সভ্যতার বিকাশে যে উপাদানগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কলম তার মধ্যে অন্যতম। আগুন যেমন মানুষকে সভ্য করেছে এবং চাকা দিয়েছে গতি, তেমনি কলম মানুষকে দিয়েছে চিন্তার গভীরতা ও ইতিহাস সংরক্ষণের অমর শক্তি। ইসলামে কলমের গুরুত্ব কেবল বৈষয়িক প্রয়োজন নয়; বরং এটি আখিরাত, তাকদির ও মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ইসলামের সূচনা হয়েছিল জ্ঞানের আহ্বানের মাধ্যমে। হেরা গুহায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ প্রথম ওহিতেই কলমের মহিমা ঘোষিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।...যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক)
আল্লাহর বাণীর অসীমতা বোঝাতেও কলমের উপমা টানা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীর সব গাছ যদি কলম হয় আর সাগর হয় কালি, তবু আল্লাহর প্রশংসা লিখে শেষ করা যাবে না।’ (সুরা লোকমান: ২৭)। এমনকি পবিত্র কোরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ সুরার নাম রাখা হয়েছে—আল-কলম।
তাফসিরবিদদের মতে কলম প্রধানত তিন প্রকার:
- ১. কুদরতি কলম: যা আল্লাহ প্রথম সৃষ্টি করেছেন এবং যার মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত ঘটা সব বিষয় লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
- ২. ফেরেশতাদের কলম: যার সাহায্যে দুজন সম্মানিত ফেরেশতা মানুষের আমলনামা ও প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড লিখে রাখছেন।
- ৩. সাধারণ কলম: যা মানুষ জ্ঞানচর্চা ও বৈষয়িক প্রয়োজনে ব্যবহার করে।
হজরত কাতাদাহ (রা.)-এর মতে, কলম আল্লাহর এমন এক বড় নিয়ামত, যা না থাকলে দ্বীন ও দুনিয়া—কোনোটিই সঠিকভাবে পরিচালিত হতো না।
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, কলম হলো তাকদির বা ভাগ্যের প্রতীক। সৃষ্টির শুরুতে কলমকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল মহাবিশ্বের আদি-অন্ত লিখে রাখতে। এ ছাড়া কলমের মাধ্যমেই ইসলামের প্রাণস্পন্দন পবিত্র কোরআন সংরক্ষিত হয়েছে। ওহি লেখক সাহাবিগণ হাড়, চামড়া ও পাথরের ওপর কলম দিয়ে কোরআন লিপিবদ্ধ করেছিলেন বলেই আজ আমরা কিতাব আকারে তা হাতে পাচ্ছি।
কলম একটি পবিত্র আমানত। এর অপব্যবহার—যেমন মিথ্যা লেখা, অপবাদ দেওয়া বা অন্যায়কে সমর্থন করা—ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আধুনিক যুগে কম্পিউটার বা মোবাইলের কি-বোর্ডও কলমেরই ডিজিটাল রূপ। মাধ্যম যা-ই হোক, এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে সততা ও আল্লাহভীতি থাকা অপরিহার্য।










