪৩ তলায় রয়েছে চমৎকার ‘অবজারভেশন ডেক’, যেখান থেকে দর্শনার্থীরা আলজিয়ার্স শহর ও ভূমধ্যসাগরের ৩৬০ ডিগ্রি প্যানারোমিক ভিউ উপভোগ করতে পারেন। মাগরেবি-আন্দালুসিয়ান ঐতিহ্যের আদলে তৈরি এই মিনারটি রাতে সমুদ্রের জাহাজগুলোকে পথ দেখাতে ‘লাইটহাউস’ বা বাতিঘর হিসেবেও কাজ করে।

বিশাল ধারণক্ষমতা ও ক্যালিগ্রাফির প্রদর্শনী

মসজিদটির মূল কলাম বা প্রার্থনা কক্ষে একসঙ্গে ৩৬ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে এর বিশাল সাহান (চত্বর) ও বহিরাঙ্গন হিসাব করলে একসঙ্গে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারেন। ২২ হাজার বর্গমিটারের প্রার্থনা কক্ষটির ওপর রয়েছে ৫০ মিটার ব্যাসের এক বিশাল দ্বিতল গম্বুজ। মসজিদের দেয়াল ও স্তম্ভগুলোতে আলজেরিয়ান ক্যালিগ্রাফারদের নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় প্রায় ছয় হাজার মিটার দীর্ঘ কোরআনের আয়াত ও ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা হয়েছে।

আল-আকসার স্মরণে অনন্য ‘মিম্বার’ ও ফিরোজা গালিচা

মসজিদের মিম্বারটি আফ্রিকান ওক কাঠ এবং প্রাকৃতিক মুক্তা (মাদার অব পার্ল) দিয়ে নির্মিত। এর নকশা তৈরিতে আলজিয়ার্সের গ্র্যান্ড মস্ক এবং জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির স্থাপিত ঐতিহাসিক মিম্বার থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই মিম্বারটিকে ব্যবহারের পর স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক উপায়ে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা যায়।

জামিউল জাজাইরের রাতের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
জামিউল জাজাইরের রাতের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

এ ছাড়া পুরো মসজিদে বিছানো রয়েছে আলজেরিয়ার নিজস্ব ঐতিহ্যে তৈরি ২৭ হাজার বর্গমিটারের চমৎকার ফিরোজা রঙের লাক্সারি কার্পেট, যাতে দেশের ২৯টি অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

জামিউল জাজাইরের ভেতরে দৃষ্টিনন্দন ক্যালিগ্রাফি। ছবি: সংগৃহীত
জামিউল জাজাইরের ভেতরে দৃষ্টিনন্দন ক্যালিগ্রাফি। ছবি: সংগৃহীত

শতভাগ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নকশা

এই বিশাল কমপ্লেক্সটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ছাদে বসানো হয়েছে বিশাল সোলার প্যানেল, যা ভবনের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ৩০% নিজেই উৎপাদন করে। তা ছাড়া মসজিদের মূল কলাম বা পিলারগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে এগুলো ছাদের বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে মাটির নিচের সাড়ে ছয় হাজার কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংকে পাঠিয়ে দেয়। এই পানি পরবর্তীকালে অজু এবং বাগানের সেচকাজে ব্যবহার করা হয়।

জামিউল জাজাইরের সাহান থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনারটি দেখতে যেমন লাগে। ছবি: সংগৃহীত
জামিউল জাজাইরের সাহান থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনারটি দেখতে যেমন লাগে। ছবি: সংগৃহীত

প্রবল ভূমিকম্প প্রতিরোধী প্রযুক্তি

ভুঁইফোড় ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে আলজিয়ার্স অঞ্চলটি উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মসজিদের নিচে ২৪৬টি অত্যাধুনিক সিসমিক আইসোলেটর (ভূমিকম্প শোষক) এবং ৮০টি শক-অ্যাবজরবার বা ড্যাম্পার ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিশেষ প্রযুক্তিটি ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনি প্রায় ৭০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে সক্ষম, যা যেকোনো বড় দুর্যোগেও মসজিদটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখবে।

ইসলামিক থিমেটিক গার্ডেন

কমপ্লেক্সের ভেতর ১ লাখ ৭০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ইসলামিক থিমেটিক গার্ডেন। স্পেনের আন্দালুসিয়ার (কর্ডোভা ও গ্রেনাডা) মুসলিম সভ্যতার আদলে তৈরি এই বাগানে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ফলদ বৃক্ষ যেমন—ত্বিন (ডুমুর), জাইতুন (অলিভ), ডালিম এবং সুগন্ধি সিসিলিয়ান লেবু ও জুঁই ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে।

মসজিদুল আকসার আদলে তৈরি জামিউল জাজাইরের দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ। ছবি: সংগৃহীত
মসজিদুল আকসার আদলে তৈরি জামিউল জাজাইরের দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ। ছবি: সংগৃহীত

২০২২ সালের ১ নভেম্বর ফিলিস্তিনি নেতাদের উপস্থিতিতে আল-আকসা মসজিদের প্রাঙ্গণের পবিত্র মাটিসহ তিনটি জাইতুন (অলিভ) গাছের চারা এনে এই বাগানে রোপণ করা হয়, যা আলজেরিয়ার মানুষের হৃদয়ে ফিলিস্তিনের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।

জামিউল জাজাইরের দৃষ্টিনন্দন সাহান। ছবি: সংগৃহীত
জামিউল জাজাইরের দৃষ্টিনন্দন সাহান। ছবি: সংগৃহীত

অনন্য ঝাড়বাতি

মূল প্রার্থনা কক্ষে ঝুলন্ত কেন্দ্রীয় ঝাড়বাতিটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও বিলাসবহুল। ১৩ দশমিক ৫ মিটার ব্যাসের এবং ৯ দশমিক ৫ টন ওজনের এই ঝাড়বাতিটির মূল কাঠামো ইস্পাতের এবং এটি সম্পূর্ণ ২৪ ক্যারেট খাঁটি সোনা দিয়ে মোড়ানো। এতে ৩ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি স্বরোভস্কি (Swarovski) ক্রিস্টাল ব্যবহার করা হয়েছে। তসবিহর দানা অনুযায়ী এটি ৩৩টি ভাগে বিভক্ত এবং এর গায়ে আল্লাহর প্রশংসামূলক জিকির খোদাই করা আছে। এর বিশেষত্ব হলো এটি নিজে আলো জ্বালায় না, বরং ওপর থেকে আসা প্রজেক্টরের আলোকে ক্রিস্টালের মাধ্যমে প্রতিফলিত করে পুরো মসজিদে আলো ছড়িয়ে দেয়।

গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

জামিউল জাজাইর কেবল নামাজের স্থান নয়, এর মূল লক্ষ্য ইসলামকে একটি সহনশীল, মধ্যপন্থী ও বৈজ্ঞানিক ধর্ম হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা। এর বিশাল কমপ্লেক্সে রয়েছে:

  1. দারুল কোরআন: পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ও ডক্টরেট স্তরের গবেষক এবং ওলামাদের জন্য উচ্চতর ইসলামিক শিক্ষাকেন্দ্র।
  2. গ্র্যান্ড লাইব্রেরি: যেখানে গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১০ লক্ষাধিক বইয়ের বিশাল সংগ্রহশালা।
  3. সাংস্কৃতিক কেন্দ্র: আন্তর্জাতিক সেমিনার, সম্মেলন এবং ইসলামিক চারুকলার প্রদর্শনীর জন্য অত্যাধুনিক অডিটরিয়াম।
  4. বিশাল কার পার্কিং: মাটির নিচে ১৪ হেক্টর এলাকাজুড়ে চার হাজার গাড়ি পার্কিংয়ের স্বয়ংক্রিয় সুবিধা।
জামিউল জাজাইরের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
জামিউল জাজাইরের লোগো। ছবি: সংগৃহীত

প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত জামিউল জাজাইর কেবল আলজেরিয়ার নয়, বরং গোটা মুসলিম উম্মাহর এক গর্বের প্রতীক। এটি একদিকে যেমন আধুনিক স্থাপত্য ও গ্রিন-টেকনোলজির শীর্ষবিন্দু, অন্যদিকে তেমনি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিমদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পুনরুত্থানের এক জীবন্ত স্মারক। আর এই কারণেই স্থাপত্যের ইতিহাসে জামিউল জাজাইরকে এই শতাব্দীর অন্যতম মসজিদ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত